বইমেলা তুমি কার?

0

রশীদ জামীল ::
অমর একুশের বইমেলা। বাঙালির প্রাণের মেলা। বাঙালি কাকে বলে? কী করলে বাঙালি হওয়া যায়? বাঙালির কি নিজস্ব কোনো পোশাক আছে? এমন কিছু, যার ব্যত্যয় হলে বাঙালিত্বের ক্যাটাগরি থেকে বহিস্কার করা যাবে!
— জবাব খোঁজা লাগছে বইমেলা থেকে নয়জন মাদরাসা ছাত্রকে গ্রেফতার নাটক মঞ্চস্থ করায়। ভাবা লাগছে তাদেরকে আবার ছেড়ে দেয়ায়। গ্রেফতার করে সরকার একটি ম্যাসেজ দিলেন। ছেড়ে দিয়ে আরেকটি। ম্যাসেজগুলো কি আমরা পড়তে পারছি?

দুই
বইমেলা। একুশকে ধারণ করার মেলা। বাংলাকে বরণ করার মেলা। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মিলনমেলা হল এই বইমেলা। ‘মুসলমানদের মেলা’ বললে সেটা হত সাম্প্রদায়িক কথা। বললে ভুল হত না। বাহান্নকে ঘিরে যে নামগুলো বিশ্ব বাংলায় ঘুরে বেড়ায়; আব্দুস সালাম, আবুল বারাকাত, রফিক উদ্দিন, আব্দুল জব্বার…সবগুলোই মুসলমানদের নাম। তবুও টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবিওলা চিহ্নিত মুসলমানদের জন্য মেলাঙ্গণ আপাঙ্ক্তেও বানানোর পায়তারা!
কেনো?
কারণ: ইদানীং বইমেলায় ব্যাপকভাবে মাদরাসাছাত্ররা সম্পৃক্ত হচ্ছে। তাঁরা বই লিখছে। তাঁরা বই কিনছে। এটা হতে দিলে দু’-পাঁচ বছর পরের বইমেলা টুপিঘেরা হয়ে যায় যদি… প্রগতিবাদিতার স্লোগানধারী খাজনা থেকে বাজনা বেশি আঁতেল সম্প্রদায়ের কপালে ভাঁজ। বাংলা সাহিত্যের লাগাম কি তবে ফিরে যাচ্ছে তার আতুড়ঘরে? এটা তো হতে দেয়া যায় না। কিছু করা লাগে। এ ছাড়া আর কোনো কারণ আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।

তিন
আমাদের দুর্বলতা হল স্পষ্ট ম্যাসেজও আমরা পড়তে চাই না অথবা দেরিতে পড়ি। হাইকোর্টের সামনে প্রতিকৃতি স্থাপনের প্রতিবাদে উত্তাল হই, কিন্তু স্থানে স্থানে মাথার উপর যে প্রতিকৃতি, সেখানটায় কথা বলি না। শরীয়াতের এই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহ্যের মেরুদণ্ড দুর্বল করছে কিনা, ভাবার সময় পাই না।
হাইকের্টের সামনা নিয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে, হওয়ারই কথা। কিন্তু ঘরের ভেতরেরগুলো নিয়ে ‘রা’ থাকবে না কেনো? কত কিছু নিয়েই তো বসা হয় সরকারের সাথে। কখনো এটি নিয়ে বসা হয়েছে সরকারকে বুঝিয়ে বলার জন্য?
বসা যেত না?
দরকার ছিল না?
আয়তাকার দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের কবে বর্গাকার হবে!
বইমেলা থেকে নয় ছাত্রকে গ্রেফতার করে টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবিওলাদের ম্যাসেজ দেওয়া হল, বইমেলা তোমাদের জন্য নয়। দুই দিনের মাথায় ছেড়ে দিয়ে প্রমাণ করবার চেষ্টা করা হল, আমরা কওমি মাদরাসার প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। ম্যাসেজগুলো কি আমরা রিড করতে পারছি? আমরা কি তবে রাজি হব আবেগের উর্ধে উঠে বিবেকের বাঁধ বানাতে?

চার
এর আগে মেলায় যেতাম স্বরব্যঞ্জনের টানে। দু’হাজার আটে প্রথম স্টলে বই মেলায় যাওয়া আমার। দু’হাজার আটে বেরুলো ‘নষ্ট রাজনীতি। দু’হাজার নয়-এ প্রতিভার মইন ভাই প্রকাশ করলো দু’টি বই। সে বছর মেলায় গেলাম অন্যরকম আবেগ নিয়ে। কিন্তু মেলার প্রবেশ গেইটের ধাক্কায় মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। যে গল্প আজকের আগে কোথাও বলা হয়নি।
… সিলেট থেকে আমরা তিনজন গেছি। তিনজনেরই বই প্রকাশিত হয়েছে মেলায়। দু’জনকে উইদাউট চ্যাকিং ঢুকতে দিয়ে আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চ্যাক করা হল। সাথে নানা অবাঞ্চিত প্রশ্ন! রাগে, দু:খে, অপমানে মন চাইছিলো গেইট থেকেই ফিরে আসি। আসতামও। যদি না ভেতর থেকে বারবার মুসলেহ উদ্দীন বাবুল ভাই তাগাদা দিতেন। আমাকে হাত ধরে মেলার এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরিয়ে বেড়ালেন বাবুল ভাই। চেহারা মলিন দেখে তিনি ভাবলেন জার্নিজনিত ছাপ। আমিও তাঁকে তাই বুঝতে দিলাম।

পাঁচ
তখনো কওমি ছাত্ররা সেভাবে বইমেলামুখো হয়নি। অনেকের কাছে তো বইমেলা ছিল অপ-সংস্কৃতিরই একটি অংশ। নারী-পুরুষের বেপর্দা ঘুরাঘুরি! আমাদের মেলায় যাওয়া নিয়ে নাক সিটকানো হযরতদেরও অভাব ছিল না। অনেকেই তখন বলেছেন; (কী বলতে পারেন আন্দাজ করে নেওয়া ভালো)।
… অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এখন। এখন আমরা কম্পেয়ারিং করতে শিখেছি। আমরা বইমেলায় মেলায় যাচ্ছি। এটা একটা ভালো ব্যাপার। যেটা ভালো চোখে দেখছেন না তাঁরা। রিযিকে পিপড়া ওঠার ভয়ে হতে পারে! জানি না। সঙ্গত কারণেই ৯ মাদরাসা ছাত্রকে মেলা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। আফসোস! সবকিছুই আমরা বড় দেরিতে বুঝি।

ছয়
বাঙালিত্বকে মুসলমানিত্বের বিপরীত মেরুতে দাঁড় করানোর প্রবণতা নতুন নয়।
দায় কার?
দায়ী কে?
সব দায় কি এড়িয়ে যাওয়া যাবে! আমরাই তো দৃষ্টির সীমানাকে দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতায় নিয়ে যেতে চাইনি! সন্তুষ্ট থেকেছি একাঙ্গিক বাইন্ডারিতে। আর এই সুযোগে বাঙালিত্বের অ্যাজেন্সি দখল করে নিয়েছে ওরা। কার গলায় ঝুলে কান্না করা উচিত?

সাত
আমাদের চিন্তার দৈন্যতা কি দূর হবে?
ভাবতে রাজি হব আমরা?
ভাবনার মত করে!
সময়ের…

Comment

Share.

Leave A Reply