গল্প : ভূতের বাচ্চা জাফর ইকবাল!

0

সাইফ রাহমান ::
ভূতুড়ে পরিবেশ। বিদঘুটে অন্ধকার। ঝিঁঝিপোকাদের খেলানেলা নেই। সাড়াশব্দ কিছুই না। পোকাদের ডাকে অন্ধকারে হাটলে কিছুটা না হয় সাহস পাওয়া যায় কিন্তু এই সাহসটুকুও সঞ্চার করতে পারছেনা বেশ্যা ইয়াসমিন। সে বাড়ি যাবে। বেশ্যাবৃত্তি করে আসছে। পথিমধ্যে তার এই অবস্থা।

হাঁটছে। কোমর দুলিয়ে। এভাবেই সে হাঁটাচলা করে। মানুষদের আকৃষ্ট করার জন্য কিন্তু এই ভূতুড়ে অন্ধকারে, সাড়াশব্দবিহীন রাস্তায় কোমরটা আর দুলছে না। দোলাতে পারছে না। ভয়ে কম্পমান। হাত পা কাঁপছে, আর এই কাঁপাকাঁপা পা দিয়েই এগুচ্ছে সে। বাড়ির দিকে।

প্রতিদিন রাতে সে বাড়ি ফিরে। কুকর্ম সেরে কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে কখনই পড়েনি। রাস্তায় মানুষ থাকতো, নয়তো চাঁদের আলো অথবা ঝিঁঝিপোকাদের ডাকাডাকির শব্দে নির্ভয়ে চলে যেতো বাড়ি। কোন বেগ পোহাতে হতো না। ভয়ে মাথার ঘাম পায়ে যেত না। নিঃসঙ্কোচে বাড়ি পৌঁছতে পারতো।
দ্রুতবেগে হাঁটছে। ঘামে স্যাঁতসেঁতে অবস্থা। এদিকে গলাটাও শুকিয়ে গেছে। কী করবে, ভেবে কুল পাচ্ছেনা। না পিছু ফিরতে পারছে, না পারছে সামনে এগুতে। আইডিয়া করছে, অর্ধেক রাস্তা চলে আসছে। এখন কেমনে কী করে! কিছু হোক আর না হোক, একফোঁটা পানির খুব প্রয়োজন তার। গলা ভিজাবে। একেবারে শুকিয়ে গেছে গলাটা। নয়তো সে আটকে যাবে। এখানেই। যার জন্য এই পতিতাবৃত্তি, কিছুই হবেনা। আশা নিরাশায় পরিণত হবে।

রাস্তা থেকে নিচে নামলো সে। এখানে একটা গর্ত আছে। পানি থাকার কথা। অনুমান করেই। প্রতিদিন ঠিক রাস্তার মধ্যখানে এই গর্তটা তার চোখে পড়ে। এইভেবে। পানি পান করে মৃত্যু থেকে বাঁচতে নিচে নামছে। রাস্তার নিচে নামার সাথে সাথেই কিসের যেনো একটা চিৎকার শুনতে পেল। শরীরে গরম বাতাস লাগছে। অনুভব করলো।

মনকে শক্ত করে ভালোভাবে শরীরকে ঝাঁকুনি দিলো। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে আসতেই দেখতে পেল, এটা তো কোন পানির গর্ত নয়। জঙ্গল। উপরের দিকে চেয়ে দেখে এখানে কোন রাস্তার চিহ্নও নেই। বেশ্যার আর বুঝতে বাকী রইলো না, তাকে ভূতে এখানে নিয়ে আসছে। একরাস্তা থেকে আরেকরাস্তায়। তার বাড়ির পথের রাস্তা দেখিয়ে অন্যরাস্তায় নিয়ে এসে বিপদে ফেলছে। মাঝেমধ্যে এমনটা শুনা যায়, গভীর রাতে ভূতে ধরে একরাস্তা থেকে আরেকরাস্তায় মানুষদের নিয়ে বিপদে ফেলে। তার বেলায় এমনটাই ঘটলো।
সে শক্ত হয়ে আছে। রাগ করতেছে খুব। সাহসিনী হয়ে ওঠলো। আর তার এমনিতেই অনেক সাহস। সাহস না থাকলে কী আর বেশ্যাগিরি করে! পায়ের জুতা খুলে হাতে নিলো। খুঁটিলাগানো শক্ত জুতা। দৌড় দেবে। প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমতাবস্থায় দেখতে পেলো একজন মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে চশমা লাগানো। মাথায় সাদাকালো মিক্সিং চুল। ক্লিনসেইভ মুখ। তবে গোঁফ আছে। ইয়া লম্বা গোফ। দেখতে অবিকল একটা শয়তানের মতো।

তার ভাবসাব ভালো না দেখে দৌড় দিতে লাগলো সে। হাত দিয়ে খামচে ধরলো গোফওয়ালা। শক্ত করে। ছাড়ুন ছাড়ুন বলে চিৎকার করছে ইয়াসমিন। কিন্তু কিছুতেই ছাড়ছে না। শুরু করে দিলো নষ্টামি। ইয়াসমিন যদিও বেশ্যা, কিন্তু তার একটা নীতি আছে। স্বেচ্ছায় সে এসব করে। যাকে তার ভাল্লাগবে, তার কাছে যাবে। নয়তো না। এই লোকটাকে তার ভালোলাগেনি। দেখতে শয়তানের মত লাগছে। ভাবতে লাগলো, মনে হয় এই লোকটা মানুষ না। ভূতের বাচ্চা। কোনো মানুষ এতরাতে জঙ্গলে থাকার কথা না।

জোরাজোরি করছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছেনা। ভূতের বাচ্চা কিছুই করতে পারছেনা। ইয়াসমিন এবার সিদ্ধান্ত নিলো, তাকে জুতোপেটা করবে। যা হবার হবে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতে থাকা খুঁটিওয়ালা জুতাজুড়া দিয়ে এমনভাবে আঘাত করলো, নিমিষেই সে মাঠিতে লুটিয়ে পড়লো। তারপর দিতে লাগলো থাপ্পড়। একেরপর এক কষে থাপ্পড় লাগালো।

কী অবাক কাণ্ড! যখন ফিরে আসবে, দেখতে পেল বুকের মধ্যে ফিতাঝুলানো কার্ড। দ্রুতগতিতে কার্ড হাতে নিলো। দেখতে পেলো নাম। জাফর ইকবাল। অট্টহাসি দিয়ে বলতে লাগলো, এই বুঝি ভুতের বাচ্চা জাফর ইকবাল! যাকগে, ক’দিন যাবত খুঁজছিলাম, জুতোপেটা করার জন্য। কাজটা হয়ে গেলো। খুব শান্তি পেলাম। এখন নিরাপদে বাড়ি যেতে পারলেই আদায়। (পরে অবশ্য বুঝতে পারলো, জাফর ইকবাল হরিণ শিকার করতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ছিলো। শিকারের যন্ত্রপাতি দেখে।)

কিন্তু না! সেই যে গরম বাতাস। শরীরে জ্বালাপোড়া শুরু করছে। এখন। হাটতে পারছেনা। ভুতের খপ্পরে ঠিকই পড়ছে সে। মধ্যখানে একবিপদ থেকে উদ্ধার হলো। এবার আসল বিপদ। কী করা! ভাবতে লাগলো। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই শুনতে পেল, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। আসসালাতু খাইরুম্মিনান্নাউম। সব পরিষ্কার। ক্লিয়ার দেখতে পাচ্ছে অন্যরাস্তায় আছে সে। এবার নিজ গন্তব্যে পা বাড়ালো। ইচ্ছা করলো, আর বেশ্যাগিরি করবে না। খারাপের পথে পা বাড়াবে না।

সাইফ রাহমান : গল্পকার, সম্পাদক, সৃজনঘর

Comment

Share.

Leave A Reply