গোলাম সাহেবের কাস্টমার কেয়ার

0

আহমদ আবদুল্লাহ

গোলাম সাহেব হাঁটছেন।  দু’হাতে দু’খানা হুমায়ূন।  হুমায়ূনের দিকে বিশেষ খেয়াল নেই তার।  এক মনে বিড় বিড় করে হাঁটছেন।  বিড় বিড়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে না।  অতি গোপনে কাজটা করে যাচ্ছেন গোলাম সাহেব। মাঝে মাঝে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। মনে হচ্ছে বার বার কি যেনো ভুল করছেন। এরপর আবার প্রথম থেকে শুরু করছেন। শহরের বড় রাস্তায়গুলোয় সাধারণের হাঁটার জন্য ফুটপাত হচ্ছে নিরাপদ সু-ব্যবস্থা। গোলাম সাহেবের ধারণা তিনি সাধারণ শ্রেণীতে পড়েন না। ফুটপাত দিয়ে তার হাঁটা ঠিক হবে না।  ফুটপাতে হাঁটবে সাধারণেরা, আমি কেনো?

বেলা দেড়টার কাঠফাঁটা গরমে রাস্তার প্রায় মাঝখান দিয়ে হাঁটছেন গোলাম সাহেব। ঘামে সাদা পাঞ্জাবী শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সকালে বেরুনোর সময় নারকেল তেলে মাথা ডুবিয়েছিলেন। এখন গোলাম সাহেব নারকেল তেলের একটা কেইন হয়ে আছেন। নিজেকে বাইম মাছ বাইম মাছ ভাবছেন তিনি। ঘাম আর তেল এক হয়ে গোটা শরীর পিচ্ছিল । গোলাম সাহেব হঠাৎ করে বুক ফুলিয়ে দম নেয়া শুরু করেছেন। দম খাটো ধরণের গোলাম সাহেবের। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে বিড় বিড় করছেন। আবার মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। এক মনে তিনি এই অদ্ভুত কর্মকাণ্ড করে পথ চলছেন। পেছনে গাড়িগুলোর কঠিন হুইসেল কানে যাচ্ছে না তার। পৃথিবীর যাতবীয় মনযোগ এখন গোলাম সাহেব দখল করেছেন।
গোলাম সাহেবের আয়ূ এখন পঞ্চাশের ঘরে।  ছোটবিত্ত, বড়বিত্ত না মাঝারী বিত্তে পড়েন তিনি, সেটা গোলাম সাহেবের জানা নেই। বিত্ত বিয়ষটা তার মাথায় ডুকে না।  কোন এক বিত্তে হলেই চলে।
গোলাম সাহেবের পেটে ক্ষীধে নড়াচড়া করছে । সকালে দু’পিছ পাউরুটি খেয়ে বেরিয়েছিলেন। মটুর কথা মনে পড়লো গোলাম সাহেবের। মটু মিয়ার দোকানে ভালো খিচুড়ী পাওয়া যায়।  লোকটা রান্না-বান্নায় ওস্তাদ আছে। চা-ও ভালো বানায়। লেবুর রস, আদা আর কড়া লিকারের চা গোলাম সাহেবের বেশ লাগে। চিনি বেশি খেতে পছন্দ করেন তিনি। মটু ইচ্ছে মতো যত্ন করে খাওয়ায়। মটু মিয়ার যে জিনিসটা গোলাম সাহেবের একদম পছন্দ না, সেটা হলো মটু মিয়ার ভূড়ি। সবসময় ভূড়িটা বে-আব্রু থাকে। নগ্ন ভূড়ি দেখতে ঘেন্না লাগে গোলাম সাহেবের। কিছু বলতে পারেন না লোকটা যত্নের কমতি করে না বলে।
মটু মিয়ার দোকানে খিচুড়ী নেই। কী কারণে আজ খিচুড়ী রাঁধা হয় নি। ক’টা পিয়াজী ছোট্ট প্লেটে করে দেয়া হয়েছে গোলাম সাহেবকে। সকালের দিকে বানানো পিয়াজী এখন সিদ্ধ গোশতের মতো লাগছে।  বুড়ো দাঁত দিয়ে চিবানোয় অনেক পরিশ্রম হচ্ছে । খাওয়ার সময় আনাড়ি পরিশ্রম ভালো লাগে না তার।
মটু মিয়া খিচুড়ী হাউসে অনেক লোক বসে বসে কনক্রিট খাচ্ছে। সাথে বড় বড় আওয়াজে কথা বলছে। বিরক্ত লাগছে গোলাম সাহেবের। নিজের বিড় বিড়ানী শুনতে পাচ্ছেন না। হাত দিয়ে কান চেপে ধর বসে আছেন। থেমে থেমে বিড় বিড়ও করছেন । মটু মিয়া ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলো। নগ্ন ভূড়ির মটু মিয়া কাছে এসে বললো-
ভাইজান! কোনো সমস্যা? আর কিছু লাগবে? পিয়াজীটা একটু শক্ত, কষ্ট করে ভরে ফেলেন! গোলাম সাহেবের চোখ লাল হয়ে আছে। ইচ্ছে হচ্ছিলো- একটা ধমক দেন, কিন্তু লোকটা যত্ন করে।
-কোনো সমস্যা নেই, আর কিছু লাগবে না। তোমার কনক্রিট খেতে খারাপ লাগছে না। তুমি এখন যাও! আর শোনো, আমাকে ভাইজান ডাকবে না। তোমার চিকন গলায় ভাইজান ডাক বিড়ালের মিউর মিউর মতো লাগে। গোলাম সাহেব মুটামুটি বিরক্ত। মটু মিয়া ঘাবড়ে গেলো। কনক্রিটের বিষয়টা বুঝে আসছে না তার। -তাইলে কী ডাকবো! কনক্রিটের বিষয়টা বুঝতে পারলাম না ভাইজান? মটু আবার বলে। গোলাম সাহেব রাগে কটমট করছেন। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। নগ্ন ভূড়ির ফাজিলটা আবার ভাইজান ডাকে, বিড়াল ফাজিল…।
গোলাম সাহেবের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। মোবাইল কানে নিয়েই উচ্চস্বরে অথচ ক্যাড়ে গলায় গোলাম সাহেব বলতে শুরু করলেন- ওয়েলকাম টু গ্রামীণফোন, গ্রামীনফোন সার্ভিসে আপনাকে স্বাগতম! আমি কীভাবে আপনাকে সাহয্য করতে পারি স্যার! গোলাম সাহেব হাঁপাচ্ছেন, লম্বা করে দম নিলেন। খাটো দমে এত্তো লম্বা কথা এক শ্বাসে বলা জটিল বিষয়। গত তিন দিন ধরে এই ক’টা লাইন এক শ্বাসে বলতে পারার প্রাক্টিস করছেন তিনি। নিজের উপর বিরক্ত লাগছে তার। এই ক’টা লাইন এক শ্বাসে বলতে পারি না।
ওপার থেকে গোলাম সাহেবের স্ত্রীর কণ্ঠ শুনা গেলো।
-এই! কী বলছো তুমি, স্যার কে? আর এখন হাঁপাচ্ছো কেনো? কোথায় তুমি? গোলাম সাহেব লাইন কেঁটে দিলেন। এই অবস্থায় স্ত্রীর সাথে কথা বলা ঠিক হবে না। প্যাচ লেগে যেতে পারে। নীলা খুঁত খুঁতে স্বভাবের মেয়ে। সামান্যতে জিলাপী বানাতে ওস্তাদ। মটু মিয়ার দোকান ভর্তি লোক হা করে গোলাম সাহেবকে দেখছে। এই প্রকারের লোক তারা ইতিমধ্যে দেখে নি মনে হয়। গোলাম সাহেব কী করবেন এখন ভেবে পাচ্ছেন না। পানি খেলেন একটু। গ্লাসে ময়লা গন্ধ। হাঁপানো কমছে না এখনও। গোলাম সাহেব কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন- বুঝেছো মটু, হুমায়ূন স্যার উচ্চবিত্তের জন্য লিখে গেছেন। মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত স্যারের কাছে পাত্তাই পায় নি। এটা স্যার নিজেই বলেছেন!
গোলাম সাহেব মটু মিয়া খিচুড়ী হাউস থেকে বেরিয়ে এলেন। দোকান ভর্তি লোক এখনও হা করে আছে। কাস্টমার কিয়ারের সাথে হুমায়ূন স্যারের তিন বিত্তের মিল কোথায় বুঝার চেষ্টা করছে…

Comment

Share.

Leave A Reply