মেধাবী তারুণ্য; হাফিয আবদুল হামিদ ছাকিব

0

ইলিয়াস মশহুদ :: উলুমূল হাদীস ছালে ছানী। ফাইনাল পরীক্ষা। দিলেজানে মেহনত; পরীক্ষার প্রস্তুতি। ইমতিহান শুরু ৮ই মে। শেষ হল ১৪ই মে। পরীক্ষাটা দ্রুত শেষ হলেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচা। তবে ফলাফল আ’লা দরজার হতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ! প্রস্তুতিটা তেমনই হয়েছে।
তিনি মা। সাথে আব্বার শূন্যস্থানও। জনমদুঃখিনী মা অসুস্থ। কয়েক মাস ধরে। পরীক্ষা শেষ হলেই যেন দ্রুত চলে আসি, মায়ের বেশ তাগাদা।
এদিকে দেশে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত হবে দাওরায়ে হাদীস তথা মাস্টার্স সমমানের পরীক্ষা। আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে দেশের ৬টি কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড এতে অংশ নিচ্ছে।
১১ এপ্রিল গণভবনে আলেম-উলামাদের এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্স সমমানের ঘোষণা দেন।
দাওরাকে মাস্টার্স সমমান ঘোষণার পর আকাহ গঠন, অভিন্ন প্রশ্নপত্রে একযোগে সারা দেশে পরীক্ষা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার ইতিহাসে বিশেষ এক উপলক্ষ। প্রথমবারের মত পরীক্ষা, তাই নতুন-পুরাতন সবাইকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। উন্মুক্তভাবে। জাদীদ-ক্বাদীম সবাই এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। দেশের প্রায় সব কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুকরা সুযোগটি লুফে নেন।
হৃদয়ের অদম্য স্পৃহা; মাদরে ইলমী দারুল উলূম দেওবন্দে দাখেলা নেয়ার। চেষ্টাও চলছে। ভিসা জটিলতায় গেল বছর যাওয়া সম্ভব হয়নি। এবার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
মোটকথা, একটা নার্ভাসনেস অবস্থা। ক্লান্তি, চাপ এবং টেনশন।

—-উপরের ভূমিকামতন এই কথাগুলো কওম-কওমির অহঙ্কার, অনন্য মেধাবী, আহাক পরীক্ষায় মেধাতালিকাভুক্ত হাফিয মাওলানা আব্দুল হামিদ ছাকিবকে নিয়ে।

গাজীপুর জেলার দারুল উলূম শ্রীপুরে ইফতা বিভাগে অধ্যয়নরত হাফিয ছাকিব ১৯৯১ সালের ২৭ নভেম্বর সিলেট জেলার ওসমানী নগর উপজেলার গলমুকাপন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম মাস্টার আবদুন নূর রাহ.। চাচা সিলেটের বরেণ্য বুযুর্গ শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুশ শহীদ শায়খে গলমুকাপনী। ৮ ভাই-বোনের মধ্যে ছাকিব সর্বকনিষ্ঠ।
হাফিয ছাকিবের লেখাপড়ার হাতেখড়ি মায়ের কাছে। পাশ্ববর্তী মসজিদে সাবাহী মক্তব এবং গলমুকাপন মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর ২০০৫ সালে হিফযুল কুরআন সম্পন্ন করেন। ২০০৬ সালে মুতাওয়াসসিতাহ ২য় বর্ষে ভর্তি হন সিলেটের শীর্ষ ইসলামি বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা মাদরাসায়। এখানে অল্প সময়ে উস্তাযদের নেক নজরে চলে আসেন নিজের মেধা, মুজাহাদা ও হুসনে খুলুকের মাধ্যমে।
মুতাওয়াসসিতাহ ২য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় সিলেটের আঞ্চলিক শিক্ষাবোর্ড তানজিমুল মাদারিস সিলেট বিভাগে মেধাতালিকায় মুমতাজপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী বছর অর্থাৎ মুতাওয়াসসিতাহ ৩য় বর্ষের ২য় সাময়িক পরীক্ষা থেকে নিয়ে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছরে মোট ২৩টি পরীক্ষায় হাফিয ছাকিব প্রতিবারই ছিলেন ক্লাসের ফার্স্ট বয়। মুতাওয়াসসিতাহ ৪র্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের অধীনে বোর্ডে মেধাতালিকায় ২য় স্থান অর্জনসহ সানোবিয়্যাহ ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় বোর্ড সেরা, ফজিলত জামাতের ফাইনাল পরীক্ষায় বোর্ডে ৩য় স্থান এবং দাওরায়ে হাদীসের ফাইনাল পরীক্ষায় মেধাতালিকায় বোর্ডে ৩য় স্থান অর্জন করে নিজের অনন্য মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
হাফিয ছাকিব প্রায় একদশক ধরে সিলেট উপশহরস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক কোয়ার্টার জামে মসজিদের তারাবিহর ইমাম।
এই বছর দেওবন্দ যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। দেরি হলেও ভিসা পেয়েছিলেন। তবে ভাগ্য সহায় হয়নি বলে- সময় মত দেওবন্দের ভর্তি ফরম সংগ্রহ করতে পারেন নি। দেওবন্দে পৌঁছার ঘণ্টাখানেক আগেই ফরম বিতরণ শেষ হয়ে যায়। তাই একবুক হতাশা নিয়ে দেশে ফিরেন। সব ঠিক থাকলে আগামি বছর দাখেলা দিবেন।

সুললিত কণ্ঠের অধিকারী হাফিয আব্দুল হামিদ ছাকিব ইলম, ফহম ও হুসনে খুলুকে এক অত্যুজ্জল ব্যক্তি। মিশুক চরিত্র, বন্ধুভাবাপন্ন যুগসচেতন তরুণ আলেম, লেখক, ওয়াইজ।
হাফিয ছাকিব কওমি অঙ্গনে নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষাধারায়ও সমান তালে অগ্রসরমান। ২০১১ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে (জিপিএ ফাইভ) এ প্লাস, ২০১৩ সালে আলিম পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেন। পরে সিলেট সিরকারী আলিয়া মাদরাসায় ফাযিলের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
হাফিয ছাকিব ২০১৪ সালে ইলমে হাদীসের উপর উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাগার বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে উলুমূল হাদীস বিভাগে ভর্তি হন। গেল রমজানের আগে ইলমে হাদীসের উপর আরবীতে প্রায় ৩৫০ পৃষ্টার একটি গবেষণা প্রবন্ধ (থিসিস) লিখেন।

কওমিকণ্ঠের সাথে একান্ত আলাপকালে হাফিয ছাকিব জানান, উলুমূল হাদীসের ছালে ছানীর ফাইনাল পরীক্ষার আগে প্রায় তিনমাস থিসিস নিয়ে খুব ব্যস্থ ছিলাম। এরপর পরীক্ষা। এরই মাঝে খবর পেলাম- আল হাইআতুল উলয়ার অধীনে আসন্ন পরীক্ষা অংশ নেয়ার অবারিত সুযোগ। প্রথমে পরীক্ষা দেব না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যেহেতু বাড়িতে আম্মা অসুস্থ। না, শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান নিয়ে নিলাম। অমার অনেক সাথী এ ব্যাপারে আমাকে উৎসাহ দিচ্ছিলো। তাই বসুন্ধরায় আবারো দাওরা পরীক্ষা দেয়ার জন্য রেজিস্টেশন করলাম।
উলুমুল হাদীসের পরীক্ষা শেষে আহাক পরীক্ষার জন্য হাতে একদিনও সময় নেই। সবদিক চিন্তা করে আবারো পরীক্ষা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। যখনই রিলাক্স হতে যাব, তখনই বাড়ি থেকে খবর গেল, দারুস সুন্নাহ গলমুকাপন থেকে আমাকে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার হয়ে বড় ভাই সব কাজ করেছেন।
১৫ মে আহাকের পরীক্ষা শুরু। ১৪ মে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। রাতে বাড়িতে পৌঁছি। পরদিন সকাল হলেই পরীক্ষা। কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের গহরপুর মাদরাসা সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! প্রথম দিনের পরীক্ষা ভালো হল। সাথে সাহসও বেড়ে গেল। ভাবলাম- একটু মনযোগসহকারে বাকি পরীক্ষাগুলোও দিয়ে দেই। প্রতি রাতেই চলত পরীক্ষা প্রস্তুতি। বুঝতেই পারছেন- কীভাবে সম্ভব! আল্লাহর উপর ভরসা করে মোটামোটি ভালোভাবেই সবক’টি পরীক্ষা দিলাম।
মেধাতালিকায় ৩১তম স্থান অর্জন সম্পকে হাফিয ছাকিব বলেন, আমার ভাবনায় এসব ছিল না। পাশ করতে চাইছি। আমার উপর যে আস্থা রাখা হয়েছিল, তার প্রতিদান এই ফলাফলে হয়নি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ-সময় পেলে আরো ভালো রিজাল্ট হত- আশা আমার। তারপরও খুশি।
এ অর্জনে খুশি আমার পরিবারসহ মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তবে আমি এর সব কৃতিত্ব দিচ্ছি আমার প্রাণপ্রিয় জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার সব আসাতিযায়ে কেরামকে। আমার সহপাঠীদেরকে।

Comment

Share.

Leave A Reply