ছোটগল্প : “বিশ্বাস হোক দৃঢ়তর”

0

আযাদ আবুল কালাম ::

ছত্রিশ জন যাত্রী নিয়ে হাইওয়ে রোডে চলন্ত একটি গাড়ি ব্রেক ফেইল করেছে। ব্রেক ফেইল কি জিনিশ সবাই বুঝে না। তবে গাড়িটি বেপরোয়া চলছে, উল্টাপাল্টা ঝাকুনি দিচ্ছে, এটা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে তুমুল হৈহুল্লোড় শুরু হয়। ততোক্ষনে সামনের দিকে বসা পেসেঞ্জাররা ড্রাইভারের চেহারার দিকে ফলো করছে। না বেচারা তো মদ-টদও খায়নি। কিন্তু চরম বিপদগ্রস্থ এবং হতাশার ছাপ দেখা যাচ্ছে ড্রাইভারের চেহারায়। এরই মধ্যে আরো মারাত্নকভাবে কয়টা ঝাকুনি দিয়ে উঠলো গাড়িটি। যাত্রীরা দপাদপ একে অপরের উপরে গিয়ে পড়ছে। গলা ফাঁটিয়ে ক’কজন হাঁক দিল “এই ড্রাইভার এই হইছে কি গাড়ি থামাও!” ড্রাইভার বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠে “আপনারা সতর্ক থাকুন আর আল্লাহর নাম জপুঁন, গাড়িটা কিছুতেই থামাইতে পারতাছি না, যে কোন সময় যে কোন দিকে ছাইড়া দিতে অইবো” তার মানে গাড়ি ব্রেক ফেইল করেছে !

বড় গাড়ি হাই স্পিড থেকে ব্রেক ফেইল করার পর কমপক্ষে নিউটেল করা যায়। গাড়িটি নিউটেলও করা যাচ্ছে না। রোড কিছুটা ফাঁকা থাকায় পড়ে যায় পড়ে যায় অবস্থায় এলোপাতাড়ি চলতেই আছে। তবে যে কোন সময় কোথাও না কোথাও পড়ে যেতে পারে।

ড্রাইভার হাঁকতে হাঁকতে আরেকবার সবাইকে সতর্ক করে ষ্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আবার বজলু হেলপারকে গালি দেয়, “খানকীর পোলা কইছালাম না চ্যাক কইরা গাড়ি ছাড়তে”

এতো বিপদের সময়ও বজলু হেলপারের চোখ দুটি কলছুমার নিটোল একখানা মুখের পরিপাট্যে ঢেউ খেলছে। সে অবাক চোখে বাসের সামনের সিটে বসা কলছুমার বর্ডি স্ট্রাকচারটা চোখ দিয়ে গিলতে গিলতে উস্তাদের গালিগুলোকে অনায়াসে এড়িয়ে যাচ্ছে। আটাশ বছর যাবত গাড়ি চালান ড্রাইভার কেফায়েতুল্লাহ। এমন বজ্জাত আর সাহসী যাত্রী তার জিবনে এগুলোই প্রথম। দুটি মেয়েকে কিছুতেই বুঝানো যাচ্ছে না। ওরা লাফ দিবেই। তাদের মধ্যে একজন হিন্দু আর অপরজন মুসলিম। মুসলিম মেয়ে কলছুমা হিন্দু মেয়েটাকে বলছে, দেখেন দিদি লাফ দিয়ে না পড়লে গাড়ি যে কোন সময় কোথাও না কোথাও বিরাটভাবে ধাক্কা খাবে। তখন কেউই বাঁচবে না। তবে শুনুন- চলুন আল্লাহর নাম নিয়ে দু’জন লাফ দেই। ঈশিতা চক্রবর্তীর কপাল কুচকে উঠে “আল্লাহ কেন আমি তো আমার ভগবানের নাম নিয়েই লাফ দেব” কিছুটা রেগে জবাব দেয় কলছুমা, “দেন দেন, দেখবেন মরনের সময়ও বুঝলেন না, যদি আল্লাহর নাম নিয়ে লাফ দেন তবেই বাঁচবেন, নয়তো নিচে পইড়া মরন অইবো” গাড়িটা এখনও প্রচণ্ড রকমের ঝাকুনি খেতে খেতে চলছে। কবে যে কোথায় পড়বে। কথাটা শেষ করতেই দোলতে দোলতে পেছনের দরজায় গিয়ে দাড়ায় ঈশিতা চক্রবর্তী। এক্ষুনি লাফ দেবে। রাস্তার ডান দিকে সামনে একটা লম্বা পানির খাদ দেখা যাচ্ছে। পানিতে পড়লে তো ভাল কিন্তু ছিটকে গিয়ে রাস্তায় পড়লে মাথা ফেঁটে ভর্তা হয়ে যাবে। তবে আসলেই কি আল্লাহ বাঁচাবে। গভীরভাবে কথাটি রেখাপাত করে ঈশিতা চক্রবর্তীর ভেতর। তাই প্রকাশ্যে নয়, প্রকাশ্যে বললে তো কলছুমা শুনে ফেলবে। তাই মনে মনে গভীর বিশ্বাস রেখে আল্লাহর নাম নিয়ে লাফ দেয় ঈশিতা চক্রবর্তী। কলছুমা চোখ বড় বড় করে পেছনের দিকে তাকিয়ে আছে। কি আশ্চর্য । মেয়েটা তো বেঁচেই গেছে। বাস থেকে দেখা যাচ্ছে লাফ দেয়ার পর কয়টা ধাক্কা খেয়েই খাদে পড়ে যায় ঈশিতা। খাদ থেকে উঠে দাড়ায়।

এতোক্ষণে প্রায় আধাকিলোমিটার পথ পার হয়ে গেছে গাড়িটি। বিকট শব্দ করতে করতে আরো তিন চারটি ঝাকুনি দিয়ে উঠে।

কলছুমার ঠোঁট দুটি তখন ঘনঘন উঠানামা করছে। অবিরাম তাসবিহ জঁপছে। ড্রাইভারও অবিরাম ব্রেক পেডেল চেপে চেপে ট্রাই করছে। কাজ হচ্ছে না। যাত্রীরা আতংকিত। চরম আতংক নিয়ে কলছুমাও লাফ দিতে চায়। কারণ গাড়ির অবস্থা মারাত্নক পর্যায়ের বেগতিক। দরজার সামনে যায় কলছুমা। এমন বিপদসংকুল সময়ে কেউ কাউকে আটকানোর অধিকার নেই। কারণ এখন আত্নরক্ষার পালা। লাফ দিয়ে পড়ে গিয়েই যদি কেউ বেঁচে যায় তবে দিক। কলছুমা দরজার দিকে একটি পা বাড়ায়, আর মনে মনে ভাবে হিন্দু মেয়েটি তো নিশ্চই ভগবানের নাম নিয়েই লাফ দিয়েছে। তার ভগবান তাকে বাঁচিয়েই দিল। ভগবান তাহলে আছেন। দূর্বার একটি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগতে থাকে, তার বাঁচার দরকার। কে তাকে বাঁচাবে, ভগবান না আল্লাহ। এতো কিছু ভাবারও সময় নেই। বাসটা যেভাবে উল্টাপাল্টা দড়ি ছেঁ বাছুরের মত দৌড়াচ্ছে, যে কোন সময় কোথাও ধাক্কা খাবেই। তাই এই দুদোল্যমান অবস্থা থেকে মনে মনে বলে, তাহলে দু’জনকেই স্মরণ করি। হয়তো ভগবান কিংবা আল্লাহ, একজন তো বাঁচাবেই। লাফ দিয়েই বলে “হে আল্লাহ! তুমি বাঁচাইও, হে ভগবান! তুমিও একটু রক্ষা করিও”

নিচে পড়ে ধুম করে একটা শব্দ হয় শুধু, এই শব্দটাই পর্যন্ত কানে যায় কলছুমার। ছিটকে গিয়ে পিচ ঢালা পথে পড়ে সমস্ত শরীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনো তার জ্ঞান আছে। যে জ্ঞান তাকে একটি বিশ্বাসের উপর অটল থাকতে শেখায়নি। তখনো মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয় কলছুমা আর কাঁতরকণ্ঠে বলে ভগবান, তুমি বড় হিংসুক। ঈশিতাকে বাঁচাতে পারলা….। তখন ঈশিতা পেছন থেকে দৌড়ে এসে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত কলছুমাকে কোলে নেয়। দেখে এখনো দেহে প্রাণ আছে। বলে, বোন আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। আমি তো তোমার কথামতই আল্লাহর নাম নিয়েই লাফ দিয়েছি। তখন চোখ দুটি বড় করে মাত্র একবার তাকায় কলছুমা। মানুষের ভীড় জমে উঠে রাস্তায়। নিভৃতে আবার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে যায় মেয়েটির।

টীকা : ছোটগল্পঃ “বিশ্বাস হোক দৃঢ়তর” সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং এ কল্পনার দায়ও একটি ঐতিহাসিক পটভূমির পুরোনো আস্তরণে ঢেকে পড়া ঘটনার উপর পড়ুক। যা আমি শুনেছি এবং আমার মত করে গল্প লিখেছি।

Comment

Share.

Leave A Reply