ছোটগল্প : পরাজয়

0

আযাদ আবুল কালাম ::

উনিশটি মামলার ফেরারী আসামী যখন রাত দেড়টার সময় দরজার কড়া নাড়ে তখন হুশ ঠিক থাকবার কথা না। কিন্তু পুরোদমে ঠিক আছেন মতিন রহমান। বাইরে থেকে পরপর চারবার দরজায় থাবা দিল। চতুর্থ থাবার আওয়াজে ঘরের সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। লুঙ্গী ঠিক করতে করতে দরজার কাছে এসে বুক টান করে ধমকানি দিয়ে ভেতর থেকে প্রশ্ন করলেন “কেডারে এতো রাইতে?” না গরম না ঠান্ডা, মাঝারী ধরনের আওয়াজে জগলু বলল “আমি চেপা, দরজা খুইল্যা দ্যান”

মানে চেপা জগলু। চেপা জগলুকে চিনে না এমন লোক এলাকায় কম। নাই ই বলা যায়। জগলুর যেমন এলাকা জুড়ে বিশাল কুখ্যাতি আছে, মতিন রহমানেরও এলাকা জুড়ে সুখ্যাতি রয়েছে। উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, পাশাপাশি খুব দ্বীনদার লোক। তার দ্বীনদারীর জন্যই এলাকায় এতো সুখ্যাতি।

মেঘ ডাকা ঘুটঘুটে এক আধাঁরী রাত। গলির দুই মোড়ে দু’জন চৌকিদার। মাঝে মাঝে চৌকিদারদের গলা ফাঁটানো হাঁক আর নিশীথের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর হুঁউ হুঁউ ডাক ছাড়া সম্পূর্ন নিরব নিস্তব্দ এই শহর। চারদিকের ভয়ংকর নিরবতার ভেতর হঠাত্‍ গভীর রাতে এলাকার একজন নামকরা সন্ত্রাসী ‘জগলু’র নামটা শুনার পর বেচারা ভয়ে কাঁপছেন।

বড় মেয়ে নাঈমা ঘুম চোখে ডেকে বলে আব্বু কে ডাকে? ফিসফিস করে বলেন ‘জগলু’ । চমকে উঠে মেয়েটি। কল্পনা করতে থাকে সেদিনের চিত্রটি। রাস্তায় কি নোংরামী আচরণ করেছিল তার ক্লাসমিটের সাথে। দরজার বাইরে জগলু দাড়িয়ে আছে ভেবে বুকের ভেতরটা হীম হয়ে উঠে নাঈমার।

বেশ কয়েক মাস থেকে তো চেপা জগলুকে দেখা যাচ্ছিল না। এলাকাটা বড় শান্ত ছিল। তিনবার কারাগারে গিয়েছে। প্রথমবার টানা দেড় বছর, দ্বীতিয়বার এগারো মাস। তৃতীয়বার উনত্রিশ দিন। প্রতিবারের রিমান্ডে জগলুর অবস্থা বেহাল ছিল। নোখ ছেড়া ছিল, প্লাসের ছেঁচা খেয়ে কয়েকটা আঙ্গুলের অর্ধেকটা প্রায় পচেঁ গিয়েছিল। পা একটি ভাঙ্গা ছিল। ডিম থেরাপী খেয়ে নাকি অজ্ঞান হয়ে হুশ ই ফিরছিল না। পরে কিভাবে যে বাঁচালো কারাগার কর্তৃপক্ষ। একবার একটি মেয়েকে ধর্ষনের অভিযোগে জগলুকে তিন দিনের রিমান্ড করা হল। সেখানে সরাসরি তার যৌনাঙ্গের সাথে বিদ্যুতের ক্লিপ লাগিয়ে শক দেয়া হয়েছিল। একেকটা শক খেয়ে আঁকাশ কাঁপিয়ে চিত্‍কার করেছিল, দোষ স্বীকার করে তখনও বলেছিল আর কখনো এমন করবে না। বড় কোন দলের মদদ পেয়ে উনিশ দিন পর বেরিয়ে এসে ঠিক আরো চারটি ধর্ষনের মামলা খেয়েছিল জগলু। এই হল জগলুর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এই সন্ত্রাসবাজিটাই জগলুর জীবনের বড় একটা পাওনা। কোন মানুষের প্রত্যেকটা প্রাপ্তির পেছনে কারো না কারো হাত থাকে। জগলু তার জীবন থেকে যা পেয়েছে তাতে কারো হাত নেই, তবে যা পায়নি তার পেঁছনে আইনের শাসনে যথেষ্ট ত্রুটির হাত আছে।

জগলু এই সমাজের দ্য ব্ল্যাক লিষ্ট অব লিডার। কিন্তু এই প্রাপ্তিগুলোর জন্য এ দেশের আইন আদালতকে দায়ী করার কোন যুক্তি নেই। যুক্তি নেই এই কারণে, আদালত তার উপর যথাযথ শাস্তি প্রয়োগ করেছে, তাকে বার বার রিমান্ড করেছে। আকাশ কাঁপানো চিত্‍কার করিয়ে অপরাধ থেকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহন করেছে। এতোসব রিমান্ডের পর জগলুর শরীরে চরম পরিবর্তন এসেছে, চেহারা সুরত পাল্টেছে, ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। আঙুলে পঁচন ধরেছে। সেই ক্ষতগুলো এক সময় সেড়ে উঠেছে। পাক্কা খেলোয়াড়ের মত জগলু আবার মাঠে নেমেছে, বেটে বলে অনায়াসে ছক্কা পিঠিয়ে গিয়েছে অবিরত। চার চারবার ধর্ষন, ডাকাতি, অত্যাচার, ছিনতাইয়ে দ্য ব্ল্যাক লিষ্ট অব লিডার খেতাব পেয়ে ইনিংস জয়ের উল্লাসে পথে ঘাটে দাপিয়ে বেড়িয়েছে।

অথচ সেই জগলুর মুক্তির জন্য আজ স্বয়ং মতিন রহমান আইনের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন। স্থানীয় জেলা পুলিশ সুপারের রুমে তিনি একা। বাইরে দাড়িয়ে আছে জগলু। জগলুর উপর থেকে সবগুলো মামলা ডিসমিস করে নিতে এসেছেন তিনি। ব্যাপারটা অতি আশ্চর্যজনক হলেও মতিন রহমানকে জগলুর দলের লোক বলা যাবে না। কিন্তু জগলু মতিন রহমানের দলের কি না সেই সন্দেহ কেটে যাবে দরজা খুলার পর। কি হয়েছিল রাত দেড়টার সময়।

আবার যখন জগলু দরজায় টকটক করল, শিউরে উঠেন মতিন রহমান। নিশ্চই তার হাতে রাম দা কিংবা পিস্তল জাতীয় কিছু আছে। আর দরজা না খুললেও বিপদ। জগলু যা চায় তাই ঘটায়। যে কোনভাবে একটা ঘটাবেই।

আর চারবার দারজায় থাবা দিল জগলু। খুলছি খুলছি বলেই দেরি করছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভাবলেন যা হয় হোক। পিস্তল হোক আর দা হোক দরজা খুলেই বুক বরাবর জোরসে একটা লাথি বসাবেন যাতে করে সাথে সাথে পড়ে যায়। তারপর পরিস্থিতি বলে দেবে। মেয়েকে বললেন আল্লাহকে ডাকরে মা।

দরজা খুলে লাথি বসানোর আগেই মতিন রহমানের পায়ে হুমড়ী খেয়ে পড়ে গেলেন একজন ধবধবে সাদা পোষাকদারী দাড়িওলা নূরানী চেহারার যুবক। মাথায় টুপি, পরনে পাঞ্জাবী, হাতে পিস্তল নয় চকচক করছে একটি রেডিয়াম তাসবিহ। বড় বেশি অবাক হয়ে অবিশ্বাস্য কন্ঠে মতিন রহমান বলে উঠলেন তুমি জগলু ? জ্বি চাচা । তুমি সত্যি জগলু নাকি ফেরেশতা ? চাচা আমি জগলু। জগলু চোখের পানি ছাড়তে ছাড়তে সব ইতিবৃত্ত খুলে বলল। আজ থেকে তিন মাস আগে কারা তাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল। তারপর কি হল।

পুলিশ সুপারকে এক পর্যায়ে মতিন রহমান বললেন আমি কথা দিলাম স্যার চেপা জগলুকে কখনো আর আপনারা অপরাধী দেখতে পাবেন না। পুলিশ সুপার রেগে গিয়ে বলেন “মতিন রহমান জানেন আপনি একজন রিমান্ড মঞ্জুর ফেরারী আসামীর মামলা উঠাতে এসেছেন ! ” বড় স্বতঃস্ফুর্ততায় মতিন রহমান বলে উঠলেন আপনারা তো টানা দেড় বছর ওকে রিমান্ডেই রেখেছেন স্যার। হয়নি। এই পৃথিবীতে ভ্রাম্যমান আরেকটি আদালত আছে যেখানে চল্লিশ দিন জগলুর রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছিল। অবশ্য বিশ দিন পার হবার আগেই রাতের গভীরে সেজদায় পড়ে জীবনের সমস্ত অপরাধের জন্য কান্না যে শুরু করেছিল এখনো কেঁদে কেঁদে দিন যায় সেই ছেলেটিকে একবার দেখুন। বলেই ডাক দিলেন। এসে জগলু যখন সালাম করল, “আশ্চর্য তো!” বড় মায়াবী চোখে তাকিয়ে থাকলেন পুলিশ সুপার।

এক্ষুনি না হলেও মামলা অবশ্য আস্তে আস্তে শেষ করবেন বলে জানালেন পুলিশ সুপার। আসার সময় মতিন রহমান বলে আসলেন স্যার রিমান্ড শরীরে হয় না। হয় আত্নায়। এটা আপনারা জানেন না। জানে ইসলাম। তাবলীগওয়ালারা। দু’জন যেতে যেতে পেছন ফিরে দেখলেন পুলিশ সুপারের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো মুচকী হাসি লেগে আছে। পরাজয়ের।

Comment

Share.

Leave A Reply