ইসলামী সংগঠন ভাঙে কেনো?

0

ইকবাল হাসান জাহিদ

জমিয়ত কেনো ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারছে না?

আমরা রাজনীতি করি না। রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝি না। কিন্তু ইসলামের নামে রাজনীতিতে যা কিছু হয় বা হচ্ছে তা দেখি, শুনি, মুখ ব্যুজে হজম করার চেষ্টা করি। একেবারে লাইনচ্যুত হয়ে কাউকে ডুবে যেতে দেখলে চুল টেনে ভুলগুলো শুধরে দেবার চেষ্টা করি। এইখানেই যত দোষ নন্দঘোষ।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস হেফাজতের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেন, দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠলো। দেশের আলেম ওলামা হতাশ হলেন। জমিয়ত শোকাচ্ছন্ন হলো। দলে মহাসচিব-পদ শূণ্য হলো। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট মাওলানা শাহীনূর পাশাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হলো। একজন যোগ্য ব্যক্তি শাহীনুর পাশার উপর দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় দলটি কর্তা হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও গোছাতে পারলো। ইসলামী রাজনীতি মানেই
আল্লাহর যমিনে আল্লার দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ইসলামী সংগঠন মানেই দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সংগঠন। এখানে দল, নেতৃত্ব, পদ কিংবা ক্ষমতার মোহ কোনোদিনই মুখ্য বা কাম্য নয়। এবং এ আদর্শই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের।

মুফতি ওয়াক্কাস হেফাজতের মামলায় কারাগারে। শাহিনূর পাশার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের আনন্দে সিলেটে হলো আনন্দ মিছিল। দেশব্যাপী ফুলেল শুভেচ্ছা আর সংবর্ধনা দেয়া শুরু হলো। ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করা হলো সিলেট সহ বিভিন্ন জেলায়। নতুন দায়িত্ব পেয়ে নিজেকে গোছানোর আগেই সংবর্ধনায় অপ্লুত হলেন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল। কারাগারে বসে মুফতি ওয়াক্কাস আনন্দ অশ্রু ঝরালেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল পেয়েছে জমিয়ত। ইসলামী রাজনীতির নতুন আরেক দিগন্ত উন্মোচিত হলো জাতির সামনে। আলোচনা সমালোচনা হলো বিভিন্ন মহলে। অনাকাঙ্ক্ষিত সংবর্ধনা ও ফুলেল শুভেচ্ছায় সেদিন শাহিনূর পাশা স্বাভাবিকত বিব্রতই হওয়ার কথা।

হেফাজতের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও আরো একটি দল থেকে দলছুট হয়ে এলেন কিছু নেতা। তাদেরকে দেয়া হলো ফুলের মালা। দেশব্যাপী দেয়া হলো বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে সংবর্ধনা। ফুলের মালা গলায় নিয়ে অর্ধ শতাধিক নেতা দেশবাসীকে হাত নাড়িয়ে উষ্ণ আলিঙ্গন জানালেন। বর্ণাঢ্য সংবর্ধনায় ভরে গেলো তাদের জীবনের কয়েক মাস। তারা একটা ইসলামী রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটা ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের ধন্য মনে করলেন। ফুলের শুভেচ্ছায় জীবনকে রাঙিয়ে তুলার নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।খেলাফত মজলিস থেকে এসে এই দলে তারা শান্তির পায়রা খুঁজে পেয়েছেন বলেও মন্তব্য করলেন।

২০১৫ সালে কাউন্সিল হলো জমিয়তের। দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ উদ্দিনপনা নিয়ে নতুন কমিটি হলো। একটা ইসলামী রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল হিশেবে স্বাভাবিকতই দেশের মুসলিম জন সাধারণের চোখ থাকলো জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দিকে। কাউন্সিল সম্পন্ন হলে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ। সিলেটী নতুন দায়িত্বশীলদের থানায় থানায় সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন হলো। সংবর্ধনা আর ফুলেল শুভেচ্ছায় ভরে উঠলো ইসলামী রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কতিপয় নেতৃবৃন্দের বর্ণাঢ্য জীবন।

গত মাসে ইন্তেকাল হলো ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী ওমর ফারুকের। জমিয়ত শিবিরে নেমে এলো শোকের ছায়া। ছাত্র জমিয়ত নেতা হারানো বেদনায় দিশেহারা। ত্যাগী ও নিষ্টাবান নেতার আকস্মিক ইন্তেকালে দ্বিধাগ্রস্থ ছাত্র জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটি। সিদ্ধান্ত হলো ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী নির্বাচন হবে। গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় জমিয়ত নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে সিলেট জেলা সভাপতিকে সভাপতির দায়িত্বে রেখেই তাকে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ দেয়া হলো। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে শুরু হলো তাকে মিষ্টি বিতরণের অনুষ্ঠান। শুরু হলো তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর হিড়িক। সদ্য মরহুম ওমর ফারুকের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার মা-বাবা এখনো অশ্রু ঝরাচ্ছেন। সারা দেশের জমিয়ত কর্মীরা এখনো এখনো ওমর ফারুকের হাসিমুখ আর দলের ত্যাগ তিতিক্ষার স্মৃতি চোখ থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না, ঠিক তখনই ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারীকে দেয়া হলো বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা। দেয়া হলো ফুলেল শুভেচ্ছা। সংবর্ধনায় উপস্থিত হয়ে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্রেটারী একই সাথে সিলেট জেলা সভাপতি সংবর্ধনা না নেয়ার ঘোষনা দিলেন।

আমাদের জানা উচিত, ইসলামী রাজনীতি আর সাধারণ বস্তুবাদী রাজনীতির পার্থক্য। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাকে ফুলের শুভেচ্ছা জানানো হলো। আওয়ামীলীগে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সংবর্ধনা দেয়া হলো। তাই বলে জমিয়ত মজলিস কিংবা জামায়াতেও দেয়া হবে, দিতে হবে, এমন চিন্তা এমন দর্শন একটা ইসলামী সংগঠনে তৈরী হয় কীভাবে? জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজিলস, ইসলামী আন্দোলন কিংবা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে এমন সংস্কৃতি চালু থাকলেও আমার জানা নেই। জামায়াতে ইসলমীর রাজনীতিতে কোনো সংবর্ধনা আমার চোখে পড়েনি। খেলাফত মজলিসে ফুলের মালা দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে দেখিনি। ইসলামী শাসনতন্ত্রে সংবর্ধনা নিতে দেখিনি কোনা দায়িত্বশীলকে। সংবর্ধনা, ফুলেল শুভেচ্ছার এই বস্তুবাদী অপরাজনীতির চর্চা ওলামায়ে হক্কানীয়তের দলেই চর্চিত হবে কেনো।

যদি বলা হয়, এমন সব উদ্ভট চরিত্র তৈরী করছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এর জন্যা কেন্দ্রীয় কমিটির দায়ভার নেই। তাহলে কি বলতে হবে কেন্দ্রীয় কমিটির চেইন অব কমান্ড এত চুড়ান্ত পর্যায়ে ভঙ্গুর হয়েছে? আনুগত্যের অনুশাসন আর আমীরের নির্দেশনা গোটা সংগঠন তথা অনুসারীবর্গের উপর ফরজ নয়কি? ইসলামী রাজনীতির পরম এই আদর্শ উলামায়ে দেওবন্দের রাজনৈতিক চেতনার দল জমিয়তেই যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চর্চিত না হয়, তাহলে রাশিয়ান কমিউনিজম কিংবা চিনা কমিউনিস্টদের দলে কি এর খোঁজ করতে লাগবে।  …অসমাপ্ত!

Comment

Share.

Leave A Reply