মানবিক আবেদনে কি হেরে যাবে বাংলাদেশ?

0

ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল ::

এপারে ওপারে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানুষ অবলোকন করছে। বর্তমান সময়ে রোহিঙ্গারা সবচেয়ে মজলুম একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যার মধ্যে সামান্যতম মানবতাবোধ রয়েছে সে কখনো রোহিঙ্গাদের প্রতি দরদহীন চোখে থাকাতে পারে না। জুলুমের পথ বেছে নিতে পারে না।

মানুষ, প্রতিবেশী ও মুসলিম এ তিনটি কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়েছে। এটা সারা দুনিয়ায় মাতামাতি হচ্ছে। প্রশংসা হচ্ছে। কিন্তু একদিকে আমরা অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি আর অপরদিকে কিছু অসাধু চক্র রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নেশায় মেতে উঠেছে। আমরা কি খবর রেখেছি?

অসাধু এ চক্রটি রোহিঙ্গাদের সাথে অমানবিক আচরণ করছে। যা আমাদের সব ভাল কাজের পাওনাটুকু বিনষ্ট করে দিচ্ছে। মজলুম অসহায় মানুষগুলোর ক্ষুধার্ত নিথর দেহ ও চোখের পানি তাদের জালেম, শক্ত, পাষাণ হৃদয়ে একটুও নাড়া দিচ্ছে না।

সেখানে যা ঘটে যাচ্ছে

এক. ১৫ থেকে ২০ মিনিটের রাস্তা পার করাতে নৌকা মাঝিরা প্রত্যেকের কাছথেকে ৩ হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করছে। এককথায় একটি নৌকায় ৫০জন যাত্রী তুলে তাদের কাছথেকে ১৫-২০ মিনিটে হাতিয়ে নিচ্ছে দেড় লক্ষ টাকা। এরপরও জুলুমের শেষ নয়, এই নৌকা মাঝিরা আগত নারীদের সমস্ত স্বর্ণালংকার কেড়ে নিচ্ছে। কেউ চাপে ফেলে কৌশলে অতি কম মূল্যে তাদের দামী জিনিষপত্র নিয়ে যাচ্ছে।

দুই. সরকার দলীয় লোক পরিচয় দানকারী সেখানকার কিছু অসাধু ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের সাথে নিয়ে আসা গরু, মহিষ, ছাগলগুলোর প্রত্যেকটি ১ থেকে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ পয়সা না দিয়েই ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে।

তিন. প্রতিটি বিকাশের দোকানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের মালিকরা সবধরণের পণ্যের দাম দ্বিগুণের চেয়েও বেশ করে দিয়েছে। বিকাশ ব্যবসায়ীরা ১ হাজার টাকার মধ্যে ৭ শত টাকা পরিশোধ করছে। আর বাকি ৩০০ টাকা মেরে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা স্বর্ণ বিক্রি করতে চাইলে স্বর্ণের দোকানদাররা ন্যায্য মুল্য দিচ্ছে না। নাম মাত্র মুল্যে কৌশলে স্বর্ণ কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

চার. সুন্দরী যুবতী নারীদের বিয়ে ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অত্যন্ত কৌশলে ভাগিয়ে নিয়ে বন্ধ ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কিছু মেয়েকে পতিতালয়ে নিয়ে জোর করে দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলেও খবর আসছে।

পাঁচ. মা হারা, বাবা হারা অনেক শিশুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে অসাধু কিডনী ব্যবসায়ীরা। অনেক শিশু কোথায় আছে, কোন অবস্থা আছে, কার আশ্রয়ে আছে কেউ জানে না।

ছয়. বিদেশী অনেক এনজিও সংস্থাগুলো থেকে গ্রহণ করা ত্রাণ সামগ্রী সরকার দলীয় লোকেরা তাদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় নিজেদের দলীয় লোকদের বন্টন করে দিচ্ছে। যার ফলে অসহায় রোহিঙ্গারা ত্রাণের বড় একটি অংশ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে।

পৃথক দুটি বক্তব্য

এক. শরণার্থী শিবির থেকে এক ভাই ফেসবুকে লিখেছেন, নৌকা ভাড়া তিন হাজার টাকা নেই বলে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে এসে ঢুকতে পারে নি। নদী তীরে তারা চরম খাদ্য সংকটে ভূগছেন। গাছের লতাপাতা খেয়ে জীবনকে কোন মতে বাচিয়ে রেখেছেন। আরো দু চার দিন পার হলে খ্যাদ্যের অভাবে ক্ষুধার জ্বালায় এসব মানুষ করুণভাবে মৃত্যু বরণ করবে। এদের জীবন বাচানোর জন্য পাষাণ নৌকা মাঝিরা একটুও দরদ দেখাচ্ছে না। মানবতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। এসব মানুষগুলোকে বাচানোর জন্য তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।

দুই. একটি ভিডিওতে দেখলাম একজন চিকিৎসক ভাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেছেন, শরণার্থীরা ক্ষুধার্ত। খাদ্য সংকটের কারণে আশ্রয় নেয়া প্রত্যেকটি শরণার্থী অতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই মুহুর্তে তাদেরকে সুস্থ রাখতে খাদ্য, খাবার স্যালাইন সহ প্রচুর পরিমানের ঔষুধের প্রয়োজন। তিনি শরণার্থী শিবিরে পুরাতন কাপড়ের পরিবর্তে খাদ্য, খাবার স্যালাইনসহ ঔষধ সামগ্রী নিয়ে সবাইকে অতি তাড়াতাড়ি হাজির হতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

মানবতার ফেরীওয়ালারা কোথায়?

শাহরিয়ার কবির, সুলতানা কামাল, জাফর ইকবাল, মুন্নি সাহা, মিতা হক প্রমুখ চেতনাবাজ মানবতার ফেরীওয়ালারা আজ কোথায়? মায়ানমারে বৌদ্ধগোষ্ঠী নারীদের গণহারে ধর্ষণ করছে। শিশুদের হত্যা করছে। নারী, পুরুষ ও শিশুদের ক্ষতবিক্ষত লাশ নাফ নদী দিয়ে সারা দুনিয়া প্রদক্ষিণ করছে। বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, জুলুম করা হচ্ছে। শরণার্থীরা খাদ্য সংকটে ভুগছে। অথচ তাদের চেতনায় একটুও নাড়া দিচ্ছে না। পাবলিক প্লেসে মানবতার ফেরী করে বেড়ালেও আজ তারা মানবতার পাশে দাড়ানোর সৎ সাহস দেখাতে পারেনি। তারা যা বলে তা করে না এটাই আজ প্রমাণিত হয়েছে।

সেলিব্রেটিরা কোথায়?

যারা খেলাধূলায় সেলিব্রিটি, মাসে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করেন। যারা পয়সাকড়িতে সেলেব্রেটি, বিভিন্ন ব্যাংক বীমা, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক। যারা মিডিয়া জগতের সেলিব্রেটি, টিভি ও পত্রিকার মালিক। যারা সিনেমা জগতের সেলিব্রেটি, একেকটি ছবি করে লাখ লাখ টাকা কামাই করেন তারা আজ কোথায়? মানবতার জন্য একটুও কি কেদে ওঠে না এই সেলিব্রেটিদের মন? তাদের নিরবতা আজ প্রমাণ করেছে মানবতার জন্য তাদের কোন কর্মসূচী নেই। আর মানবতার জন্য যাদের কর্মসূচী থাকে না তারা সমাজকে কিছু দিতে পারে না। সমাজের জন্য কিছু করতে পারে না।

মানবতার পাশে আলেম সমাজ ও ইসলামী সংগঠনের নেতাকর্মীরা

আজ মানবতার পাশে দাড়িয়েছে দেশের আলেম সমাজ। মানবতার পাশে দাড়িয়েছে হেফাজতে ইসলামসহ দেশের ইসলামী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। মানবতার পাশে দাড়িয়েছে তাবলীগ জামায়াতের কর্মীরা। মানবতার পাশে দাড়িয়েছেন অনেক রাজনৈতিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা মুসলিম গণহত্যা বন্ধের দাবীতে একদিকে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে কঠিন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে কঠোর হুসিয়ারি উচ্চারণ করে যাচ্ছেন আর অপরদিকে শরণার্থী শিবিরে অর্থ দিয়ে, শ্রম দিয়ে সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। তাঁদের এই ত্যাগ ইতিহাসের পাতায় সোনালী হরফে লিখা থাকবে।

শেষকথা : যেসব অসাধু বাঙ্গালী চক্র রোহিঙ্গাদের সাথে অমানবিক আচরণ করছে তাদেরকে অতি দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এই কুলাঙ্গার অসাধু চক্রের কারণে মানবিক আবেদনে কি হেরে যাবে বাংলাদেশ? গুটিকয়েক অমানুষের কারণে বাংলাদেশ হেরে যেতে পারে না। মানবকল্যাণের কর্মসূচীতে বাংলাদেশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। এবিষয়ে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্তা নিতে হবে।

মানুষ মানুষের জন্য একথা সর্বজনস্বীকৃত। ১৯৭১ সালে আমাদের ওপরও এমন তুফান এসেছিল। সে সময়কার জুলুমের চিত্র সরাসরি আমরা না দেখলেও ইতিহাস থেকে আমরা যা পেয়েছি তা খুবই মর্মান্তিক ও পীড়াদায়ক। আজকে আমরা স্বাধীন হয়েছি বলেই রোহিঙ্গারা আমাদের কাছে আসতে পেরেছে। আমরা তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা প্রয়োজন। আমরা যদি এ মজলুমদের উপর আবারো জুলুমের ষ্টিম রোলার চালাই তাহলে নিশ্চিত আল্লাহর গজব আমাদের উপর নেমে আসবে। আল্লাহ আমাদের মাঝে মানবতাবোধ সৃষ্টি করে দিন। মানবিক আবেদনে বাংলাদেশকে বিজয়ী করুন।

Comment

Share.

Leave A Reply