সাহসেই মুক্তি

0

কুতায়বা আহসান

এক.
মাগরিবের পর থেকেই পথ হাঁটছে তিন তরুণ। ওমর, আব্দুল কাদির ও ফারহান। লক্ষ তাদের ক্যাংডং পাহাড়ের উত্তর প্রান্ত। আজকের রাতটা ওরা ওখানেই কাটিয়ে দিতে চায়। এরপর অাল্লাহর নাম নিয়ে সীমান্তের কোনো এক দিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের ইচ্ছা। স্বজাতির কাছে অাশ্রয় প্রার্থনার প্রবল তামান্না। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর তিন তরুণ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে থেমে থেমে।
পাহাড়ের পাদদেশে এসেই বসে পড়ল ফারহান। চোখে তার অশ্রু। আমি আর পারছি না। তোমরা যাও বন্ধুরা। আমার কপালে যা লেখা আছে তা-ই হবে। ক্ষুধায় কাতর দেহ নিয়ে এই সাড়ে তিনশত ফিট পাহাড়ের উপর চড়ে ওপ্রান্তে আশ্রয় নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
মাগরিবের নামায আদায়ে মসজিদে গিয়েছিল তিন তরুণ। নামাযে থাকতেই সেনা, বৌদ্ধভিক্ষু ও সন্ত্রাসি বৌদ্ধ গুণ্ডারা মিলে আগুন দিয়েছিল তাদের বস্তিতে। সে সাথে সমান তালে চালাচ্ছিল সয়ংক্রিয় অস্ত্রের ফায়ার। ঘরের ভেতরে জ্বলে মরছিল অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। যুবক যারা ছিল তারা পালিয়ে যাচ্ছিল। এই পালাতে গিয়ে অনেকে জীবন থেকেই পালিয়ে যাচ্ছিল, আবার অনেকে কোনো মতে আশ্রয় নিচ্ছিল বিভিন্ন ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে।
ওমর আব্দুল কাদির আর ফারহানরাও মসজিদ থেকেই পালাচ্ছিল অজানার উদ্দেশ্যে। কিছু দূর এসে আব্দুল কাদির প্রায় স্বগতোক্তির মতোই বলছিল আমরা যাচ্ছি কোথায়? গন্তব্য আমাদের কোন জায়গায়?
ওমর বলেছিল আপাতত রাতটা আমরা ক্যাংডন পাহাড়ের উত্তর প্রান্তর একটা নিরাপদ গুহায় কাটিয়ে নেবো। রাত পোহালে পরবর্তী চিন্তা করবো।
– তুমি ওদিকে গিয়েছ কখনো? প্রশ্ন করলো ফারহান।
– দুবৎসর আগে আব্বার সাথে পাখি শিকারের উদ্দেশ্যে ওদিকে গিয়েছিলাম। পাহাড়ের উত্তর প্রান্তে রয়েছে বিশাল একটা বিল। ওদিকে কেউ আশ্রয় নিতে যাবে আশা করি এটা কল্পনা করবে না ওরা। তা ছাড়া ও প্রান্তে যাবার পথটা যে পরিমাণ দুর্গম তাতেও নিরাপত্তার ব্যাপারে কিছুটা আশ্বস্ত হওয়া যায়।

দুই.
– দেখ ফারহান! আমরা লক্ষ্যস্থলের প্রায় কাছে এসে পৌঁছে গেছি। এ মুহূর্তে হতোদ্যম হতে নেই। মনটা শক্ত কর ভাই। পাহাড়ে ওঠাটাই কিছুটা কষ্টকর। কিন্তু ও প্রান্তে নামার রাস্তাটা খুবই সহজ। প্রায় দেড়শত ফিট নিচে নামলেই আমরা পেয়ে যাবো রাত কাটানোর মতো নিরাপদ প্রশস্ত গুহাটা। আদর করে মাথায় হাত রেখে বলল ওমর।
– কিন্তু আমার গায়ে যে একফোটা শক্তিও নেই? অসহায়ের মতোই উচ্চারণ করলো ফারহান।
– ওমর ও আব্দুল কাদির বুঝতে পারলো ফারহানকে ক্ষুধায় কাতর করে তুলেছে। তাকে খাবার মতো কিছু দিতে পারলে পথ চলতে পারবে সেও।
– ওমর ফারহানকে লক্ষ করে বলল: ঠিক আছে ভাই তুই এখানে একটু বসে থাক। আমরা দেখি খাবার মতো কিছু জোগাড় করতে পারি কি না। কথাগুলো বলে আব্দুল কাদিরকে লক্ষ করে বলল ওমর, তুমি ডান দিকে যাও, আমি বাম দিকে যাচ্ছি। চেষ্টা করে দেখো কোনো ফলের গাছ পাওয়া যায় কি না।
– রাত গভীর অন্ধকার। ওমরের হাতে তার মোবাইল, আর আব্দুল কাদিরের হাতে ছোট্ট একটা গ্যাস লাইটার। লাইটারে ছোট্ট একটা টর্স। ক্ষীন এ আলো নিয়েই তারা বেরিয়ে পড়লো খাবারের সন্ধানে। আল্লাহ তাঁদের সহায় ছিলেন অল্পক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলো দুজন। একজনের কোচর ভর্তি পাহাড়ি মিষ্টি কুল, আর অপরজনের কোচর ভর্তি রসে টইটম্বুর কামরাঙা।
– ফারহানের কাছে এসে খেয়ে নিল তারা সবাই। খাবার পর ওমর ফারহানের কাঁধে হাত রেখে বলল, এবার চল ভাই আমরা লক্ষ স্থলে যাই। ফারহান কোনো কথা না বলে উঠে দাড়াল। এরপর তিন তরুণ উঠতে লাগলো প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে। তারা যখন পাাড়ের শীর্ষে, রাত তখন ১০টা ১৫ মিনিট।

তিন.
– সাথীদ্বয়কে নিয়ে পাহাড়ের ওপ্রান্তে নামতে যাচ্ছিল ওমর। ফারহান এসময় পিছন থেকে জামা ঝাপ্টে ধরে তাদের ডান দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো ওমরের।
– দাঁড়িয়ে গেল সবাই। উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যাচ্ছে ওদিক। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নেড়ে মাথার লাল বসনধারীরা ঘুরঘুর করছে আলোর চারদিকে। মাঝখানে কিছু লোক চেয়ারে বসা। টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি সাময়িক একটা ছাউনি। আশপাশে পড়ে আছে বেশ কতকগুলো মোটর সাইকেল।
– ওরা বুঝতে পারলো এটা জালেমদের একটা আড্ডাখানা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওরা নামতে শুরু করলো নিচের দিকে।
– ফারহান আর আব্দুল কাদির ফিসফিস করে কথা বললেও ওমর সম্পূর্ণ নীরব। তার মাথায় তখন পাকাচ্ছিল ভয়াবহ দুঃসাহসি এক পরিকল্পনা।
– মাত্র দশমিনিটেই পৌছে যায় তারা কাঙ্খিত গুহায়। হাত পা ছেড়ে বসে পড়ে তিন তরুণ। খানিক্ষন নীরব থাকে তিনজন। তারপর শুরু হয়ে যায় বেদনার দাস্তান, বাঁচার উপায়, ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাল লয় হীন কথামালা।
– হঠাৎ ফারহান ও আব্দুল কাদিরকে থামিয়ে দিয়ে ওমর বলে উঠে কিন্তু আমি চাই প্রতিশোধ। পালিয়ে বেড়ানোর মধ্যে কোনো স্বার্থকতা নেই। আমরা পালাবার চেষ্টা করতে পারি কিন্তু মৃত্যু থেকে তো পালিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়। মৃত্যু তার নিদৃষ্ট সময়ে আসবেই। যেহেতু মৃত্যু অনিবার্য তাই শিয়ালের ন্যায় পালিয়ে বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো হামলে পড়ে এক দুটাকে খতম করে মরাই শ্রেয় মনে করি।
– বলে যেতে থাকে ওমর, আমার বিশ্বাস ওরা সীমাহীন ভীরু। এ জন্যেই ওদের হিংস্রতা এতো বর্বর। ভীরুরাই সাধারণত অধিক হিংস্র হয়ে থাকে। তোমরা জানো কিনা জানি না। ইহুদিরা মুসলমানদের কঠিনতম শত্রু। ওদের হিংস্রতা ও নৃশংসতা কিংবদন্তিতূল্য। কিন্তু আসলেই ওরা স্বভাবজাত ভীরু। ওরা কোথাও সরাসরি মুসলমানদের সাথে সম্মুখ সমরে আসে না। আসে সামনে ভিন্ন জাতিকে সামনে রেখে।
– আমরা ইউটিউবে দেখেছি ওরা ফিলিস্তিনি শিশুদের পাথরের জবাবে গ্রেণেড ছুঁড়ে মারে। বৌদ্ধদের এই হিংস্রতা দেখেও আমার মনে হচ্ছে ওরাও হবে ভীরু প্রকৃতির। আমার বিশ্বাস একবার ওদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারলে ওরা এতো দুঃসাহস দেখাতে পারতো না।
– কিন্তু আমরা ওদের বিরুদ্ধে দাঁড়াই কী ভাবে? ওদের কাছে রয়েছে সয়ংক্রিয় অস্ত্র অথচ আমাদের হাতগুলো একদম শূন্য।
– আসলে আমাদের পুরো জাতির অন্তরে এ অপয়া ধারণা জায়গা করে নেয়ার ফলেই আজকে আমাদের এই অবস্থা। আমরা যদি শুরু থেকেই প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে যেতাম তাহলে আজ আমাদেরকে অস্ত্রের জন্য চিন্তা করতে হতো না। ওদের থেকে ছিনিয়ে আনা অস্ত্রেই ওদের মোকাবেলা করতে পারতাম।
– আচ্ছা এসব পরে চিন্তা করো আগে বলো রাত পোহাবার পর এখান থেকে কোন দিকে যাবে? আমার মনে হচ্ছে এখান থেকে বের হয়ে কোথাও যাওয়া সহজ হবে না। যেহেতু পাশেই রয়েছে শত্রু ছাউনি। যে কোনো পর্যায়ে আমরা শত্রুর যান্ত্রিক চোখে ধরা পড়ে যেতে পারি।
– আমরা আর পালাব না। এখন থেকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবো ইন শা আল্লাহ। আর এই যে শত্রু ছাউনি দেখে এসেছি আল্লাহ চাহেতো রাতের ভেতরেই এর অস্থিত্ব থাকবে না। পুরো ছাউনিটা হয়ে যাবে একটা ছাইয়ের গাদা।

চার.

– তোমার মাথায় পাগলামি চড়েছে? নিরস্ত্র অবস্থায় অস্ত্রের মুখোমুখি হওয়া যে আত্মহত্যার শামিল এটা জানো? বলল আব্দুল কাদির।
– এ কথাটা শুনতে শুনতেই আমাদের রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। শুনো ফারহান আর আব্দুল কাদির! পাহাড় থেকে নামতে নামতে আমি ওদের এই অস্থায়ি ছাউনিটা ধ্বংস করার একটা পরিকল্পনা মাথায় সাজিয়ে নিয়েছি। আর সে পরিকল্পনাটা তোমাদের উভয়কে আমার সাথী হিসেবে রেখে। এখন তোমরা যদি আমার সঙ্গ দিতে না চাও তাহলেও আমি কিছু একটা করতে যাবোই। হয়ত তখন নতুনভাবে আমাকে পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে হবে।
– আব্দুল কাদির! আমার দৃঢ় বিশ্বাস—আমি কামিয়াব হবোই। আল্লাহর রহমত নিশ্চয় আমাদের উদ্যোগ দেখার জন্যে মুখিয়ে আছে। আমি বিশ্বাস করি—আমরা বের হলেই আল্লাহর সহায়তা স্রোতের ন্যায় নেমে আসবে।
– ওমরের এ তেজোদ্দীপ্ত কথাগুলো শুনে ওরা লজ্জায় কুকড়ে যায়। সে সাথে তারা নিজেদের ভেতর ইমানের উত্তাপ অনুভব করতে থাকে।
– লজ্জাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠে আব্দুল কাদির, ভাই ওমর। আমাদেরকে আর অপরাধি বানাস না, তোর পরিকল্পনা বল ইন শা আল্লাহ আমরা জীবন দিয়ে হলেও তোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ছাড়বো।
– তাহলে শুনো! আমার যে টুকু আন্দাজ পাহাড় থেকে ওদের অবস্থান আধা কিলোমিটারের চেয়ে হবে না। তোমরা আপাতত এখানে থাকবে। আমি পাগলের বেশে একবার ওদিকে একটা চক্কর লাগিয়ে ওদের অবস্থানটা ভালো করে দেখে আসবো। দরকার হলে আমার পরিকল্পনায় নতুনত্ব আনবো।
– কিন্তু ওরা যদি তোমাকে মেরে ফেলে?
– এমন সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কেননা আমার জানা মতে মুসলিম পাগলদেরকে ওরা দারুণ ভয় পায়। একবার নাকি ওদের কতিপয় যুবক এমন এক পাগলের গায়ে হাত দেয়ায় অদ্ভুত এক রোগে ভোগে কঙ্কালসার হয়ে মারা পড়েছিল। সেই থেকে এ মুসলিম পাগলরা ওদের মাথায় চড়লেও ওরা তেমন একটা ঘাটায় না। আমি ওখান থেকে এসেই তোমাদেরকে আমার পরিকল্পনা শুনাবো। তোমরা এখানে বসো আল্লাহ চাহেতো আমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসছি। কথাগুলো বলেই ওমর বাইরের দিকে হাঁটা ধরলো।

পাঁচ.
– বিকট এক অট্টহাসিতে কেঁপে উঠে পুরো সমাবেশ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৌদ্ধগুণ্ডাদের নির্যাতনের বিভিন্ন কায়দা কানুনের প্রশিক্ষণ দাতা ইহুদি মহিলা মার্থা আনতারা ভয়ে ঢুকে পড়ে ডায়াসের নিচে। ওমর একটা সদ্যভাঙা তাজা ডাল হাতে “রুমদুম” “রুমদুম” উচ্চারণ করতে করতে একটা চক্কর লাগায় জনসমাবেশের চারপাশে। পাগলের বেশেই সে ঈগল দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছিল ওখানকার সবকিছু।
– মার্থা আনতারা কাঁপছিল ঠক ঠক করে। বৌদ্ধভিক্ষুরা বুঝায় এ মূলত পাগল। আপন মনে এসেছে আবার আপন মনেই চলে যাবে। কোনো ভয় নেই ওদের নিয়ে। মার্থা ওদের কথায় আশ্বস্থ হয়ে আবার শুরু করে তার প্রশিক্ষণ। এ পর্যায়ে সে একটি সয়ক্রিয় অস্ত্র চালনার পদ্ধতি শিখাচ্ছিল।
– ওমর “রুমদুম” শব্দটি উচ্চারণ করতে করতে এক পর্যায়ে এক বৌদ্ধ যুবককে টান মেরে তাকে সরিয়ে ওর চেয়ার দখল করে বসে।
– তার শিকারি চোখ দুটো মার্থা আনতারার দিকে। মনের ভেতর গেথে নিচ্ছিল অস্ত্রটি পরিচালনার সব নিয়ম কানুন।
– এক পর্যায়ে আবার পাহাড় কাঁপানো অট্টহাসি দিয়ে ভোঁ দৌড় দেয় অন্ধকারের ভেতর। পাগল জ্ঞানে কেউ ফলো করে নি তাকে। চলে আসে সে আব্দুল কাদির ও ফারহানের কাছে।

ছয়.

– শোনো বন্ধুরা আমি দেখে এসেছি ওখানে বেশ কিছু বৌদ্ধভিক্ষু ও বৌদ্ধগুণ্ডাদের নির্যাতনের কলাকৌশল শিখাচ্ছে বিদেশি ক’জন সামরিক অফিসার ও চৌকশ একটি মেয়ে। টিনের বেড়া দেয়া যে ঘরটা রয়েছে ওটা আসলে বসবাসের জন্য নয়। ওটার একপ্রান্তে অস্ত্রগোদাম আর একপ্রান্তে রান্নাঘর। ওরা রাত্রি যাপন করে তাঁবুতে। আমি যখন ওখান থেকে চলে আসি তখন কিছুসংখ্যক যুবককে তাঁবু টানানোর প্রস্তুতি নিতে দেখেছি। তবে আমার ধারণা— বিদেশি অফিসাররা বিশালাকার বাসেই রাত কাটায়। এক ফাঁকে আমি দেখতে পেয়েছি বাসটির ভেতর রয়েছে আরামদায়ক কয়েকটি বিছানা পাতা।
– এবার তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুনো! আব্দুল কাদির তোমার গ্যাস লাইটারটি সাথে আছে তো?
– হ্যাঁ আছে।
– আমরা রাত সাড়ে তিনটার দিকে এখান থেকে রওয়ানা হবো। কাছে গিয়ে আমরা অত্যন্ত সতর্কভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে অগ্রসর হবো। ওদের অবস্থানের বাম দিকে রয়েছে গভীর একটা খাল। খালের পার ধরে এসেছে একটা আধপাকা রাস্তা। রাস্তায় দাড়িয়ে রয়েছে বেশ কটা মোটর সাইকেল। পালাতে হলে ওদেরকে এই রাস্তা দিয়েই পালাতে হবে।
– ওদের সাথে যেহেতু রয়েছে বিদেশি কিছু অফিসার তাই প্রহরা থাকা স্বাভাবিক। যদি একাধিক প্রান্তে প্রহরা থাকে তাহলে আমাদের তিনজনকে তিনদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগে প্রহরিদের নিঃশব্দে খতম করে ফেলতে হবে।
– বন্ধুগণ! কাজটা তেমন কঠিন হবে বলে মনে হয় না। দরকার কেবল সাহসের। নিশ্চয় ওরা থাকবে অপ্রস্তুত। হয়তো ঘুমন্তও থাকতে পারে। কারণ ওরা তো কখনো প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়নি। তাই আক্রান্ত হবার কোনো চিন্তাও ওদের মাথায় থাকবে না। অতএব কাজটা সমাধা করতে আশা করি কোনো বেগ পেতে হবে না।
– প্রহরিদের খতম করে দ্রুত আমাদেরকে ওদের পোষাকগুলো খুলে পরে নিতে হবে। এরপর দ্রুত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মোটর সাইকেলগুলোর কাছে চলে আসতে হবে। মোটর সাইকেলগুলোর ট্যাংকি খুলে আমাদের প্রত্যেকের লুঙ্গি এবং জামা পোট্রোলদ্বারা ভিজিয়ে নিতে হবে। ভেজা কাপড়গুলো টিনের ঘর, তাবুর চারপাশ এবং বাসের ভেতরে ও বাইরে রেখে আসতে হবে। সবশেষে আল্লাহর নাম নিয়ে আমাদেরকে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে। এটুকু আমাদের দায়িত্ব। বাকি দায়িত্ব আল্লাহর। আমার বিশ্বাস! আমরা যদি সফলভাবে আমাদের দায়িত্ব আদায় করতে পারি তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে এমন আনন্দ উপহার দিবেন যা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

সাত.

– রাত ঠিক সাড়ে তিনটা। তিন তরুণ তাদের গা থেকে খুলে ফেলেছে ছাগলের ভীরুতার পোষাক। গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে সিংহের সাহসের চাদর। সোজা পথে বারো মিনিট হাঁটতেই তারা পৌঁছে যায় তারা ক্যাম্পের কাছে।
– এবার সোজা হাঁটা বাদ দিয়ে তারা অগ্রসর হতে থাকে গড়িয়ে গড়িয়ে। সামনে ওমর, তারপর আব্দুল কাদির, তারপর ফারহান। যেন তিনটি গোখরো ফনা মেলে এগিয়ে যাচ্ছে শিকারের দিকে। চোখে মুখে তাদের বিষাক্ত প্রতিশোধ।
– কিছুটা এগিয়ে গিয়ে থেমে যায়। ওমর। ওর দেখাদেখি থেমে যায় আব্দুল কাদির এবং ফারহানও।
– শত্রুরা প্রশিক্ষণ শেষে মদ খেয়ে টাল হয়ে পড়ে আসে বেহুঁশ নিদ্রায়। ক্যাম্প এড়িয়ার ভেতরে কোনো বাতি নেই। একটা জেনারেটর চলছে দ্রীম দ্রীম আওয়াজ করে। অত্যন্ত লো ভোল্ডেজে চারপাঁচটা বাতি জ্বলছে যেন ধুকে ধুকে।
– ওমরের শিকারি চোখ দুটো খুঁজে ফিরছে প্রহরিরর অবস্থান। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পেয়ে যায় ওদের খোঁজ। একজন খালের কিনারে আরেক জন বড় বাসটির পাশে। দুজনই চেয়ারে বসা। কিন্তু ওরা সজাগ না ঘুমন্ত তা বুঝা যাচ্ছে না।
– ওমরকে হঠাৎ করে থামতে দেখে ফিসফিস কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে আব্দুল কাদির থামলে কেন?
– দেখো! দুই দিকে দুই প্রহরি রয়েছে। তোমরা পথের ধারের প্রহরির দিকে যাও, আমি ওদিকে যাচ্ছি। খবরদার! খেয়াল রাখতে হবে কোনো শব্দ করার কিংবা হাত পা ছুঁড়ার যেন সুযোগ না পায়। একেবারে নিঃশব্দে শেষ করে দিতে হবে। ওকে হত্যা করে তোমরা খালের পারে নিয়ে যাবে। শরীর থেকে জামাটা খুলে রেখে লাশ খালের পানিতে ভাসিয়ে দেবে। সাথে অস্ত্র থাকলে সেটাও নিয়ে নেবে।
– কথাগুলোই বলেই ওমর স্ক্রলিং করে বাসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আর আব্দুল কাদির ও ফারহান এগিয়ে যায় খাল পারে দাঁড়িয়ে থাকা মোটর সাইকেলগুলোর পাশে চেয়ারে বসা প্রহরির দিকে।
– আল্লাহ তাঁদের সহায় ছিলেন। বেশ জোরালে উত্তুর বাতাস বইছিল তখন। তাই অল্প বিস্তর শব্দ হলেও কারো সন্দেহ উদ্রেক করার কিছু ছিল না।
– প্রায় একই সময় একই কায়দায় তারা যার যার টার্গেটকে খুব সহজেই কাবু করে নেয়। ওরা আরামদায়ক চেয়ারে গা এলিয়ে বেঘুরে ঘুমাচ্ছিল। আব্দুল কাদির আর ওমর এই সুযোগে ক্ষিপ্র চিতার মতো এগিয়ে সাপের মতো প্রচণ্ড শক্তিতে নিজেদের বুকের সাথে ওদের গলা চেপে ধরে। কোনো শব্দ না নড়াচড়ার সুযোগ পায়নি ওরা। প্রথমে কতক্ষণ অাপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল নিজেকে মুক্ত করার জন্য। কিন্তু তা ছিল ব্যর্থ প্রয়াস। ধীরে ধীরে নেতিয়ে আসে ওদের দেহ।
– ওমর দ্রুত লোকটির পোষাক খুলে নিজের পোষাকগুলো গাঠুরি বেঁধে নেয়। এরপর লাশটা গাড়ির নিচে ঠেলে দিয়ে দ্রুত তার সঙ্গীদের কাছে আসতে থাকে।
– ওমর যতক্ষণে ওদের কাছে এসে পৌঁছে ততক্ষণে আব্দুল কাদির আর ফারহান মিলে প্রহরির পোষাক খুলে লাশটি ভাসিয়ে দিয়েছে খালের পানিতে।
– ওমর দ্রুত আব্দুল কাদিরকে তার পোষাক খুলে প্রহরির পকেটে পাওয়া চাকু দিয়ে নিজের সবগুলো পোষাক ফালি ফালি করে কেটে নেয়। আব্দুল কাদিরও ততক্ষণে প্রহরির পোষাক পরে নিয়েছে। তার এবং ফারহানের লুঙ্গি ব্যতীত সবগুলো সবগুলো একইভাবে কুটি কুটি করে কেটে নেয়া হয়েছে।
– এবার তারা সেই টুকরোগুলো নিয়ে খালের পারে মোটর সাইকেলগুলোর পাশে চলে আসে। অত্যন্ত সন্তর্পনে কয়েকটা সাইকেলের ট্যাংকি খুলে পেট্টোল দ্বারা কাপড়ের টুকরোগুলো চুবিয়ে নেয়। পরে তিনজন মিলে নিঃশব্দ সাপের গতিতে তাঁবু সে টুকরোগুলো টিনের ঘর এবং বাসের চতুর্পার্শ্বে ছড়িয়ে দেয়। ভ্যাপসা গরমের জন্য বাসের জানালা ছিল খোলা। ওমর অত্যন্ত সাফল্যের সাথে ক’টুকরো কাপড় বাসের ভেতরও ছুঁড়ে দেয়।
– ভ্যাপসা গরম শেষে জোড়ালো বাতাস ওদের ঘুমকে মরণঘুমে পরিণত করে তুলেছিল। কোনো প্রকার বিপত্তি ছাড়াই মাত্র আট দশমিনিটে খতম হয়ে যায় ওদের পেট্টোল ছড়ানোর কাজ। সবাই এসে পুনরায় জড়ো হয় খালের পাড়ে মোটর সাইকেলগুলোর পাশে।
– আব্দুল কাদির তোমার গ্যাসলাইটারটি দাও ভাই। আর ফারহানকে নিয়ে দ্রুত খালের ঢালুতে আশ্রয় নাও। আল্লাহ চাহেতো আমিও আগুন লাগানোর পরপর তোমাদের কাছে চলে আসছি।
– বিসমিল্লাহ বলে পাশে পড়ে থাকা একখণ্ড পেট্টোল চুবানো কাপড়ে আগুন ধরিয়ে সেটা ছুড়ে মারে ওমর। জোরালে বাতাস সেই আগুনকে পৌঁছে দেয় আশপাশের আরো কয়েকটা টুকরোয়। এরপর কেয়ামতের বিভিষিকা শুরু হতে সময় লাগেনি বেশিক্ষণ।
– দাউ দাউ করে জ্বলছে নরপশুদের পুরো ক্যাম্প। ওমর চলে এসেছে খালের পারে। তার হাতে প্রহরির সেই ভয়ঙ্কর মেশিনগান। জীবনে কখনো অস্ত্র না চালালেও তার বিশ্বাস সে পারবে এটা চালাতে। কারণ সে মাথায় গেথে নিয়েছিল মার্থার বলা অস্ত্রটি চালনার সব খুঁটি নাটি।
– মিনি কিয়ামত শুরু হয়ে গেছে পুরো ক্যাম্প জুড়ে। চারিদিকে কেবল আগুন আর আগুন। পুড়ে মরছে ন্যাড়া বৌদ্ধের দল। অস্ত্র গোদামে আগুন লাগার পর মনে হচ্ছিল অস্ত্রগুলোর গায়ে যেন ডানা গজিয়েছে। ওগুলো আগুনে পাখি হয়ে উড়ে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞকে আরো ভয়াবহ করে তুলছিল। কয়েকটা অস্ত্র আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উড়ে গিয়ে বাসের উপর পড়তেই পুরো বাস একটা ডিনামাইটের মতো গর্জন আকাশের দিকে লাফ দিয়ে উঠে। সম্ভবত বাসে বারুদ জাতীয় কিছু ছিল বিধায় এতো বড় বিষ্ফোরণ।
– হুলোস্তুল শুরু হয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পে। ইতোমধ্যে জ্বলে মরেছে বেশ কজন বৌদ্ধ। ওমররা নিষ্পলক সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে যাচ্ছিল। তাঁদের অন্তরে তখন অদ্ভুত প্রশান্তি। কোনো ভয় চিন্তা নেই।
– ওমর দেখতে পায় প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশের মতো চলন্ত আগুন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। সবগুলো আসতে পারছে না। মাঝপথেই ঝরে পড়ছে। ওমর বুঝতে পারে ওরা পাগলের মতো খালের পানিতে ঝাপিয়ে পড়তে চাইছে জীবনের আশ্বাসে।
– টার্গেট একদম পরিষ্কার। বিসমিল্লাহ বলে চেপে ধরলো ট্রিগার। এক পশলা বুলেট বেরিয়ে গিয়ে ছেকে ধরলো জীবন্ত সে আগুনগুলোকে। বোটা ছিঁড়া আপেলের ন্যায় ঝরে পড়তে লাগলো ওরা জীবনের বৃন্ত থেকে।
– একটা জালেমও পালিয়ে বাঁচতে পারেনি সর্বগ্রাসী আগুন থেকে। মাত্র বিশ মিনিটেই পুড়ে ছাইয়ের গাদায় পরিণত হয়ে যায় শত্রুর ক্যাম্প।
– ওমররা ওখানেই সেজদায় লুটিয়ে পড়ে প্রভুর কৃতজ্ঞতায়।
– সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে পুরো ক্যাম্প এড়িয়া ঘুরে গুণে দেখে এখানে ওখানে পড়ে রয়েছে ৭০ টি লাশ। বাসের ভেতর ক’জন ছিল তা গুণা যাচ্ছিল না। কারণ ওদের দেহ ঠুকরো ঠুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপরও ওমরের মনে হচ্ছিল ওখানে দশজনের কম ছিল না।
– পুড়ে যাওয়া ক্যাম্পে ওরা তখন খাবার জাতীয় বস্তু খুজছিল। আধপোড়া যা পেয়েছিল সেগুলো সাথে নিয়ে ওরা তাদের আস্তানায় চলে আসে। খালের পানিতে আগেই অজু সেরে নিয়েছিল। চারিদিক তখন বেশ ফর্সা হয়ে এসেছে। দ্রুত তারা ফজরের নামায শেষ করে নেয়।
– নামায শেষে ফারহান জিজ্ঞেস করে এখন আমরা কী করবো?
– লম্বা ঘুম দেবো, উত্তর দেয় ওমর।
– ফারহান বলে ওরা নিশ্চয় হন্নে হয়ে সর্বত্র খুঁজে ফিরবে।
– ফিরুক। আর কোনো কথা নয়, ঘুম দাও। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন অবশ্যই।

Comment

Share.

Leave A Reply