বাতাসে লাশের গন্ধ…

0

ইলিয়াস মশহুদ

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা মুসলিম। স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে বাস করেও তারা রাষ্ট্রহীন, তাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। অষ্টম শতাব্দী থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে তাদের পূর্বপুরুষদের বসবাসের ইতিহাস আছে। তারপরও তারা নাগরিকত্বহীন। সংখ্যালঘু। পূর্বের আরাকান আর বর্তমানের রাখাইনে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের গাদাগাদি হয়ে অনিশ্চিত জীবনবাস।

রাখাইন রাজ্যটি বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া। বৌদ্ধ প্রধান দেশ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। অন্য কেউও স্বীকৃতি দেয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ‘অবৈধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করে। বাঙালি ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে ‘আঁড় চোখে’ দেখা হয় তাদেরকে। মিয়ানমারের এই ধারা ক্রমশ জোরালো হতে থাকে। ফলে রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমরা বর্ণবাদী যুগের মতো অমানবিক পরিস্থিতির স্বীকার হতে থাকে। নাগরিকত্ব অস্বীকার করার পাশাপাশি একসময় তাদের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়া হয়। শিক্ষার কোনো অধিকার নেই তাদের। উল্টো সরকারের বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক বারবার হেনস্তার স্বীকার হতে হয়। দেশ থেকে বের করে দিতে থাকে। হত্যা করতে থাকে। বিশেষতঃ গত ক’দিনে রোহিঙ্গাদের ওপরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা নিষ্ঠুরতম ও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যা হিটলার-মুসিলীনির বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকহানাবাহিনীর চালানো নির্মম, নির্দয় নির্যাতনের চিত্র দেখলে যেমন আমরা শিউরে উঠি, সেই একই চিত্র বরং আরো ভয়াবহ নির্যাতন-নীপিড়ন চলছে আজ মিয়ানমারের রাখাইনে।
কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার কবিতায় ’৭১ সালে বাংলাদেশে পাকহানাবাহিনীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে লিখেছিলেন-

              ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
              আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি
              ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে
              এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
              বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে।’

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই অমানবিক আচরণে নোবেল জয়ী, কথিত শান্তির বার্তাবাহক অং সান সুচির বিরোদ্ধে ফুঁসে উঠেছে সচেতন মহল। দাবী উঠেছে নোবেল পুরস্কার বাতিলের। রক্তখেকো এই অং সান সুচিকে এক সময় মানবাধিকারের প্রতীক মনে করা হতো বিশ্বজুড়ে। এখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষোভ, নিন্দার মুখোমুখি। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে গণধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগ করছে। শিশুদেরকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলছে জলন্ত আগুণে অথবা নদীতে। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন নি সুচি। উল্টো এই গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দৃশ্যত তিনি প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছেন, রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে মিয়ানমারের সীমান্তে প্রবেশ করে বসবাস করছে। মিয়ানমারে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। তবে ‘সন্ত্রাসীদের’ মোকাবেলা করা হচ্ছে। অন্যদিকে তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী, পাকিস্তানের কিশোরী মালালা ইউসুফজাই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে।

গত ২৫ শে আগস্ট থেকে শুরু হওয়া সেনাবাহিনীর এই নৃশংস অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে। দেশে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গুলি করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। দিন যত যাচ্ছে, অবস্থা ক্রমেই আরো ভয়াবহ হচ্ছে। এখন তো রোহিঙ্গারা পালাতেও পারছে না। সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। শুধু মুসলিম রোহিঙ্গা না, রাখাইনের রাখাইনের কয়েক হাজার হিন্দুও এই বর্বরতার স্বীকার।
তিল ধারণের ঠাঁই নেই বাংলাদেশের এমন আশ্রয় শিবিরগুলোতে ছুটছেন তারা। অনেকের লাশ গণকবর দিয়েছে সৈন্যরা। আবার অনেক লাশ জঙ্গলে ও লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এ লাশগুলোও সৈন্যরা হত্যা পরবর্তী ফেলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে ।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের লাশের গন্ধ ভেসে আসছে বাংলাদেশের আকাশ বাতাসে। নাফ নদীতে লাশের ¯্রােত। বার্মা-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা মংডুর শাহাব বাজারে একটি লাশের নদীর সন্ধান পেয়েছে রোহিঙ্গারা। গত শনিবার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি দল গোপনীয়তার সাথে তাদের গ্রামে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে ফেলে। দূর্গম পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে সম্মুখে যেতে যেতে একটি নদীর পাড়ে গিয়ে থামে তারা। বাতাসে দূর্গন্ধ ভেসে আসায় নদীর পাড় ধরে এগিয়ে যায় রোহিঙ্গা ওই দলটি। এসময় নদীর হাটুজলে লাশের পর লাশ ভাসতে দেখে ভড়কে যায় তারা ।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা দলটির ভাষ্য, নারী, শিশু ও পুরুষের অগণিত লাশ পড়ে আছে ওই নদীতে। লাশের বিদ্ঘুটে পঁচা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। শেয়াল-কুকুরের খাওয়া লাশের হাড়গোড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিলের ধারে ও নদীর পাড়ে। সব লাশই রোহিঙ্গার বলে জানান তারা। তাদের ধারণা পাঁচশো’র চেয়ে কম হবে না এই লাশের সংখ্যা ।

আরাকানভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল ‘আরাকান টিভি’কে প্রত্যক্ষদর্শী দলটি আরো জানান, নদীটি টেকনাফের নাফ নদীর কোন শাখা নদী হতে পারে। শাহাব বাজারের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদিটির সাতকাইন্না পাড়া এলাকায় লাশগুলো ফেলা হয়েছে বলে আন্দাজ করছে তারা।

পরিশেষে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুসলমান বা হিন্দু হিসেবে নয়, বর্তমান বিশ্বসমাজের সদস্য হিসেবে। মানুষ হিসেবে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নয়, মানবিকতাকে হত্যা করছে। শুধু মুসলিম বিশ্ব নয়, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে এগিয়ে আসতে হবে, সোচ্চার হতে হবে। মিয়ানমারকে এই নির্যাতন বন্ধ করতে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমরা হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে না দেখে আসুন- ‘মানুষের প্রতি অমানুষের নির্যাতনের বিরোদ্ধে রুখে দাঁড়াই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে।

আমরা চাই, রোহিঙ্গা ইস্যুটির শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক। রোহিঙ্গাদের তাদের আবাসভূমে ফিরিয়ে নেয়া হোক। মানুষ হিসেবে তাদের সব অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হোক।

লেখক : সহ-সম্পাদক, কওমিকণ্ঠ

Comment

Share.

Leave A Reply