যে কারণে সৌদীর বিশিষ্ট আলেমরা কারাগারে

0

আব্দুল্লাহ মায়মুন ::

এ বৎসর যখন ব্যাপকহারে সৌদী আলেমদের কারাগারে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হলো, তখন হয়তো অনেকে জানতে পেরেছেন, যে, সৌদী সরকার তাদের মতের বিপরীতের আলেমদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। অথচ আলেমদেরকে গুম করা বা কারাগারে পাঠানো সৌদী সরকারের কাছে নতুন নয়, যেদিন থেকে সৌদী দালাল রাজপরিবার পবিত্রভূমিতে আমেরিকান নাপাক সেনাদের জন্যে ঘাঁটি তৈরী করার অনুমতি দিয়েছে সেদিন থেকেই এই ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে। এখনো সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।

এখানে কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম কারাগারে যাওয়ার কারণ তুলে ধরা হলো-
শায়খ সালমান আল-আওদাহ
একজন মেধাবী আলেম। জন্ম ১৯৫৬ সালে কাসিম এলাকায়। ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইউনিভার্সিটিতে শরীয়াহ বিষয়ে পিএইচডি করেন।
১৯৯১ সালে যখন সৌদীতে আমেরিকান সৈন্যদের ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়, তখন তিনি রাজপরিবারের এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করে উলামাদের স্বাক্ষর নেওয়া শুরু করেন। বিভিন্ন ভাষণ-বয়ানে এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেন। ১৯৯২ সালে বিভিন্ন উলামা, শিক্ষক, ও দাঈদের পক্ষ থেকে প্রয়াত বাদশাহ ফাহদের বরাবর ‘নসীহাহ শিরোনামে স্মারকলিপি’ প্রেরণ করেন।
১৯৯৩ সালে তাঁর বয়ান ও বক্তব্য এবং সভা-সেমিনারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়, ১৯৯৫ সালে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। পাঁচ বছর বিনা বিচারে কারাগারে থাকার পর কারাগারেই থাকাকালে তিনি বিভিন্ন সরকারী আলেমদের মধ্যস্থতায় তাঁর পূর্বের অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। ১৯৯৯ সালে মুক্ত হন, ‘হ্যাঁ আমি বদলে গেছি’ এই শিরোনামে একটি বিবৃতি দেন।
এরপরেও রেহাই হয় নি, কাতার-সৌদীর ঐক্য প্রত্যাশা করায় সম্প্রতি কারাগারে যেতে হয়।

শায়খ আব্দুল আযীয আত-ত্বারিফী
২০১৬ সালের ২৩ শে এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে গ্রেফতার করার সুস্পষ্ট কারণ জানা যায় নি, তবে ধারণা করা হয় তাঁর একটি টুইটের কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। উক্ত টুইটে তিনি লিখেন- ‘অনেক শাসক মনে করে, দ্বীনের কিছু ক্ষেত্র থেকে সরে আসলে, কাফিররা তাদের উপর খুশি হবে, তাদের উপর চাপ কমাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যতবারই তারা দ্বীনের হুকুম থেকে সরে আসে ততবারই তাদের উপর কাফিররা অন্য আরেকটা চাপিয়ে দেয়, অবিচলতা এক বিষয়, আর চাপ অন্য বিষয়, কাফিরদের একটাই লক্ষ্য, আর সেটি হচ্ছে তাদের ধর্মের অনুসরণ করা’।

শায়খ সুলায়মান বিন নাসির আল-উলওয়ান
তিনি একজন প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস, ফকীহ, দাঈ এবং বহু গ্রন্থপ্রণেতা লিখক। জিহাদীদলের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকে ২০০৪ সালে গ্রেফতার করা হয়। ২০১২ সালে মুক্ত করা হয়, পরে আবার ২০১৩ সালে একাধিক অভিযোগ দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমবার যখন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তাঁকে বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়, ধারাবাহিক ৬ বছর স্ত্রীর সাথেও সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয় নি।
কারাগারে তাঁকে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়, এমনকি তাঁর বিছানা, কম্বল, বালিশ এবং অন্যান্য শীতবস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এদিকে রুমের মধ্যে এসির ঠান্ডাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপরেও শায়খ সবরের সাথে সব কিছু বরণ করে নেন।
এরপরেও যখন শায়খের ধৈর্য্যে ও বিশ্বাসে কোনোভাবে চিড় ধরাতে পারে নি, তখন শায়খকে রিমাণ্ডের নামে বার বার কষ্ট দেওয়া হয়। এতকিছুর পরও শায়খ ধৈর্য্যের সাথে পূর্বের মতো অবিচল আছেন।

শায়খ খালিদ আর-রাশিদ
এক প্রখ্যাত জনপ্রিয় উম্মাহ দরদী দাঈ। ডেনমার্কের একটি পত্রিকায় যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র ছাপা হয়, তখন তিনি একটি ঈমানদ্বীপ্ত ভাষণ দেন, যার শিরোনাম হচ্ছে- ‘হে মুহাম্মদের উম্মতেরা, তোমাদের নবীকে অসম্মান করা হচ্ছে, তোমরা কী করবে’? ওই বক্তব্যে তিনি ডেনমার্কের দূতাবাস বন্ধ করাসহ ওইদেশের সাথে সবধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন, পরে তাঁকে জিহাদিদের সাথে সম্পর্কের অভিযোগ দেখিয়ে ২০০৫ সালে গ্রেফতার করা হয়। ১৫ বছর কারাদন্ডের সাজা দেয়। ইউটিউবে শায়খের অনেক বয়ান আছে, উল্লেখিত বয়ানের বাংলা পড়তে এই লিঙ্কে যেতে পারেন- http://bit.ly/2xvRyAU

শায়খ আলী খুযাইর, শায়খ নাসির আল-ফাহদ এবং শায়খ আহমদ আল -খালিদী
আমেরিকার বিরুদ্ধে তাঁদের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকায় ২০০৩ সালে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। শায়খ নাসির আল-ফাহদের অন্যতম একটি গ্রন্থের নাম হচ্ছে- আত-তিবয়ান ফী কুফরি মান আয়ানাল আমরিকান – (আমেরিকার সাহায্যকারীদের সুস্পষ্ট কুফরির বিবরণ)।
কারাগারে তাদেরকে খুব বেশি নির্যাতন করা হয়, লাঠি দিয়ে পেটানো, ইলেকট্রিক শক, ঠান্ডা-গরমের নির্যাতন, পানি দিয়ে নির্যাতন, চেহারার পশম ও দাঁড়ি উপড়ে ফেলা, আঙুলের নক উপড়ে ফেলাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন তাদেরকে করা হয়।

শায়খ আব্দুল্লাহ আল মুহাইসিনি
মসজিদে নববীর ইমাম মুহাম্মদ বিন সুলাইমান মুহাইসিনি (হাফিজাহুল্লাহ) এর ছেলে। আমেরিকার বিরুদ্ধে দুআ করার কারণে যাঁকে ইমামতি থেকে অব্যাহতি দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। মুহাইসিনি বর্তমানে সিরিয়ার জিহাদে আছেন।

শায়খ ইবরাহীম আস-সাকরান
২০১৬ সালে তাঁকে একটি টুইটের কারণে গ্রেফতার করা হয়, ওই টুইটে তিনি লিখেন, ফাল্লুজা, হিমস ও সানআর গণহত্যার কারণ একই কসাই, এটাই হচ্ছে সন্ত্রাসের কারণ… এরাই আবার সিরিয়ার সহযোগিতার দাবি করে।

শায়খ সাউদ আল-কাহতানি
১৯৯১ সালে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সৌদী সরকারের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করেছেন। তখন থেকেই কারাগারে। প্রথম দশ বছর তাঁকে বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়। এরপর থেকে এখনপর্যন্ত তিনি কারাগারে বন্দি।

শায়খ ওলীদ আস-সিনানি
সৌদিতে আমেরিকার ঘাঁটি নির্মাণের বিরুদ্ধে তিনি ফতোয়া দেন, তিনি ওই ফতোয়ায় আরো বলেন, সৌদী কোনো ইসলামি রাষ্ট্র নয়। তাঁর অবস্থান থেকে ফেরানোর জন্যে অনেক দরবারী আলেম তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তিনি তাঁর অবস্থান থেকে ফিরে আসেন নি। পরে তাঁর সাথে সন্তানদেরকে ও ভাতিজাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

শায়খ আওয়াজ আল-কারনি
উল্লেখ্য তিনি ‘লা তাহযান’ গ্রন্থের লেখক আয়িয আল-কারনি নন। বরং তিনি অন্যজন যাঁর নাম আওয়াজ আল-কারনি। ১৯৫৬ সালে তাঁর জন্ম। ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ ইউনিভার্সিটি থেকে ফিকহ ও উসুল বিষয়ে পিএইচডি করেন। সৌদিতে তাঁকে ইখওয়ান ভাবাদর্শি গণ্য করা হয়।

আল্লাহ যেনো এই দালাল সরকারের হাত থেকে পবিত্র এই ভূমি ও জনগণকে হেফাজত করুন। আমীন!!

Comment

Share.

Leave A Reply