শতাব্দির চিঠি

0

মুসা আল হাফিজ ::

আপনার সেই চিঠির কথা মনে পড়ছে।পাঁচ শো বছরের দূরত্ব থেকে আমার হৃদয়কে পাঠিয়ে দিয়েছি আপনার সেই পত্রের পাশে। মুক্তিকামনা আর ব্যথা, হাহাকার আর আগুন,প্রত্যাশা আর ভীতি,প্রত্যয় আর প্রার্থনা ছিলো আপনার প্রতিটি হরফে। যে রাতে চিঠি লিখেন, আকাশে কয়েক লক্ষ তারা চমকে উঠেছিলো? শিউরে উঠেছিলো বাতাসের হৃদয়? থেমে গিয়েছিলো সময়ের শ্বাস- প্রশ্বাস?
আপনার একটি চিঠি ইতিহাসের গতি দিয়েছিলো বদলে। এই আকাশের দিকে উত্থিত মিনার,এই মাথায় সফেদ টুপি দিয়ে রাস্তায় নেমে আসা ভোর, এই কাদামাখা পথ দিয়ে এগিয়ে চলা মক্তবের মেয়ে কিংবা এই স্বাধীন পদ্মার ঢেউ, যমুনার চর- সকলেই স্বকীয় অস্তিত্বের প্রয়োজনে তাকিয়েছিলো আপনার কলমের দিকে। কী লিখছে কলম!!
কী লিখেছিলো কলম সেই রাতে? পাণ্ডুয়ার সেই জ্যোৎস্নাজ্বলা রাতে- যখন বাংলার ভাগ্য রচনা করছিলো রাজা গণেশের ভয়াল ত্রিশূল।
আপনি – নূর কুতুবুল আলম – কোন সাহস আর শক্তিতে হয়ে উঠেছিলেন বাংলার শেষ আশ্রয়? আপনার তো একটুকরো পাণ্ডুয়া ছাড়া বিত্ত বলতে কিছুই ছিলো না। কিন্তু আপনি দাঁড়ালেন।প্রবল পরাক্রান্ত দখলদারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। বিনাশী তুফানের বিরুদ্ধে একাই লড়লেন।প্রলয়ের মুখোমুখি তেমন লড়াই আরেকটি দেখেনি বাংলাদেশ।
আপনার বাল্যের বন্ধু ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ। ১৩৯৩ সালে তিনি হন বাংলার সুলতান। তার চরিত্রের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। নিজে কবি ছিলেন; কবিদের ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। বিদ্যানদের প্রতি ছিলো তার অগাধ শ্রদ্ধা।একদিকে ইরানের কবি হাফিজকে আহবান করেছিলেন বাংলায়,অপরদিকে চীনের সম্রাটের সাথে চলছিলো তার নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ। ইউরোপ যখন কাপড় পরতে শিখছে,তিনি তখন জগতময় রপ্তানী করছেন বিশ্বের সেরা কাপড় – মসলিন! বাংলার জনপদে জনপদে যেমন গড়েছেন অসংখ্য বিদ্যালয়, তেমনি আপন অর্থে বিদ্যালয় গড়েছেন মক্কায়- মদীনায়। নিজের দেশে দুঃখ- দারিদ্র যেমন মেনে নেননি,তেমনি সুদূর আরবে দারিদ্র উচ্ছেদে পাঠিয়েছেন অর্থ, বিপুল সহায়তা।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তার তুল্য রাজা আরেকজন আসেনি।
আপনারা এক সাথেই পাঠ গ্রহণ করতেন বালকবেলায়। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন দার্শনিক – বিদ্যাসাগর হামিদুদ্দিন নাগুরিকে। তিনি শিখিয়েছিলেন মানবতা আর ন্যায়বিচার। গিয়াসুদ্দিন রাজা হলেন আর ধারণ করলেন ন্যায়কে,মানবতাকে। তার ন্যায়বিচারের কাহিনী আজো কি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে না?
হ্যাঁ, আপনার ভাই আজম খান ছিলেন আজম শাহের প্রধানমন্ত্রী। আপনি যখন ভাইকে তার প্রধানমন্ত্রী হবার অনুমতি দেন, তখন জাতির কল্যাণ ছাড়া আর কী ছিলো আপনার অভিপ্রায়? কিন্তু ভাই অপরিণামদর্শী হলেন। আজম শাহও অপরিণামদর্শী হলেন। তারা হারিয়ে ফেললেন শত্রু- মিত্রভেদজ্ঞান। যা আপনাকে ব্যথিত করতো এবং অবশেষে যা ডেকে আনলো জাতিয় বিপর্যয়।
আপনি দেখতেন, হিন্দু- মুসলিম মিলে – মিশে সম্প্রীতির বন্ধন গড়েছে। দেখে আনন্দিত হতেন। দেখতেন, মুসলিম রাজ্যে হিন্দুরা জমিদারি- মন্ত্রিত্ব, সেনাপতিত্ব অধিকার করেছে। দেখে ভালোই লাগতো আপনার। আপনি চাইতেন হিন্দু- মুসলিম উভয়ের বিকাশ। সবার জন্য বয়ে চলতো আপনার শুভবাদীতার নদী।
কিন্তু হঠাৎ!
হঠাৎ কিছু হিন্দু,মাত্র ক্ষুদ্র এক অংশ,ভুলে গেলো সম্প্রীতি।বৃহৎ হিন্দুজনগোষ্ঠির বিপরিতে,চাওয়ার বাইরে, ভিন্ন এক চাওয়া নিয়ে ওরা একত্রিত হলো। বাইরের আগ্রাসী শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে ওরা চাইলো বাংলার সেনাবাহিনি,প্রশ
াসন, অর্থনীতি, রাজনীতি – সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবে। সে জন্য শুরু হলো পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ। গড়ে উঠলো প্রশাসনের ভেতরে প্রশাসন,জমিদারির ভেতরে জমিদারি।
পার্শ্ববর্তী পূর্বাঞ্চলিয় গঙ্গারাজ্য, উড়িষ্যা রাজ্য ও আসামের কামরূপ রাজ্যের সাথে গড়ে উঠলো তাদের মৈত্রী। এসব রাজ্য কামনা করতো মুসলিম সালতানাতের অবসান। চাইতো অখণ্ড হিন্দু রাজত্ব।
গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের সাথে তাদের চলছিলো বিরোধ,যুদ্ধ। কামতা ও কামরূপ বাংলার সীমান্তে চালাতো উৎপাত।নিরীহ নাগরিক ধরে নিয়ে যেতো। করতো হত্যা। সম্রাট সুযোগ খুজছিলেন তাদেরকে শায়েস্তা করার।
কামতা রাজ্যের সাথে অহোম রাজা সুদংফার বিরোধ বাঁধলো। সুদংফার গোপন প্রণয়ী তাই সুলাই পালিয়ে আসেন কামতায়।সুদংফা নিষেধ করলেও কামতারাজ তাকে নিরাপদ আশ্রয় দেন।সুদংফা বিশাল বাহিনী নিয়ে হামলা করেন কামতায়।

আজম শাহের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। তিনি কামতা অভিযানের পরিকল্পনা নিলেন।সজ্জিত হলো বিশাল বাহিনী।একান্ত গোপনে। কিন্তু তার সকল তৎপরতার কথা জেনে গেলো কামতা। তিনি জানতেন না তার প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর একটি অংশ কামতা- কামরূপের হয়ে কাজ করছে।
দেশের জমিদার ও বুদ্ধিজীবিদের বড় একটি অংশ বিদেশী শক্তির সহযোগী।তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য কামতা- কামরূপকে সজাগ করে দিলো।অহোম রাজ্যের সাথে বিরোধের ঘটলো অবসান।উভয়ে একত্রিত হয়ে আজম শাহের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হয়ে গেলো।
তিনি এগুলেন দ্রুত,প্রবল বিক্রমে,কিন্তু গুচ্ছিলেন প্রতিপক্ষের ফাঁদের দিকে। যাদের নিয়ে তিনি বিজয় চাইছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলো প্রতিপক্ষের মানুষ। অনেকেই ছিলো মনের দিক থেকে পরাজিত। এমন বাহিনী নিয়ে কে কোথায় বিজয়ী হয়েছে? আজম শাহ জয় পেতে ব্যর্থ হলেন।
উড়িষ্যার শিব সিংহ বাংলার দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহস দেখাতেন না। তিনিও এখন সাহসী। বাংলাকে অস্থিতিশীল করতে উদ্যমী। সীমান্তে বেড়ে চললো তার হানাদারি। আজম শাহ অভিযান চালালেন। বাহিনী যাত্রা করলো একদিকে,অপরদিকে তার সকল গোপনীয়তা জেনে গেলো উড়িষ্যা। শিব সিংহের জানা হয়ে গেলো সোনারগায়ের সব পরিকল্পনা।
আজম শাহের এ অভিযানও ব্যর্থ হলো। (অসমাপ্ত)

লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে…

Comment

Share.

Leave A Reply