কবির স্বপ্ন

0

মুতীউল মুরসালীন ::

কবি আজ বিয়ে করেছেন। গ্রাম্য এক লজ্জাবতীকে। তাকে ঘরে তুলেই কবি নদীপাড়ে চলে যান। তিনি তার কবিজীবনের শুরুতেই স্বপ্ন এঁকেছিলেন— বাসররাতে প্রিয়তমাকে একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবেন। প্রিয়তমা মুগ্ধ হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরবে। তারপর তিনিও। এভাবে দুজন হারিয়ে যাবে অন্যগ্রহে। একটু পরে সূর্য আকাশের সামিয়ানা থেকে মুখ লুকোবে। তার আগে নিভুনিভু সতেজ আলো বিলিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর উদোম পিঠে। কবি ধ্যানমগ্ন— সূর্য ধীরে ধীরে অস্তে যায় কেন? ইচ্ছে করলে তো দুপ করেই নিভে যেতে পারতো? ভাবতে ভাবতে কবি আবিষ্কার করলেন—সূর্যের পৃথিবীপ্রেম। সে পৃথিবীবুক থেকে মুখ লুকোতে চায় না। এ কারণে যাবারবেলাও নিভে নিভে আলো দিতে চায়। প্রমাণ করতে চায়— পৃথিবী তার প্রেমিকা। কবি এসব ভাবতে ভাবতে লেখলেন—

“আমি ক্লান্ত হয়ে ডুবে যাওয়া সূর্যের মতোও ক্ষণকালের জন্য তোমা থেকে হারাবো না। আমি মানুষ। আমাকে সূর্য ভেবে ভুল করো না। তোমাকে আঁধারে তলিয়ে যেতে দেবো না। আমি মানুষ। আমাকে সূর্য ভেবে ভুল করো না।” পুবপাড়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসা আযানের সুরে কবির ধ্যান ভাঙে। কাগজ-কলম নিয়ে বাড়িমুখে দ্রুত হাঁটা শুরু করেন কবি। মনে মনে রাতের কথা ভাবেন। কবির মনে পাহাড়সম বিশ্বাস দানা বাঁধে, কবিতাটি শুনে রাফিয়া ভেজাগলায় বলে উঠবে—

” ওগো! আমি তোমার কাছে কিচ্ছু চাই না। চাই না মোহরের টাকাও। আমি তোমার ভালোবাসায়…” ভেতরে স্বজনের ভীড়। আপা-ভাবীরা কবির বউকে প্রথাগত প্রশ্নে জর্জরিত করছে। অবস্থা আঁচ করে বাংলোতে চলে যান বর-কবি। সটান হয়ে শুয়ে কল্পনায় ডুব দেন। সহসা মনে পড়ে, ফেসবুকে আজ কোনো কবিতা পোস্ট করা হয়নি। কবি তড়িগড়ি পকেটে রাখা কবিতাটি পোস্ট মারেন। মিনিট কয়েকেই লাইক-কমেন্টের বোশেখীঝড়। এর মাঝে একজন কবির মনের কথাও কমেন্ট করেছে। লিখেছে— কবি সাহেব, আপনার ইয়েরে কবিতা শোনালে… একসময় কবির প্রতিক্ষার পালা শেষ হলো। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা টেনে রাফিয়ার পাশে যান কবি। অনুমতিক্রমে লাইটের সুইচ টিপেন সন্তর্পনে। তারপর ভূমিকাস্বরূপ বাতচিৎ শুরু হলো দুজনের নতুন জগতে। এক পর্যায়ে কবি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাসনার কথা শেয়ার করলেন প্রিয়তমাকে। কবি তার কবিকণ্ঠে শুরু করলেন আবৃত্তি—

“আমি ক্লান্ত হয়ে ডুবে যাওয়া সূর্যের মতোও ক্ষণকালের জন্য তোমা থেকে হারাবো না। আমি মানুষ। আমাকে সূর্য ভেবে ভুল করো না। তোমাকে আঁধারে তলিয়ে যেতে দেবো না। আমি মানুষ। আমাকে সূর্য ভেবে ভুল করো না।” কবিতা শেষ হতে না হতেই ঘরভরা মানুষজন জমায়ত হয়ে যান কবির রুমে। রাফিয়ার বিকট চিৎকারে নাবালক শিশুরাও এ্যাঁ এ্যাঁ করে চেঁচিয়ে ওঠে।

কবির বড় বোনকে লক্ষ্য করে রাফিয়া বলছে— আপা, দেখো আপা দেখো, উনার কী হয়েছে আপা! জিনে ধরেছে আপা, জিনে ধরেছে!

উনি শুধু বলছেন— আমি সূর্য না…

লেখক- সদস্য, ফেমিসাস

Comment

Share.

Leave A Reply