হিন্দুস্তানের নামাজাদা লেখক নাজিম আল ওয়াজিদি’র সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

0

 মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম ক্বাসিমী ::

মাওলানা নাজিম আল ওয়াজিদি। হিন্দুস্তানের নামজাদা লেখকদের মধ্যে অন্যতম। প্রথিতযশা এ লেখকের জন্মসন ১৯৫৪ সালের ২৩ জুলাই দেওবন্দে। ইলম ও দীনের মারকায হিসেবে শতবর্ষধরে যে দেওবন্দ সারা দুনিয়াজুড়ে নিজ প্রসিদ্ধির প্রতিবিম্ব স্হাপন করে রেখেছে। আর এ পবিত্র ভূমির সবটা জুড়েই জগদ্বিখ্যাত শতশত মহা মনিষার জন্ম। পৃথিবীর বুকে জ্ঞানের দীপাধার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইলমের ছায়াদার বৃক্ষ যাদের একেকজন। মহান প্রভূর দেয়া এ জ্ঞানের রশ্মি মেখে নিজেদের কারনামা দ্বারা যারা পুরো পৃথিবীকে আলোকময় করেছেন। ছাপিয়ে গেছেন পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। ঠিক তেমনি মাওলানা নাজিম আল ওয়াজিদিও দেওবন্দের এমন এক অভিজাত খান্দানের উজ্জ্বল বাতি, যে খান্দানের চৌহদ্দি পুরোটা জুড়েই জ্ঞানের আলো দীপ্যমান। হযরতের দাদা মাওলানা আহমাদ হাসান সাহেব এবং সম্মানিত পিতা মওলানা ওয়াজেদ হুসাইন সাহেব দেওবন্দের নির্বাচিত আলেমদের মধ্যে অন্যতম। নাদিম আল ওয়াজিদি তাঁর ইবতেদায়ী তথা প্রাথমিক শিক্ষা দেওবন্দেই গ্রহণ করেন। পরবর্তিতে তিনি তার দাদা ও পিতার দীনি কর্মস্থল জালালাবাদ চলে আসেন। সেখানে পবিত্র কুরআানের হিফয শেষ করে ফার্সির প্রাথমিক কিতাবাদি শেষ করেন। এবং পিতা ও দাদার কাছ থেকেই আরবি ভাষার প্রাথমিক কিতাবগুলো আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলেন। এরই মাঝে সেখানে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহ.- এর একান্ত ভাবশিষ্য এবং খলিফা মাওলানা মসিহ উল্লাহ খান রহ.-এর কাছ থেকে ইলমের বিভিন্ন বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জন করার সুযোগ পান।

বিশেষত, মুতালাআর প্রতি প্রচণ্ড ঝোক ছিল তার শুরু থেকেই। সাথে লেখালেখির প্রতি প্রেমটা ছিল একেবারে পাগলামির পর্যায়ে। ভেতর থেকে এর ভালোলাগা অনুভব করতেন তিনি। এভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৬৭ সনে তিনি দারুল উলুমে এডমিশন প্রাপ্ত হন। এবং মুতাওয়াসসিতাহ বিভাগে ভর্তি হয়ে এই মহান ইদারায় শিক্ষার্জনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি দারুল উলুমের চেনাজানা পবিত্র চরিত্রের অধিকারী একজন শান্ত সুবোধ মার্জিত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন হিসেবেই তার ছাত্র হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেন। এভাবে দেখতে দেখতে দারুল উলুমের ইলমি পাড়ায় অল্পদিনেই তার নাম বেশ পরিচিত হয়ে যায়। লেখার আসক্তিতো শুরু থেকেই ছিল। জ্ঞান ভান্ডারের মাতৃক্রোড় দেওবন্দ সে তেজকে আরো শাণিত করে তুললো দিনদিন। আরবি ও উর্দু ভাষা সাহিত্যে তিনি এতো বেশী পরিমাণ বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধ অল্পসময়ে রচনা করে ফেললেন যে,দূরের ইলমি প্রতিষ্ঠান গুলোতেও তার সাড়া পড়ে গেল। পাশাপাশি, হিন্দুস্তানের জাতীয় এবং কিছু মানসম্মত সাহিত্য পত্রিকায় প্রায় চারশো গবেষণামালক বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি। অবশেষে ১৯৭৪ সনে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরা হাদিসের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এবং এ পরীক্ষায় তিনি দাওরা হাদিসে প্রথম পজিশন অর্জন করে এই মহান জ্ঞানোদ্যান থেকেই সাফল্যের ষোলকণা পূর্ণ করে তিনি তার একাডেমীক শিক্ষা সমাপনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। পাশাপাশি, দারুল উলুমেও ১ম অধিকার করা সর্বোচ্য সাফল্য বলে বিবেচিত হয়।

ফারাগাতের পরেই উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষতা অর্জনের লক্ষে আবার তিনি দারুল উলুমের “তাকমীলায়ে আদব” বিভাগে ভর্তি হয়ে যান। এবং উস্তাযে মুহতারাম, শায়খুল আদব, হযরত মাওলানা ওয়াহিদুযযামান কিরানবি রহ.-এর কাছে নিজ ছাত্রত্বের সবটুকু উজাড় করে দেন। ওদিকে উস্তাদে মুহতারামেরও নিজ ছাত্রের অসম্ভব প্রতিভা আর বিশেষ যোগ্যতার উপর পূর্ণ ভরসা জন্মে যায় অল্প দিনেই। তাই তিনি নিজেই দু’মাস পরেই প্রিয় নাদিমকে “আন-নাদি আল আদাবির” সম্পাদক নিযুক্ত করে দেন। “আন-নাদি আল আদাবি” দেওবন্দে সম্মিলিত ছাত্রদের একটি নিজস্ব সংগঠন। নাদিম আল ওয়াজিদি এর দায়িত্বভার গ্রহনের পর খুব অল্পদিনেই এর চেহারা বদলে ফেলেন। এবং যারপরনাই উন্নতিসাধন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দারুল উলুম দেওবন্দে একটি বার্ষিক দেয়ালিকা “শুয়ূর” জারি করা হয়। ‘শুয়ূর’এর এ প্রাঞ্জল আবেদন দারুল উলুমের ইলমি পাড়ায় এক বিশাল হৈ চৈ এবং অভাবনীয় পরিবর্তনের আওয়াজে দারুণভাবে পরিচিত হয়ে রয়।

দারুল উলুমে তার আরবি সাহিত্যে অসম্ভব দক্ষতা অর্জন হওয়ায় দেওবন্দে বিশেষ আরবি মেহমানরা এলে, তিনি তাদের সামনে দারুল উলুমের মুখপাত্র হয়ে যাওয়ার পরম সৌভাগ্য অর্জন করেন। এবং আরবি ভাষার শৈল্পিক যে উচ্চারণ তিনি তার বাঙময় বক্তৃতায় করতেন, এতে আরবরা একরকম হয়রান ই হয়ে যেতেন। বিশ্বাসই করতে চাইতেননা যে, কোন আজমি তাদের সামনে কথা বলছে।

এরপর তিনি দারুল উলুম থেকে ফারাগাতের পর এক বছর দিল্লিতে একটি আরবি মাদরাসার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এর মাঝেই দারুল উলুৃমের মজলিসে সূরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে দেওবন্দের ‘সদ সালা’ তথা শতবার্ষিকী সম্মেলনের পুস্তক বিষয়ক কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার উপর বর্তানো হয়। অতপর ১৯৭৮ সনে তিনি লেখালেখি ও পুস্তক প্রকাশনের দায়িত্বভার গ্রহন করে কাজ শুরু করেন।
এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই খুব অল্প সময়ে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় সকল উর্দু ও আরবি কিতাব প্রস্তুত করে ফেলেন।
তাছাড়া ১৯৭৮ সনে তিনি একটি আরবি ডিপার্টমেন্টের ভিত্তি স্হাপন করেন এবং সেখানে আরবি সাহিত্যের একবছর মেয়াদি একটি কোর্সও চালু করেন। এবং সেখানে নিজের মত করেই তিনি কিতাবে পাঠদানের বিন্যস্ত রূপ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় এখন অবধি সাতটি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এরসাথে সাযুজ্য রেখে উল্লেখিত বিষয়ের সাহায্যকারী বহু পুস্তকও প্রস্তুত আছে। এই কোর্সটি আজকাল বেশকিছু মাদরাসায় নেসাবের অন্তর্ভূক্ত করা আছে। এবং এ কোর্সের বাতলে দেয়া পথ অনুযায়ী যে কজন আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করছে তাদের সংখ্যার পরিমাণ এখনি ষোলশত’র অধিক।

দারুল উলুৃমের শতবার্ষিকী সম্মেলন এবং হিজরী পনেরশ’তে নাদিম সাহেব দারুল উলুমের ছাত্রদের একটি বিশেষ তোহফা হাদিয়ে দিয়েছেন। সে অভূতপূর্ব আশ্চর্য সুন্দর তোহফাটি হল “ইহয়ায়ে উলুৃমের” নতুন আধুনিক উর্দু অনুবাদ। যেটা সুনাম ও খ্যাতি আজ পুরো হিন্দুস্তানজুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর ত্রিশটেরও বেশি মহামূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। যেগুলোর অধিকাংশই আজ পাঠকনন্দিত। সর্বোপরি দোআকরি, আল্লাহ এ গবেষক আলেমকে আরো দীর্ঘায়ু করুন।

Comment

Share.

Leave A Reply