জামিয়া দারুল কুরঅান : কওমি ধারার প্রতিকৃত একটি নাম

0

মাওলানা তৈয়্যিবুর রহমান চৌধুরী ::

কওমী মাদরাসা ইলমে ওহীর মারকায। নববী দাওয়াতের কেন্দ্রবিন্দু। ইসলামী শিক্ষার সুতিকাগার। সুনাগরিক তৈরির ফেক্টরী। শুধু কি তাই বলতে গেলে ইসলামের একমাত্র রক্ষাকবচ এই কওমী মাদরাসা।
কওমী শিক্ষাপদ্ধতি এদেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বঞ্চিত। শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য নেই কোন সুযোগ সুবিধা। অবকাঠামো উন্নয়নে নেই সরকারি কোন অনুদান। সরকারের নিকট যেন একটি অবহেলার পাত্র। অযন্তের নিয়তি নিয়ে জন্ম নিয়েছে। যুগযুগ ধরে এভাবেই চলে আসছে। এ থেকে উত্তরণের চিন্তা কারো নেই।
অপরদিকে কওমী মাদরাসার বয়স বেড়েছে। সময় অনেক দূর গড়িয়ে এসেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়ন ও উৎপাদনে বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যুগ পাল্টেছে পাল্টেছে যুগের চাহিদা। পরিবর্তন হয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিতে। শানিত হয়েছে পদ্ধতি। সময়ের বিবর্তনে এসেছে তথ্য প্রযুক্তি। ইংলিশ ভাষা হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। কিন্তু আমরা এখনো সেই পুরাতন পদ্ধতি নিয়ে অাকড়ে অাছি । বুঝেও না বুঝার বান করছি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যেখানে সংস্কার করার কথা। সিলেবাস পরিবর্তনের কথা। যেখানে ঠিক উল্টোপথে যেন হাঠছি। অথচ মাদানি রহ: বলে গেছেন। প্রতি ৩ বছর পর সময়ের চাহিদা পুরনে সিলেবাসে সংযোজন বিয়োজন প্রয়োজন। কিন্তু উত্তরসুরীরা বেমালুম। যেন কিছুই করার নেই। কোন দায়িত্ব বা প্রয়োজনবোধও নেই। এ ব্যাপানে কেউ যে এগিয়ে অসেন নি তা নয়। কিন্তু এ সংখ্যা হাতে গুনা। নিতান্ত ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দোগে।
কওমী ধারার সিলেবাসে কিছু পরিবর্তন, সংযোজন বিয়োজন অবশ্যই জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে সবাই চান কামনা করেন। টেবিলে বসে অালোচনা করেন। কিন্তু হয়না। সময়ের এই দাবী ও চাহিদা পুরন করতে এগিয়ে এসেছেন একজন। যিনি বহুগুণে গুণান্বিত। যার কর্মক্রেত্র বিস্তৃত। যিনি বর্তমান চাহিদাকে এখন নয় আরো দুযুগ পুর্বে র্হদয়োঙ্গম করেছেন। ১৯৮৫ সালে তিনি দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। ভর্তি হন রাজা জিসি হাইস্কুলে। অত:পর কলেজ ইউনিভার্সিটি মাড়িয়ে ডিগ্রী অর্জন করেন। কমপ্লিট করেন বাংলাভাষার উপর মাস্টার্স। ১৯৯২ সালে বের করেন বৃহত্তর সিলেটের ১ম মাসিক পত্রিকা তৌহিদী পরিক্রমা। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেন শাহজালাল ইসলামি একাডেমী। ঝাপিঁয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। অত:পর জাতীয় রাজনীতি। পাশাপাশি চালিয়ে যান পড়াশুনা। ১৯৯৬ সালে এলএলবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এমন সাধনা যার মধ্যে তিনি ব্যর্থ হতে পারেননা। বেশী দূর এগুতে হয়নি সফলতা পদচুম্বন করে তার। হয়ে উঠেন জাতীয় নেতা। নির্বাচিত হন পার্লামেন্ট মেম্বার। তিনি আর কেউ নন। বৃহত্তর সিলেটের কোটি মানুষের প্রিয়মুখ মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী এডভোকেট। একাধারে যিনি প্রজ্ঞাবান অালেম, বিদগ্ধ সম্পাদক, বিচক্ষণ আইনজীবি তিনি এগিয়ে এলেন কওমী শিক্ষার উন্নয়নে। ফারিগ হওয়ার ২৭ বছর পর প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া দারুল কুরঅান সিলেট।

যেভাবে গোড়াপত্তন :
২০১১ সাল ন্যাশনাল ইসলামিক সোসাইটির বার্ষিক এজিএম। মাদরাসা বিভাগ চালু করার জন্য একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর অনেকদিন চলে যায়। একদিন তার বাসায় হাজির হলাম আমি ও মাওলানা অালীনুর ভাই। যেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন মাওলানা অাহম ফখরুদ্দিন। এমপি সাহেব আমাকে দেখেই বললেন মাদরাসা করার প্রাকপ্রস্তুতি সম্পন্ন। সাথে নির্মানাধিন ৫ম তলা ভবনের ডিজাইন দেখালেন। এ উদ্দোগের প্রতি সবচাইতে অধিক জোড় দিয়ে অাসছিলাম আমি। সুযোগ পেয়ে বললাম তাহলে এবার প্রস্তুত শুরু করা হোক। আমাদের ৩ জনকে বর্তমান জামিয়ার নির্ধারিত স্থানে নিয়ে এলেন। মাদরাসার জায়গা ও লোকেশন দেখে যারপরনাই অানন্দিত হলাম।
২০১২ সালের ২৭ জুন। মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠজন নিয়ে একটি বৈঠকে আহবান করেন। সুবিদবাজারস্থ একটি চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে উপস্থিত মাওলানা অালীনুর, মাওলানা মুখতার হোসাইন ও আমি। চার জনের দীর্ঘ বৈঠকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। চলতি বছর থেকে একটি মাদরাসা চালু করা হবো।
শুরু হল প্রস্তুতি। চলে গেল আরো একমাস। এক সময় মনে হল এমপি সাহেবের যত ব্যস্ততা। সামনে অাগষ্ট মাস। রমযান চলে আসছে। মাদরাসা চালু হবে কি? হঠাৎ ঘোষণা দিলেন ১৪ রমযান ৪টা অাগষ্ট মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠান। দাওয়াতনামা, অতিথি নির্ধারণসহ সব আয়োজন সম্পন্ন। নির্ধারিত দিনে সবাই উপস্থিত হলেন। ৫ম তলা ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান। হাজির জামেয়া মাদানিয়া অাঙ্গুরা মোহাম্মদপুরের মুহতামিম মাওলানা শায়খ জিয়াউদ্দীন, দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম মুফতি অাবুল কালাম যাকারিয়া। রেঙ্গা মাদরাসার শায়খুল হাদীস মাওলানা শিহাবুদ্দীন প্রমুখ সিলেটের শীর্ষস্থানীয় অালেম উলামা, বুদ্ধিজীবী ও সুধীবৃন্দ।
১০ শাওয়াল অন্যান্য মাদরাসার মত জামিয়ার ভর্তি শুরু। চতুর্দিক থেকে ছাত্রছাত্রী অাসতে থাকে জামিয়ায়। তখনো একাডেমিক কোন ভবন বা ঘর তৈরি হয়নি। বাধ্য হয়ে মহল্লা মসজিদে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ৯০ ফুট দৈর্ঘ্য একটি টিনশেট ঘর নির্মাণ করা হয়। ভর্তির চাপ বৃদ্ধি হতে থাকে। বাধ্য হয়ে অারেকটি সেমিপাকা ৪০ ফুট ঘর নির্মাণ করা হয়। ছাত্রদের অাগমন থামছেনা। অনিচ্ছা সত্বে আরেকটি টিনশেট ঘর নির্মাণ করতে হয়। বৃহত্তর সিলেটসহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীদের অাগমন জামিয়া হয়ে উঠে মুখরিত। ভর্তির নির্ধারিত তারিখ এগিয়ে অানা হয়। জায়গা সংকুলানের অভাবে বন্ধ করে দেয়া হয় ভর্তি কার্যক্রম।
২৭ শাওয়াল বুধবার বোখারী শরিফের সবক উদ্বোধন। অনুষ্ঠানিকভাবে দারস প্রদান করেন জামিয়ার শায়খুল হাদীস, খলিফায়ে মাদানি আল্লামা অাব্দুল মোমিন শায়খে ইমামবাড়ী। এর মাধ্যমে জামিয়ার দারস ও তাদরিসের পালা শুরু। নিজস্ব একটি সিলেবাস তৈরি করা হয়। ইসলাম ও অধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে প্রণীত সিলেবাস। যদিও সিলেবাস বাস্তবায়ন কঠিন তবুও যাত্রা শুরু করা গেল। একদিন হয়তো অালোর মুখ দেখবে। সুচনাতেই জামিয়ার বিশাল সফলতার পিছনে যেদুটি কারন সবচাইতে অগ্রগণ্য সেটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী ও যুগচাহিদা অনুযায়ী প্রণীত সিলেবাস। এক সাথে শিশু শ্রেণি থেকে তাকমীল ফিল হাদীস পর্যন্ত চালু করা। এটি শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। ফকিহে যামান মুফতি অাবুল কালাম যাকারিয়া হুজুরের ভাষায় এটি শাহীনূর পাশার কারামত।
যে পরিকল্পনা নিয়ে জামিয়ার জন্ম তার অালোর মুখ দেখতে পাচ্ছে জাতি। আজ কওমী সনদের স্বীকৃতি নিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ। পর্যায়ক্রমে সিলেবাসে পরিবর্তন অাসছে। জামিয়া কওমী শিক্ষার পরিপুর্ণ স্বীকৃতি চায়। চায় মৌলিক বিষয় অক্ষুন্ন রেখে সিলেবাস সংস্কার। সংযোজন হবে সমসাময়িক প্রয়োজনীয় শিক্ষা। থাকবে আরবী ভাষার সাথে ইংলিশ ভাষার অাগ্রাধিকার। বাধ্যতামূলক হবে মাতৃভাষা বাংলায় লিখন ও বক্তৃতা। শিক্ষার্থীরা পারদর্শী হয়ে উঠবে তথ্য প্রযুক্তিতে। সহজলভ্য হবে ইন্টারেট ও অয়েব সাইটের ব্যবহার। এ ধরনের একটি যুগপোযুগি শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে জামিয়া দারুল কুরঅান সিলেট কাজ করে যাচ্ছে।
জামিয়া চায় কওমী শিক্ষার্থীরা যেন সময়ের প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠে। যুগের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ হয়ে তৈরি হয়। দেশের প্রতিটি সেক্টরে আসন তৈরি করতে সক্ষম হয়। রাষ্ট্রীয় পদপদবি গ্রহণে কোন বাধাঁর প্রাচীর না থাকে। এ জন্য জামিয়ার শিক্ষার্থীদের পিএসসি/ইবতেদাইয়া, জেএসসি/জেটিসি ও এসএসসি/দাখিল পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কেউ চাইলে যাতে এইচএসসি, ডিগ্রী বা মাস্টার্স কমপ্লিট করতে পারে। চাইলে ডাক্তার ইঞ্জিয়ার, প্রকৌশলী ও বিসিএস ক্যাডারে অংশ গ্রহণ করতে পারে। হ্যা এসব বিষয় বাস্তবায়ন কঠিন। তবুও চেষ্টা করতে দোষ কোথায়। ইতিমধ্যে কওমির কিছু সংখ্যক মেধাবী এগুলো বাস্তবায়ন করে সফল হয়েছেন।
আমরা চাই কওমির সন্তান যেভাবে তাহাজ্জুদ নামাজে দাড়াবে ঠিক তেমনি দেশের সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব অাঞ্জাম দিবে। যেভাবে ধর্মের নামে ছদ্মবেশী বাতিলের মুখোশ উম্মোচন করবে সেভাবে ভিনদেশী শত্রুর মোকাবিলায় সেনাপতি হয়ে উঠবে। শুধু মসজিদের ইমামতি করবেনা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ইমামতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন আমিন।

Comment

Share.

Leave A Reply