রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন; ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি সই

0

রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ নামের মাঠপর্যায়ের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য সরকারি পর্যায়ের কাজটি সম্পন্ন হলো। তবে বৈঠক সূত্র জানায়, অতীতের অভিজ্ঞাতার আলোকে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে এই চুক্তির অধীনে প্রায় একযুগ তো বটে এমনকি আরো বেশি সময় লাগবে।

মঙ্গলবার সকালে মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। জেডব্লিউজির বৈঠকে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বাংলাদেশের এবং মায়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব মিন্ট থোয়ে তার দেশের নেতৃত্ব দেন।

গত সোমবার থেকে টানা ১৩ ঘণ্টার বৈঠকের পর মঙ্গলবার সকালে আবার বৈঠক হয়। মঙ্গলবারের বৈঠকেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। প্রত্যাবাসন শুরুর দুই বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করা হবে বলে চুক্তিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়।

এবিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা সফলভাবে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চূড়ান্ত করে ফেলেছি। সেই সঙ্গে যেসব রোহিঙ্গা ফেরত যাবেন, তাদের জন্য একটি ফরমের রূপও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব আরো বলেন, ওই চুক্তিতে প্রত্যাবাসনের সংখ্যাসহ অন্য যেসব বিষয় আছে, সেগুলোর উল্লেখ আছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ভূমিকার বিষয়টি এখানে যুক্ত করা হয়েছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যাবাসনের পর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জীবন-জীবিকার বিষয় নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।

পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক আরো বলেন, সামগ্রিকভাবে দুই পক্ষের আলোচনার পর একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। এখন দুই পক্ষ যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে, তবে টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করা যায়।

তবে বৈঠক সূত্র জানায়, অতীতের অভিজ্ঞাতার আলোকে দশ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে এই চুক্তির অধীনে প্রায় একযুগ তো বটে এমনকি আরো বেশি সময় লাগবে। বাংলাদেশ প্রতি সপ্তাহে ১৫ হাজার করে রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। অপরদিকে মায়ানমারের প্রস্তাব ছিল শনি ও রবিবার বাদ দিয়ে সপ্তাহে ১৫০০ করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়া। বৈঠকে দুটি প্রস্তাবের মধ্যবর্তী একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ করে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো হতে পারে।

রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্রিটিশ এমপিরা

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ এমপিরা। কারণ তারা মনে করেন, এখনো মিয়ানমার, যা বার্মা নামেও পরিচিত দেশটিতে সেনাবাহিনীর ধর্ষণ আর যৌন সহিংসতা অব্যাহত থাকায় তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি।

ব্রিটিশ কমন্স ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি বলছে, এটা পরিষ্কার যে, বার্মার (মিয়ানমার) সেনাবাহিনী ধর্ষণ আর যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের একটি অস্ত্রের মতো ব্যবহার করছে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ‘দ্রুত পদক্ষেপ’ নিচ্ছে বলেও তারা মনে করে।

রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দেশটিতে সাম্প্রতিক সহিংসতা শুরু হওয়ার পর সাড়ে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান বলে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দাবি, তারা শুধুমাত্র রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালাচ্ছে, সাধারণ মানুষজনের বিরুদ্ধে নয়।

সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের এই আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটি বলছে, সেখানে বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বার্মার কর্মকাণ্ড লাখ লাখ মানুষের জন্য মানবিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে, তেমনি বিশ্বকে ত্রাণ সহায়তা হিসাবে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ব্যয় তৈরি করেছে। কিন্তু এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য ওই এলাকা বারুদের একটি স্তূপ হয়ে আছে আছে।’

কমিটি বলছে, ‘যদিও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রথাগত নেতৃত্ব ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে, কিন্তু রোহিঙ্গা ফেরতের ব্যাপারে তাদের মতামতের অভাবের বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।’

‘বার্মায় বাস্তু চ্যুত রোহিঙ্গা বা অন্য সংখ্যালঘুদের ফেরতের ব্যাপারে অতীত অভিজ্ঞতা আস্থাজনক নয়’, বলছে কমিটি।

যে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, তারা কি স্বেচ্ছায় যাবেন. কোথায় তারা যাবে, তাদের সুরক্ষার কি হবে, এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয় বলে ব্রিটিশ এমপিরা মনে করেন, যা তাদের সবচেয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

রোহিঙ্গারা যাতে নিজেদের জীবনযাত্রা গড়ে তুলতে পারে আর স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার বলে ব্রিটিশ এই কমিটি পরামর্শ দিয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্রিটিশ চিকিৎসক

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় শিশুদের মধ্যে ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়ায় ব্রিটিশ চিকিৎসকদের একটি টিম এসেছে।

এর মধ্যেই টিমটি এসে ক্যাম্পগুলোয় কাজ শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গাদের মাঝে টিকা কর্মসূচীতে দুই মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাজ্য।

Comment

Share.

Leave A Reply