সৌদি সীমান্তে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি!

0

কিছু দিন ধরে লোহিত সাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। তবে গত মাসে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের সুদান সফরের সময় বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

লোহিত সাগরের এক পাড়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেন অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্ব। আর অন্য পাড়ে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও সোমালিয়াসহ আফ্রিকা মহাদেশ। ১৯৫৬ সালে সুদানের স্বাধীনতার পর কোনো তুর্কি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এরদোগানই প্রথম দেশটি সফর করেন। সফরকালে দেশ দু’টি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা দল গঠন করে, যাদের আলোচনার মাধ্যমে সুদান ও তুরস্ক একটি সামরিক চুক্তিতে সম্মত হয়।

এরদোগান ও সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির নিজ নিজ পক্ষে এক ডজনেরও বেশি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে একটি চুক্তি ছিল লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ তুরস্কের কাছে অস্থায়ীভাবে হস্তান্তর সম্পর্কিত। সুকিন নামের ওই দ্বীপ একসময় তুরস্কভিত্তিক ওসমানীয় খেলাফতের অধীন ছিল।

দ্বীপটিতে আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা খুবই কম। চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক দ্বীপটির অবকাঠামো নতুন করে নির্মাণ করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে। দ্বীপটির সোজাসুজি লোহিত সাগরের অপর পাড়ে অবস্থিত সৌদি আরবের মক্কা নগরী। তাই আফ্রিকার হজযাত্রীদের যাতায়াতের জন্য দ্বীপটিকে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবেও গড়ে তুলবে তুরস্ক।

মিসর ও সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে- তুরস্ক সুকিন দ্বীপে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে। উভয় দেশের সংবাদমাধ্যম সুদানের সাথে তুরস্কের সামরিক চুক্তিরও সমালোচনা করছে।

মিসর আর সৌদি আরব বর্তমানে ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্য দিকে তুরস্কের সাথে মিসরের সম্পর্কে অনেকবারই তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৩ সালে মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন সামরিক অভ্যুত্থানের হোতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তা আল সিসি। ওই অভ্যুত্থানের কঠোর সমালোচনা করেছিল আঙ্কারা। সৌদি আরবের আল-ওকাজ পত্রিকার একটি খবরে বলা হয়েছে, ‘সুকিন আঙ্কারাকে দিয়েছে খার্তুম… সুদানকে তুলে দিয়েছে তুরস্কের হাতে’।

রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ‘আফ্রিকা মহাদেশের ওপর তুরস্কের আধিপত্যের ক্ষুধা মনে হচ্ছে অসীম।’ এ প্রসঙ্গে সোমালিয়ায় তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে উদাহরণ হিসেবে টেনে এনেছে পত্রিকাটি। তবে সৌদি আরবের সুদানি দূতাবাস এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘সুকিন দ্বীপ সুদানেরই আছে, অন্য কারো নয়’। আরো বলেছে, তুরস্কের সাথে সুদানের সামরিক চুক্তিতে আরব দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য কোনরূপ হুমকি সৃষ্টি হবে না। মোট কথা এরদোগানের সুদান সফরের প্রতিক্রিয়া পুরো আফ্রিকায়ই অনুভূত হয়েছিল।

তুরস্ক আফ্রিকা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করছে এই ধারণা থেকেই হয়তো গত ৪ জানুয়ারি ইরিত্রিয়ায় সেনাবাহিনীর একটি দল পাঠিয়েছে মিসর। সুদানের প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ায় মিসরের কোনো ঘাঁটি না থাকলেও এই সেনারা অবস্থান করবে সুদান সীমন্তসংলগ্ন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিতে। এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়েছে সুদান। কায়রোতে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ‘সুদানকে সঙ্ঘাতে টেনে আনতে চায় মিসর’। কয়েক দিন পর ইরিত্রিয়ার সাথে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে সেখানে বাড়তি সেনা মোতায়েন করে সুদান। মিসরের মতো সুদানে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি মেনে নিতে পারছে না ইরিত্রিয়াও। দুই পাশের এই দেশ দু’টির সাথে সুদানের সম্পর্ক অনেক দিন ধরেই শীতল।

অন্য দিকে ইরিত্রিয়ায় মিসরের সেনা মোতায়েনকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারছে না সুদানের আরেক প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়া। নীল নদের পানি বণ্টন নিয়ে অনেক দিন ধরেই মিসরের সাথে সম্পর্ক খারাপ ইথিওপিয়ার। মিসরের সেনা পাঠানোর প্রতিবাদে তারাও ইরিত্রিয়ার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় শক্তি জোরদার করেছে। আরব আমিরাতের সাথেও তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। তাই তুরস্কের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবে দেশটি সেটিই স্বাভাবিক।

মিসর, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে প্রভাব বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা আফ্রিকার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে সেটি এখনই স্পষ্ট হচ্ছে না। কিছু দিন পরেই আফ্রিকান ইউনিয়ন সম্মেলনে দেশগুলোর নেতারা একত্র হবে সুদানের রাজধানী খার্তুমে, তার আগেই হয়তো অঞ্চলটির রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ দেখা দিতে পারে। সূত্র : আজজাজিরা

Comment

Share.

Leave A Reply