ইস্যুর পর ইস্যু : চলছে শক্তিক্ষয়ের মহড়া

0

সৈয়দ শামছুল হুদা :

দেশে এবং বিদেশে একের পর এক এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা দেখে স্বস্তিতে থাকার কোন সুযোগ নেই। প্রতিটি মানুষকেই এগুলো কোন না কোনভাবে আঘাত করছে, প্রভাবিত করছে। এর ওপর রয়েছে মুসলিম বিশ্বে চলমান অঘটন। আরাকানের মুসলমানদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, যেভাবে দেশ ছাড়া করা হয়েছে, যেভাবে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তার রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার আগেই মুসলিম বিশ্বের প্রাণ কেন্দ্র সৌদী আরব থেকে এমন সব খবর আসছে, যা বিবেকবান সবাইকেই নাড়া দিচ্ছে।

সৌদী আরব স্রষ্টা প্রদত্ত দুটি খনি’র অফুরাণ ভান্ডার যখন শেষ হয়ে আসছে, তখন তাদের কাছে থাকা তৃতীয় ভান্ডারটি খুলে দিচ্ছে। যদিও ভেতর থেকে ক্ষয়রোগ অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। স্বর্ণ এবং পেট্রোলের ভান্ডারের প্রতি এখন আর সৌদী আরবের ভরসা নেই, ভরসা কমে আসছে স্রষ্টার প্রতিও। কখন এগুলো শেষ হয়ে যায়, তার পরবর্তী সৌদী আরব কীভাবে চলবে? কী খেয়ে থাকবে? তাই তারা সহজ সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে। সেটা হলো পাশ্চাত্যের প্রেসক্রিপসানে তারা এখন ঘরে থাকা নারীদের উম্মুক্ত করে দিচ্ছে। বিনোদনের উম্মুক্ত জোয়ার তাদের সর্বত্র নতুন তুফান সৃষ্টি করেছে। নিজেদের হেফাজতে থাকা, পবিত্র থাকা, সৌদী নারীদের ব্যবহার করে যদি পাশ্চাত্য থেকে এবার কিছু পয়সা কামাই করা যায়, তাহলে মন্দ কী! তারা সমুদ্র পাড় উম্মুক্ত করে দিচ্ছে। স্টেডিয়াম উম্মুক্ত করে দিচ্ছে। রাস্তা, পার্ক, অফিস, হোটেল সব জায়গায় সকল বিধি নিষেধ তুলে নিচ্ছে। এমনি এক অবস্থায় নিরীহ কর্মচারীদের উপর নানা আইনের খড়গ এমনভাবে চালাচ্ছে, তারা যেন সেখানে বসবাস করতে না পারে। ফেরত আসছে সাধারণ শ্রমিকরা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটাও এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ।

আর মধ্যপ্রাচ্য! সেখানের দুঃখের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ইয়েমেন, কাতার, সিরিয়া নিয়ে যে গেম চলছে, তার যে শেষ কোথায় তা আমরা কিছুই জানি না। শুধু প্রতিদিনের রক্তক্ষরণ দেখছি, আর নিরবে চোখের পানি ফেলছি।সিরিয়ার সর্বশেষ গণহত্যায় আমরা নিরব প্রতিবাদ টুকুও করতে পারছি না। তাদের জন্য বিশ্বের কোন প্রান্তেই একটি মিছিল পর্যন্ত হতে দেখিনি। অথচ মানবতার এমন লঙ্ঘন কখনো দেখা যায়নি। শিশুদের বিভৎস চেহারা দেখে আমরা কান্না করছি, নিরবে অশ্রু ঝরাচ্ছি, এর বেশি কিছু নয়। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত ঘটনা একদিকে যেমন তুলে আনার ক্ষমতা রাখে না, অপরদিকে তারা নিজেরাও পার্শ্ববর্তী একটি দেশের এমন অন্ধ দাসত্বে বন্দী, যেখান থেকে সঠিক কোন খবরই পাওয়া আসা করা যায় না।

প্রিয় বাংলাদেশ আজ রক্তাক্ত। গতরাতেও রক্ত ঝরেছে জৈন্তায়। অহেতুক। অনর্থক।ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করার জন্যই মনে কেউ উৎ পেতে আছে। দাওরায়ে হাদীসের একজন ছাত্রের জীবন ঘটনাস্থলেই শেষ হয়ে গিয়েছে। অসংখ্য আহত। এর জের যে কতদূর যাবে, কে জানে? কারা বাংলাদেশে ধর্মীয় সংঘাত সৃষ্টি করতে চায়? কারা এর নেপথ্যে উস্কানী দাতা তা কোনদিন বের হবে না। কারণ তাদের ধরা-ছুঁয়া যায় না। তাদের হাত অনেক লম্বা। অনেক প্রশস্থ, অনেক দৈর্ঘ। আর আমাদের দৃষ্টি খুবই সীমিত জায়গায়। শত্রুকে মনে করি এখনই পিষে ফেলবো। আসলে যাকে শত্রু জ্ঞান করছি, সেও জানে না, কেন ঘটনা ঘটাচ্ছে। ঘটনার পর ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে বুঝতে পারে, আসলে সে ভুল পথে সে পথ মাড়িয়েছে। কিন্তু যারা ফায়দা তোলার, তারা ঠিকই ফায়দা তুলে নিয়ে যাবে।

হাতিরঝিলে একখান মসজিদ ছিল। সরকার হাতিরঝিলে এত শত শত কোটি টাকা খরচ করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার খোলা আয়োজন করতে পারছে, একখান মসজিদ কি এখানে বরাদ্ধ দেওয়া যেতো না? কোনদিনতো শুনিনি সরকার এই বিশাল প্রজেক্টে একটি মসজিদও রেখেছে। প্রায় লক্ষ মানুষের সমাগমস্থলে একটি মসজিদ করে দিলে সরকারের কী এমন ক্ষতি হতো, উপরুন্ত যে টীনসেড মসজিদটি ছিল, সেটাও গায়ের জোড়ে ভেঙ্গে ফেলা হলো। তাদের হম্বিতম্বি দেখে মনে হচ্ছে, তারা মসজিদটি ভাঙ্গতে পেরে যেন বিশাল কিছু অর্জন করে ফেলেছে। আমরা পড়ে গিয়েছি বিতর্কে। জায়গাটি সরকারী? কেন এখানে মসজিদ করা হলো? কেন এখানে এভাবে মসজিদ করা প্রয়োজন? আমরা একবারও ভাবছি না, এখানে হাতিরঝিল প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগেই এই মসজিদ ছিল তাহলে কেন এই প্রজেক্ট গ্রহনের সময় মসজিদটি ডিজাইনের অন্তর্গত করা হলো না? মসজিদের নগরী ঢাকায় সরকারী জায়গায় প্রতিষ্টিত হওয়া একখান মসজিদ কী থাকতে পারে না? প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের সমাগমস্থলে একটি মসজিদ কি থাকতে পারে না? হতে পারে না?

কয়েকদিন পুর্বে হয়ে গেলো বেফাকের ১০ম কা্উন্সিল। কিছু ত্রুটি-বিচ্ছ্যুতি অবশ্যই ছিল। এখন হেফাজতের পরে এই বেফাককে চরমভাবে বিতর্কিত করার জন্য নানা দিক থেকে আক্রমন শাণিত করা হচ্ছে। যারা বেফাকের কেউ না, যারা অন্য বোর্ডের কর্ণধার, তারা বেফাকের বিষয়ে খুবই ইন্টারেষ্টিং। একের পর এক নিউজ করছে। নানা খুঁত ধরছে। প্রকাশ করছে। সংবাদ শেয়ার করছে। আর কেউ কেউ বেফাকের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে, অভিধান ঘেটে গালি-গালাজ উদ্ধার করে, বেফাককে তুলোধুনে করে আবার সেই বেফাকের কাছেই নানা পরামর্শ চাচ্ছে। পরামর্শ দিচ্ছে। এগুলো আসলে কিসের আলামত? আমাদের সব ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কিত করতে আমাদের কেউ কেউ ভূমিকা রাখছে। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, আর পদ-পদবীর জন্য বেফাককে ইস্যু বানানো হচ্ছে। বেফাককে সামনে রেখে ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ, খেদ প্রকাশ করা হচ্ছে। এভাবে আমাদের সম্মিলিত ঠিকানাগুলোতেও শেষ পেরেক মেরে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত এদেশের উলামাদের। সাধারণ মানুষ এ কাজে নিয়মিত এগিয়ে আসছে। কিন্তু তার মানে তো এই না যে, সাধারণ মানুষরাই দাওয়াতি কাজ করছে, আর আলেম সমাজ ঘোড়ার ঘাস কাটছে। আলেম-উলামাদের পৃষ্টপোষকতা ছাড়া দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের কোন মুল্যই নেই। সেখানেও ফেতনা ঢুকে গেছে। একদল জাহেল দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের সামান্য দায়িত্ব পেয়ে ভাবছে, আমরাই তো সব করলাম। আলেম-উলামা কী কাজ করছে? আজ কাকরাইলও আর নিরাপদ নয়। সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরা লাগে। জাহেলদের পেছনে ইসলাম বিরোধী শক্তির সমর্থন থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এটাকেও সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। এখানেও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আলেম-উলামা, সাধারণ মানুষের মাঝে ফাটল ধরাণোর কৌশলী প্রচারণা কেউ কেউ চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের আলেম-উলামাদের মধ্যে সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিযোগিতা খুব কমই লক্ষ্য করা যায় । প্রচারণাও কম দেখা যায়। দেশের বর্তমান চাহিদা উপলব্দি করে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র উম্মোচন করা, তৈরী করা, ছড়িয়ে পড়ার কোন মিশন-ভিশন দেখা যায় না। দিন দিন বাড়ছে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ। বিরোধ। দল ভাঙ্গছে। ভাঙ্গার পেছনে হাজারো যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার পেছনে শক্তি ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু আশাব্যঞ্জক কিছুই দেখা যায় না। হলেও এর প্রচার নেই। আমরা এর প্রচার করি না। এড়িয়ে চলি। দেখেও না দেখার ভান করি। মন্দটাই বেশি চোখে পড়ছে। অবশ্য্ আমাদের এই ব্যধিও আছে যে, কোন কিছুর প্রশংসা করলে খবর আছে। আর কোন কাজকে আরো নিখুঁতভাবে উঠিয়ে নিয়ে আসার জন্য সু-পরামর্শ দিলে সেই ক্ষেত্রেও সমস্যা। সবমিলে যেন আমরা এক জগাখিচুরি অবস্থায় বিরাজ করছি।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই নেই। লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যে সাহিত্য সমালোচনা নেই। আলেম-উলামাদের মধ্যে ইলমী প্রতিযোগিতা নেই। আছে আজাইরা প্যাচাল পারার মহাদক্ষতা। কারো দোষ ধরার সময় আছে চরম হিংস্রতা।চরম অন্ধ ভক্তি ও অন্ধ বিদ্বেষ। ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা নাই বললেই চলে। বড়কিছুর সাথে মিশে চলতে পারার যোগ্যতা মানসিকতাও সীমিত। সবকিছু মিলে দেশ এবং বিদেশের পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্য যেন দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের উপর শকুনের যে শ্যান দৃষ্টি পড়ে গেছে সে সম্পর্কেও আমরা বে খবর। বিএনপির ঘাড় মটকাতে দেখে ভাবছি, এতে আমার কি? অর্থনীতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে দেখেও না দেখার ভান করছি। প্রকাশ্যে অর্থমন্ত্রী বলে ৯টি ব্যাংকে ৯হাজার কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি। প্রকাশ্যে শিক্ষামন্ত্রী বলে : প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলে- প্রশ্নফাঁস তেমন কোন দোষের না। প্রকাশ্যে শিক্ষামন্ত্রী বলে- আপনারা ঘুষ খান, তবে রয়ে সয়ে খান। প্রকাশ্যে দুদক চেয়ারম্যান বলে- আমরা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছি না। বিরোধী মতের প্রতি রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা শুধূ একটি দলের জন্যই বরাদ্ধ নয়, মনে রাখতে হবে- এগুলো পালা বদল করে সবাইকেই টাচ করবে। তখন আর প্রতিবাদ করার শক্তিও থাকবে না।

তাই আসুন, নিজেদের ভেতরে কোন্দল কীভাবে হ্রাস করা যায়, তার চেষ্টা করি। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে বিতর্কমুক্ত রাখা যায় তার চেষ্টা করি। আসুন, নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়াই। ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনে শরীক হই। নানাক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা বাড়াতে ছড়িয়ে পড়ি নানা অঙ্গনে। ভেতর থেকে আসা উস্কানীগুলোতে সতর্কতার সাথে পা ফেলি।

27.02.2018

Comment

Share.

Leave A Reply