বেফাকের ১০ম কাউন্সিল : কিছু কথা

0

সৈয়দ শামছুল হুদা ::

বেফাকুল মাদারিসিল কাওমিয়াহ বাংলাদেশ ( বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড) সংক্ষেপে বেফাক এর ১০ম জাতীয় কাউন্সিল গতকাল ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় সুন্দরভাবে সমাপ্ত হয়েছে। সারাদেশ থেকে এর সদস্যগণ স্বত:স্ফুর্তভাবে অংশগ্রহন করেছেন। উৎসবমুখর পরিবেশে সম্মেলন সমাপ্ত হয়। সম্মেলনের বাড়তি পাওনা ছিল, আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসা এবং মূল্যবান আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান। তিনি গতকাল খুব পরিস্কারভাবে কথা বলেছেন। মুনাজাত করেছেন। অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই দীর্ঘসময় ধরে সভাপতিত্ব করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. যে বিষয়টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সেটা হলো বেফাককে শক্তিশালীভাবে ধরে রাখা, যারা এখনো এর সদস্য হয় নাই, তাদেরকে সদস্য করা, যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের নিজ দায়িত্বে কাজ করা, কে কাজ করলো, আর কে করলো না, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা। আমিত্বকে জলাঞ্জলি দেওয়া ইত্যাদি। তিনি খুলুসিয়্যাত এবং ইখলাসের ওপর মূল্যবান আলোচনা করেছেন।

কাউন্সিল নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। সেটা হলো- বাংলাদেশে যে পরিমাণ কওমী মাদ্রাসা আছে, উলামা হযরত আছে, তাদের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হলে, কারো না কারো ছাড় দিতেই হবে। সবাইকে মূল্যবান দায়িত্বে বসানো সুকঠিন কাজ। তারপরও শুরা ও কার্যকরী কমিটিতে অনেক নতুন সদস্যকে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য যেমন সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, তেমনি অনেক নতুন সদস্যকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু সদস্য হয়তো বড়দের নিজ নিজ লিংক থেকে নেওয়া হয়েছে, এটাতে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। যারা এসেছেন তারা কেহই একেবারে অযোগ্য নয়। আজ যারা সমালোচনা করছে, তাদেরকেও যদি বড় পদগুলোও দেওয়া হতো, আর নতুন সদস্য অন্তর্ভূক্তির সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে তারাও চেহারা দেখে দেখে নিজের পছন্দের লোকদেরকেই বসাতেন। সেই তুলনায় অনেক ভালো কমিটি হয়েছে বেফাকের। আমি এটাই মনে করি।

আল্লামা বাবুনগরী দা.বা. কেন সদস্য পদে?
বড় কোন কমিটিতে যখন একাধিক বড় ব্যক্তিত্ব থাকেন, তখন এটা করাই স্বাভাবিক। আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর পর যদি বড় পদটা আল্লামা বাবুনগরী সাহেবকেই দেওয়া হতো, তখন ওরাই বলতো- এই তো সব হাটহাজারী দখল করে ফেলেছে। বড় দুটি পদ মীমাংসিত হওয়ার পর কাজের সুবিধার্থে যাকে যেখানে রাখা দরকার সেভাবেই রাখা হয়েছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে তরুণ নেতৃত্বকে মূল্যায়ণ করা হয়েছে। আমি মনে করি, তিনি সদস্য পদ থকে আগামীতে যখন সুযোগ আসবে, তখন সরাসরি তিনিই হয়তো প্রথম পদটিতে অবস্থান করবেন। আল্লামা বাবুনগরী দা.বা. আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এরপর প্রথম পদটিতে বসার যোগ্যতাই রাখেন।

কাউন্সিল উপলক্ষ্যে মাওলানা আব্দুল গাফফার পাক্ষিক সবার খবর এর বিশেষ সংখ্যা বের করে। সেখানে বেফাকের উদ্দেশ্যে কিছু বলার সুযোগ আমারও হয়। আমি সেখানে বলেছি যে,

বেফাকের নিকট আমাদের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ) সংক্ষেপে বেফাক। আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা সমূহে পরীক্ষার মান উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃংখলা আনয়ন এবং সরকারীভাবে কওমী মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষার স্বীকৃতির আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। বেফাক গতানুগতিj একটি বোর্ডই নয়, বেফাক একটি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। আর তাই বেফাকের কাছে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার পারদটাও বেশি।
বেফাক এর নিকট আমাদের চাওয়া এবং বেফাক এর পক্ষে তা বাস্তবায়নের মাঝে সাধ ও সাধ্যের যে চিরন্তন দ্বন্ধ তা আমরা তীব্রভাবে অনুভব করি। তারপরেও এটা স্বীকার্য যে, বেফাককে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতা এবং কাজের গুণগত মানের উৎকর্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। এককভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা সমূহের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণের চাওয়াটাও বেশি।

আর তাই আজ বেফাকের জাতীয় কনভেনশনকে সামনে প্রত্যাশার কিছু কথা পেশ করতে চাই।

প্রথমত: কওমী মাদ্রাসা সমূহের সর্বোচ্চ সনদের যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ঘোষিত হয়েছে তা আইনগতভাবে বাস্তবায়নে দ্রুততর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: কওমী মাদ্রাসা সমূহের মধ্যে শিক্ষা এবং পরিচালনাগত কিছু নীতিমালা বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। বিশেষকরে ছাত্রদের ছাড়পত্র ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা, বেতন কাঠামো ইত্যাদি বিষয়গুলো যথাসাধ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। কমপক্ষে সুনির্দিষ্ট নীতিমালাসমূহ তৈরী করে সকলের উপস্থিতিতে তা পাশ করিয়ে নিতে হবে। কেউ যদি এটা লংঘন করে তাহলে তাকে চিহিত করে রাখতে হবে।

তৃতীয়ত : কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নীতিমালা গঠন করতে হবে। ছোট-বড় সকল কওমী মাদ্রাসাকে এ সকল নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

চতুর্থত: বেফাক এর উদ্যোগে একটি গবেষণামূলক ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের করতে হবে। দেশে বিভিন্ন সময়ে যে সকল ধর্মীয় এবং জাতীয় ইস্যুতে যে সকল সংকট সৃষ্টি হয়, সে সব বিষয়ে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দেশনা সম্বলিত গবেষণাপত্র উলামাদের হাতে তুলে দিতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে সকল কওমী মাদ্রাসাকে এ পত্রিকার এজেন্ট হতে হবে।

পঞ্চতম : সকল কওমী মাদ্রাসায় একই পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ এর ব্যবস্থা করতে হবে। নির্ভুল পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে হবে। একই প্রকার শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে। একই সময়ে ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

এ বিষয়গুলো সময় এবং বাস্তবতার কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ভালোভাবে সম্পাদন না হওয়ায় কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরণের নীরব অরাজকতা বিরাজ করছে। ছাত্রদের ছুটি, শিক্ষকদের ছুটি, শাসন করার বিষয়ে বিধিমালা তৈরী এবং বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে সরকারীভাবে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদের স্বীকৃতি ঘোষিত হওয়ার পর এসব বিষয় আরো গভীরভাবে বিবেচনা করা সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে।

গতকালকের সভায় কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত এসেছে। মক্তব বিভাগের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা গ্রহন, হিফজুল কুরআনের ১৫পারা বিভাগে পরীক্ষা গ্রহণ, কাফিয়া জামাতে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা গ্রহন এবং ইফতা বিভাগের জন্য নতুনভাবে বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করণ। এগুলো ছিল শিক্ষা সংস্কারের পক্ষে সহায়ক সিদ্ধান্ত।

বেফাককে কেউ কেউ বিতর্কিত করার জন্য অহেতুক আদাজল খেয়ে লেগেছ। এতবড় একটি কমিটি পুরোপুরিভাবে উপস্থিতির মতামতের ভিত্তিতে করতে গেলে কত বড় সমস্যার সৃষ্টি করবে, তা যারা এসব নিয়ে সমালোচনা করছে, তারা ভালো করেই জানে। আমাদের অভ্যাস হলো- আমরা সকলেই নিজ নিজ পছন্দের ব্যক্তিকে কমিটিতে দেখতে চাই। তো এ কমিটিতে কতজনকে খুশি করা সম্ভব?

যা হয়েছে, সুন্দর হয়েছে। সামান্য কিছু ভুলত্রুটি থেকে যেতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা মেনে নিলেই আর কোন সমস্যা থাকে না।

আরো একটি বিষয়: বেফাক একটি বোর্ড। সেখানে কেন রাজনৈতিক দলগুলোর মতো কমিটি গঠন হয়, কেন পদ-পদবী হয়। আমার খুব অবাক লাগে, এটা কি কোন সরকারী শিক্ষা বোর্ড? এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হলো কওমী মাদ্রাসা সমূহ। সুতরাং তাদেরকে নিয়েই চলতে হবে। ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কোন বোর্ড বেফাক নয়। সুতরাং এর জেন্দ্রীয় কমিটি প্রয়োজন আছে, জেলা কমিটি প্রয়োজন আছে। এই বেফাক সকল কওমী মাদ্রাসাসমূহকে এক ছায়ার নীচে নিয়ে এসেছে। এটাও কি কোন বোর্ডের কাজ? তাহলে বেফাক অনেককে একত্র করে কী ভুল করেছে? শিক্ষা বিরোধী কাজ করেছে? কওমী মাদ্রাসার বোর্ড আর সরকারী শিক্ষাবোর্ড এক কথা নয়।

লেখক: সম্পাদক, নূরবিডি ডটকম

Comment

Share.

Leave A Reply