মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এবং বেফাক

0

মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী: দেশের  কওমী মাদরাসা সমূহের সর্বাপ্রেক্ষা বড় শিক্ষা বোর্ড হচ্ছে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড), সংক্ষেপে বেফাক।

কাল ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বোর্ডের নতুন কমিটি গঠিত হতে যাচ্ছে।  বর্তমানে বোর্ডের চেয়ারম্যান আছেন দেশের র্শীষ আলেম ও হাটহাজারি মাদরাসার মহাপরিচালক শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

দীর্ঘদিনের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার জাহানাবাদীর মৃত্যুর পর থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস।

বোর্ডের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে নানা জনের মধ্যে নানা কথা শুনা যায়। তাই বিষয়টি নিয়ে বরেন্য আলেম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ররাহ.’র একটি বক্তব্য তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের বেসরকারী (কওমী) মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড “বেফাকুল মাদারিছিল আরাবিয়া” সম্পর্কে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান আলোচনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে উল্লেখ করেন, “সংস্থাাটির সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা ছিল এর জন্মলগ্ন ১৯৭৭-৭৮ সন থেকে। তখন আমি বাংলাদেশ জমিয়তে উলামার মহাসচিব। নানাভাবে দেশের নানা দল মতে বিছিন্ন ওলামায়ে কেরামকে একটা সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত করার ফিকিরে আছি। এমনি এক সময় দেশের একজন বিশিষ্ট গবেষক আলেম এবং বরেণ্য কলম যোদ্ধা জনাব মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী ছাহেব ঢাকা পাটুয়াটুলী মসজিদ সংলগ্ন জমিয়ত অফিসে এলেন। দেশের আলেম সমাজ, বিশেষতঃ কওমী মাদ্রাসাগুলির হালচিত্র উন্নয়ন এবং এই শিক্ষা ধারাটিকে যুগ চাহিদার উপযোগী করে তোলার বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলেন।”
তিনি সাপ্তাহিক জমিয়ত পত্রিকার ৬ষ্ঠ বর্ষ, ১৪তম সংখ্যায় এ প্রসংগে আরও বলেন, “জমিয়তে ওলামার অফিসে বসে মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদীর মুখে বেফাক গঠনের সংকল্পের কথা শুনে অন্তত পনেরো বছর আগের মুরুব্বীগণের আকাংখাটি বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পেলাম। আমি সঙ্গে সঙ্গেই সর্ব প্রকার সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গকীর করে ফেললাম। তখনকার সময়টা ছিল আমাদের জন্য বড়ই প্রতিকূল। জাতীয় ভিত্তিতে একটা সম্মেলন আয়োজনের ব্যয়ভারের সংকুলান ছিল আমাদের ন্যায় কর্মীদের পক্ষে একটা বিরাট বোঝা। কিন্ত মাওলানা ইসলামাবাদী হিম্মত করলেন। লালবাগের শায়েস্তা খান হল ভাড়া করা হলো।”
মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদীসহ জমিয়ত নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় ’৭৮ সালে শায়েস্তা খান হলের সম্মেলনেই ‘বেফাক’ গঠিত হয়ে গেল।

জামেয়া কোরআনিয়া লালবাগের সেক্রেটারী মরহুম হাজী আব্দুল ওয়াহহাব ঐ হল ভাড়ার ব্যবস্থা করলেন। ঢাকা নিবাসী জনাব আলহাজ্ব মুহাম্মদ আকীল এবং গেন্ডারিয়ার বর্ষিয়ান মুরব্বী হাজী কোরবান আলী সাহেব উল্লেখযোগ্য চাঁদা দিয়ে সহায়তা করলেন। জমিয়তের সেক্রেটারী মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবের কাঁধে ন্যস্ত হয় মুদ্রণজনিত যাবতীয় ব্যয় ভার।
ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসার বড় একটি কামরা ছিল বেফাকের তৎকালীন কার্যালয়।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রাক্তন সভাপতি ও মাসিক আল ফারুকের সম্পাদক মরহুম মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী (র:) এ প্রসঙ্গে বলেন, “১৯৭৫ সালের ২৪/২৫ ডিসেম্বর পাটুয়াটুলীর জামে মসজিদের দ্বিতলায় জমিয়তে উলামার কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। এতে অনেকগুলি কর্মসূচীর মধ্যে মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী সাহেবকে আহবায়ক করত: তানজিমুল মাদারিছ গঠন করার জন্য তাঁর উপর এর ব্যবস্তাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিশেষে মাওলানা রিজাউল করীমসহ জমিয়ত নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ইং সনে ‘বেফাকুল মাদারিছ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। (সূত্র : জমিয়তের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি)

ঐতিহাসিক জাতীয় সম্মেলন

বেফাকের আহবায়ক মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদীর নেতৃত্বে গঠিত ৬০ সদস্যের ইস্তেক বালিয়া কমিটির ব্যবস্থাপনায় ১৯৭৮ সালের ২৩, ২৪ও ২৫শে এপ্রিল ঢাকা লালবাগের শায়েস্তা খান হলে “মাদ্রাসা শিক্ষার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত” শীর্ষক এক ঐতিহাসিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিন ব্যাপী উক্ত সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য পেশ করেন মাসিক মদীনা সম্পাদক হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এবং খুৎবায়ে ইস্তেক বালিয়া পেশ করেন সম্মেলনের আহবায়ক মরহুম মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী । বেফাকুল মাদারিছিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর তিন দিন ব্যাপী ঐতিহাসিক এ সম্মেলনে বিভিন্ন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস (র:), শায়খুল মাশাইখ আল্লামা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র:), খতীবে আজম হযরত মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (র:), আলহাজ্ব মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদী, মাওলানা আজিজুল হক প্রমুখ।
বেফাকের সূচনাতে আহবায়ক কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা রিজাউল করীম ইসলামাবাদী (র:), এরপর পটিয়ার মাওলানা ইউনুস ১৯৭৮ থেকে ১৯৯২ পর্যন-, মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন-, মাওলানা নুর উদ্দীন গহরপুরী ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এবং ২০০৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা শাহ আহমদ শফী।
(সূত্র ঃ বেফাক, পরিচিতি, তৃতীয় মুদ্রণ ১৯৯৭ইং)

Comment

Share.

Leave A Reply