আমার প্রিয় বাংলা ভাষা

0

ফুজায়েল আহমাদ নাজমুল ::

বাংলা আমার মায়ের ভাষা। বাংলা আমার প্রিয় ভাষা। দা-দা, দা-দু, না-না, না-নু, আ-ব-বু, আ-ম-মু এসব শব্দ দিয়ে আমি কথা বলা শিখেছি। অ, আ, ই – ক, খ, গ অক্ষর দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেছি। আমি যতোই আধুনিক হই না কেন, যে দেশেই থাকি না কেন, যে ভাষার সাথে জন্ম থেকে পরিচিত সে ভাষাকে ভুলে যেতে পারি না। অবহেলা করতে পারি না।

ভাষা এমন একটি নিয়ামত যার ফলে মানুষ সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। ভাষা সম্পন্ন প্রাণী বলা হয় মানুষকে। আবার ভাষার জ্ঞানে যারা সমৃদ্ধ তারা মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ। এ দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত যত জ্ঞান বিজ্ঞান মানব জাতি অর্জন করেছে সবই ভাষার মাধ্যমে করেছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ভাষা ছাড়া কোনো জাতি নেই। সব জাতিরই নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে অনেক ভাষার কথা জেনেছি। কিন্তু আমি ইংল্যান্ডে আসার পর বাস্তবে অনেক ভাষার সাথে সরাসরি পরিচিত হয়েছি। বাসে, ট্রেনে, অফিসে যেখানেই যাই ভিন্ন জাতি পাই। ভিন্ন ভাষা শুনতে পাই। কারো কারো ভাষা শুনতে অনেক কঠিন লাগে। মনে হয় দাঁত ভেঙ্গে যাচ্ছে। আবার কারো ভাষা অতি মধুর্। তবে যার যার মায়ের ভাষার সাথে আলাদা একটা আকর্ষণ রয়েছে। শুনতে আগ্রহ জাগে।

মায়ের ভাষা বাংলাকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। কারণ, রাষ্ট্রীয় ভাবে এই ভাষা প্রতিষ্ঠায় রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। এই ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছি আমরা আন্দোলন করে। রক্ত দিয়ে। প্রাণ দিয়ে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বাংলা ভাষার অপমানের বিরুদ্ধে প্রথম সাধারণ ধর্মঘট আহবান করে। তাদের দাবি ছিলো সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে হবে। মুদ্রা, ডাকটিকিট এবং নৌবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দিতে হবে। সেই কর্মসূচীতে অংশ নেওয়ার কারণে ছাত্রদের গ্রেফতার করে পাকিস্তানি পুলিশ।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল এক সমাবেশে ঘোষণা করেন বাংলা ভাষার দাবি তুলে পাকিস্তানকে দু’টুকরো করার চেষ্টা তিনি মেনে নেবেন না। পাকিস্তানে শুধু একটি ভাষা থাকবে এবং তার নাম ‘উর্দু’। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তিতে আগুন জ্বলে উঠে পূর্ব বাংলার বাঙালির হৃদয়ে। প্রাণের ভাষা, বুকের ভাষা কেড়ে নেওয়া সহ্য করতে পারছিলেন না তারা। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্দেশ এলো বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লিখতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে মওলানা ভাসানির সভাপতিত্বে গঠিত সর্বদলীয় সেন্ট্রাল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকশন কমিটি প্রতিবাদে মুখর হলো।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে ছাত্ররা জমায়েত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে তখন বন্দুক নিয়ে পুলিশ পাহারা দিচ্ছিল। সোয়া ১১টার সময় ছাত্ররা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল বের করতে চাইলে প্রথমে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছুড়ে। কিছু ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে ছুটে যায়, বাকিরা পুলিশের ঘেরাটোপে। নেতাদের পুলিশ গ্রেফতার করলে ক্ষিপ্ত ছাত্ররা পূর্ববঙ্গের আইনসভা ঘেরাও করে সদস্যদের শামিল হতে অনুরোধ করেন। কিছু ছাত্র ভেতরে ঢুকতে চাইলে পুলিশ গুলি চালায়। আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার সেই গুলিতে নিহত হন।

ভাষার আন্দোলন আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রইলো না। ছড়িয়ে গেলো সবখানে। শহর থেকে নগরে-বন্দরে। বাতাসের সাথে মিশে খবর পৌঁছে গেলো সব মানুষের ঘরে ঘরে। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি-ধমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এলো ছাত্র-শিক্ষক, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। বসন্তের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে চারিদিক থেকে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ ওঠলো ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। লড়াই চলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ২২ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারিও। প্রাণ গেলো সফিউর, সালাউদ্দিনসহ আরো কতজনের। সেনাবাহিনী গুলি খাওয়া ছাত্রদের লাশ গুম করলো। নেমে এলো নিপীড়ন, নির্যাতন।

১৯৫২ সালের রক্তমাখা ফেব্রুয়ারি যে দাবি তুলে ধরেছিলো, সে আন্দোলন ‘৫৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। অনেক টানাপড়েনের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সরকার বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য নজির স্থাপন করে বাঙালি জাতি যে পরিচয় দিয়েছিলো তা পৃথিবীর আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে বিরল। ভাষার জন্যে ছাত্র সমাজ যদি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে না দিতো তাহলে হয়তো আজো আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি পেতাম না। স্বাধীন হতে পারতাম না। কারণ, ভাষা আন্দোলনের সূত্রেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এ পথ বেয়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র তথা প্রত্যাশিত বাংলাদেশ।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা বা ইউনেস্কো। ২০০০ সাল থেকে সমস্ত পৃথিবীজুড়ে

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের ইউনেস্কো এর ঘোষণা আমাদের জাতিগত পরিচয় এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসেক আরো গৌরবোজ্জ্বল ও মহীয়ান করেছে।

বাঙালির জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি এক মহিমান্বিত দিন। বছর ঘুরে এ দিন আমাদের কাছে আসে এবং ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন, সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে সভা, সমাবেশ,  সেমিনারসহ বিভিন্ন ফোরামে আমরা নানামুখী আলোচনা ও পর্যালোচনা করি। যারা লেখক তারা গঠনমূলক লিখি। জাতির অগ্রযাত্রায় এসব আলোচনা, পর্যালোচনা ও লেখালেখি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা যে, বছরের পর বছর আলোচনা পর্যালোচনা করছি, কাগজে কলমে লিখছি তাতে কি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পেরেছি? ব্যার্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আজো সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। ব্যার্থতাকে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবিতে বীর শহীদ-রা রক্ত দিয়ে ইতিহাস রচিত করলেও আজো আমরা সর্বক্ষেত্রে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে- আমরা বাংলা নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু সঠিক বাংলার ব্যবহার করতে জানি না। কিছু বাংলা, কিছু উর্দু আর কিছু ইংলিশ একত্রে করে আমরা আজ আমাদের নিজস্ব ভাষার ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলেছি।

গতবছর ভাষার মাসে টেলিভিশনে দেখলাম একজন সংবাদকর্মী রাজধানীর নামিদামী স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। বাংলা বারো মাসের নাম কি? ছয় ঋতুর নাম বলুন? দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিবসসহ বাংলা সাহিত্য নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিলো। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যাই বাংলা ভাষায় ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান ও প্রতিভার দৈন্যদশা দেখে। দেখলাম অনেকেই ক্যামেরার সামনে হা করে দাড়িয়ে রইলো। সঠিক উত্তর দিতে পারলো না। অনেকেই সরাসরি বলেই দিলো আমি জানি না। বলতে পারবো না। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি ছাত্রছাত্রী ছাড়াও আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত নারী পুরুষ আছেন যারা বাংলা বারো মাসের নামগুলোও সঠিকভাবে বলতে পারবে না।

উচ্চশিক্ষা, বিশেষায়িত শিক্ষাসহ আজ নানা  ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব হয়নি। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বইপত্র প্রণয়নের কাজও খুব সন্তোষজনকভাবে এগোয়নি। আমরা লক্ষ্য করেছি- স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ইংরেজীর গুরুত্ব যে ভাবে বেশি, ঠিক তেমনি বাংলার নেই। ছাত্র ছাত্রীরাও বাংলা নিয়ে তেমন আগ্রহী দেখা যায় না। মাদ্রাসা শিক্ষায়ও সমান অবস্থা। কওমী মাদ্রাসায় আরবী আর উর্দু ভাষার গুরুত্ব যেভাবে রয়েছে ঠিক তেমনি বাংলার গুরুত্ব নেই। অনেক ছাত্ররা পরীক্ষার উত্তরপত্রে বাংলা লেখার ইচ্ছা করলেও লিখতে পারে না। কারণ সেখানে উর্দু ও আরবীকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আমাদের অফিস-আদালতে আজো বাংলা ভাষার অধিকার স্বীকৃত হয়নি। এটা আমাদের মহান ত্যাগের সার্থকতাকে রুদ্ধ করেছে।

সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে আমরা অন্য দেশের ভাষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আগামী প্রজন্মের মানুষগুলো কতটুকু বাংলা শিখতে পারবে তা ভাবার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। আমরা লক্ষ করছি, দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক যারা তাদের পরিবারে দিনদিন বাংলা চর্চা কমতে শুরু করেছে এবং ইংলিশ চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু বয়সেই নিজেদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তাদের সহযোগিতায় দেশের সর্বত্র আজ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গড়ে উঠেছে এবং বড় অংকের পয়সা খরচ করে তারা নিজেদের সন্তানদের পড়াচ্ছেন। আমি ইংরেজি শেখার বিরোধী নই। তবে তা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবেই শিক্ষণীয়, মাতৃভাষা বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা বিকল্প হিসেবে নয় একথা অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে।

একুশ আসলে যদিও বিভিন্ন ভাবে আমরা বাংলার প্রতি সম্মান জানাই কিন্তু সত্যিকারার্থে আমরা বাংলা চর্চায় অনেক পিছিয়ে। যে বাঙালিরা মায়ের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য এতো ত্যাগ ও কুরবানি করেছে সে বাঙালিদের মাঝে আজ বাংলা অবহেলিত এটা মেনে নেয়া যায় না। সব ভাষার আগে বাংলাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। পছন্দের অন্য ভাষাকে দ্বিতীয় স্থানে জায়গা দিতে হবে। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার সাথে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। লেখালেখিতেও অন্য ভাষার শব্দগুলোকে এড়িয়ে চলতে হবে। বাঙালির জাতীয় বিকাশ ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে একুশের চেতনা তখনই এ জাতিকে এগিয়ে নেবে যখন সত্যিকারার্থে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বক্ষেত্রে।

Comment

Share.

Leave A Reply