পুবের দেশে পশ্চিমা গণতন্ত্র!

0

আহমেদ রাজিব ::

আমেরিকার স্টেইট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখান তারা বলেছে যে তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিত পর্যবেক্ষন করছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে নৃশংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ এবং দায়িত্ববান হয়ে ভূমিকা নেয়ার আহবান জানিয়েছে। তারা বলেছে ‘কার্যকরী গণতন্ত্রে’র স্বার্থে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই বক্তব্যগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিরিহ হলেও তাত্পর্য কিন্তু নিরিহ নয়। বরং ভয়ংকর। ‘কার্যকরী গণতন্ত্র’ বলতে আমেরিকা-ইউরোপ যা বোঝে অর্থ্যাত ‘পশ্চিমা গণতন্ত্র’ কায়েমের কথা বলছে। এই পশ্চিমা গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলো হলো, প্রথমত: প্রায় সমমনা ‘পশ্চিমা গণতন্ত্রের’ ধ্বজাধারী দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রে গভীর দ্বিদলীয় বিভক্তি জারী রাখা, ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনার তত্পরতা অব্যাহত রাখা, ৯৯% জনতাকে বঞ্চিত রেখে পশ্চিমা পুজিতন্ত্রের তল্পিবাহক ১% এর জন্য সম-অধিকারের ছদ্মবেশ ধারন। এছাড়াও আমরা দেখেছি স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের নামে কয়েক যুগ ধরে চলা পশ্চিমা বিশ্বের বিভত্স তত্পরতা। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, লেবানন, তিউনিশিয়া, মিশর সহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশীরভাগ দেশগুলোতে গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নামে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের নির্মম কূটকৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। পশ্চিমারা মনে করে, পশ্চিমা গণতন্ত্র তাদের আবিস্কার এবং তা সার্বজনীনও বটে, সুতরাং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গোটা বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দিতে হবে। অথচ, তাদের এই চিন্তাটাই তাদের মডেলের গণতন্ত্রের সাথে বিরোধপূর্ণ। কারন কোন আদর্শ বলপ্রয়োগে চাপিয়ে দেয়ার বিরোধীতা করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে পশ্চিমা গণতান্ত্রীকরা বস্তুত তাদের আদর্শকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চাইছে। সুতরাং, পশ্চিমা গণতন্ত্র আদতেই একটা ভূ-রাজনৈতিক ভন্ডামী। এই বিংশ শতাব্দীর চুড়ান্ত ভন্ডামীকে একবিংশ শতাব্দীতে প্রশ্রয় দেয়ার কোন যৌক্তিক কারন খুঁজে পাওয়া যায় না।

এছাড়াও আমেরিকার এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি সাড়ে বারো হাজারে কিলোমিটার দুরে অবস্থিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সামিল। যেহেতু এবছর নির্বাচন, পশ্চিমারা চাইবে যেন তাদের পদ্ধতির পশ্চিমা গণতন্ত্র এখানে চালু থাকুক এতে করে তাদের বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে এশিয়ার সুপারপাওয়ার চীনকে সামলানোর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে কাজে দেবে।

পশ্চিমা গণতন্ত্রের এশিয়ান মডেল, দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ভারতও আমেরিকার চীন ঠেকাও কৌশলে অবতীর্ণ হয়েছে। আমেরিকা এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থ এক হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তারা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাইবে। আর সেইকাজ করার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে যেকোন সমাজের তথাকথিত ধর্মবিদ্বেষী সেক্যুলার শ্রেণী। যারা মূলত: বাক-স্বাধীনতার নামে সমাজে বিদ্বেষ, বিভক্তি এবং বিভ্রান্তী ছড়ায়।
পশ্চিমারা গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাসকে পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রবক্তা মনে করে থাকে। সুতরাং এটা প্রায় ৩হাজার বছরের পুরোনো চিন্তা। এত পুরোনো সমাজচিন্তা নিয়ে কোন সমাজ মানবিক গুনাবলী বিকশিত করে অগ্রসর হতে পারে না। পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা তাই ভেঙ্গে পড়ছে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে হতাশা গ্রাস করছে।

সুতরাং, গণতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি বা বোঝানো হয় তাতে বর্তমানে আস্থা রাখার কিছু নাই। এটা আমেরিকা-পশ্চিম ইউরোপের বহুল চর্চিত রাজনৈতিক দর্শন যেটা মূলত: সোভিয়েত সমাজতন্ত্র মোকাবেলার ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবেই ব্যবহৃত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা-ইউরোপের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ‘অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে’র অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে উস্কে দেয়া, বোমাবাজি, রাষ্ট্রদখল, এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সেটা প্রমানিত হয়েছে।

যে কোন রাজনৈতিক দর্শনের চুড়ান্ত ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে অমানবিক আকাঙ্খা থাকে আমেরিকা-পশ্চিম ইউরোপের গণতান্ত্রিক দর্শনেও তা রয়েছে।

যদিও রাজনীতিবিদরা সবসময় বলে থাকেন একটি সমাজকে নেতৃত্ব দিয়ে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়াই তাদের প্রধান কাজ, কথাটা পুরোপুরি সঠিক নয়। ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অমানবিক আকাঙ্খাকে চর্চা করাটাই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাড়ায়। বিশ্বের সমস্ত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই এটা প্রতীয়মাণ হয়েছে। এটা গোটা বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক ভয়াবহ সংকট। এ সংকট থেকে উত্তরনের দার্শনিক এবং রাজনৈতিক পথ-পদ্ধতি কি হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

বরং এধরণের পশ্চিমা গণতন্ত্র আমদানির মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্র নিজেদের সামাজিক-পারিবারিক বন্ধনকে জলাঞ্জলি দিয়েছে, রাষ্ট্রের নিজস্ব মেধাশক্তি ও স্বকীয়তা নিয়ে বেড়ে ওঠার ক্ষমতা হারিয়েছে, রাষ্ট্রের মূল কতৃত্ব আমেরিকা-ইউরোপের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় গুলোতে সমর্পিত করেছে। এটা যেকোন বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন জনগোষ্ঠির জন্য লজ্জার বিষয়। এবং এধরণের চর্চার ফলে, রাষ্ট্রের অন্তর্গত বিশাল জনগোষ্ঠী হীনমন্যতা নিয়ে সময় অতিবাহিত করতে করতে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, অপরদিকে আমেরিকা-ইউরোপ আরো লজ্জা দেয়, গণতন্ত্র- আমদানিকারক রাষ্ট্র আরো হীনমন্য হতে থাকে, আমেরিকা-ইউরোপ আরো ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। কোন জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় বুদ্ধিমত্তা থাকলে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে কোন আমেরিকা-ইউরোপকে ক্ষমতাসম্পন্ন করার কথা নয়। আর যে জনগোষ্ঠীর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার বা শক্তিশালি করার বুদ্ধিমত্তা নেই, উপরন্তু আমেরিকা-ইউরোপকে আরো ক্ষমতাবান করছে, তারা আসলে জনগোষ্ঠী হিসাবে টিকে থাকার প্রাকৃতিক অধিকারও খর্ব করছে। সুতরাং এখন আমাদের নিজেদের জননৈতিক পরিচয় নিজেদেরই নির্দিষ্ট করার সময় এসেছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে দেশের মানুষের স্বার্থে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম বিবর্জিত, ঐতিহ্যগত, পারিবারিক এবং মানবিক আদর্শের জননীতিতে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

Comment

Share.

Leave A Reply