জাতীয় যুব সম্মেলন : সঙ্কটকালের একটি মাইলফলক

0

কবির আহমদ খান :

ইসলামের অনিবার্য দাবি হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন। এছাড়া ইসলামের পূর্ণতার বাস্তব রূপায়ন সম্ভব নয়। ইসলামের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিধি-বিধানের প্রতিষ্ঠা ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। ফলে একজন মুসলমানকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের অনুসরণের স্বার্থে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি জীবনব্যবস্থা কায়েমের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সেই প্রচেষ্টার নামই সিয়াসত-রাজনীতি। ফলে একজন মুমিনের জীবনে রাজনৈতিক ভূমিকার বিকল্প থাকে না।
রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নে সবসময়ই পুরোধা, প্রাজ্ঞ ও নেতৃস্থানীয়রা ভূমিকা রাখেন। কিন্তু কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবচে’ বেশি ভূমিকা থাকে তরুণ-যুবাদের। তাঁরাই প্রতিটি কর্মসূচি, আন্দোলেনের প্রাণ, সঞ্জিবনী শক্তি। যে দল ও সংগঠনের তরুণ ও যুবকরা যতো তৎপর, তরুণ-যুবাদের অংশগ্রহণ যেখানে বেশি- সেখানেই অসাধ্য সাফল্যও বিজয়ের মাল্য নিয়ে এগিয়ে আসে। এজন্যে প্রতিটি সংগঠনেই রয়েছে শক্তিশালী যুবসংগঠন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেরও অন্যতম শক্তি, স্তম্ভ যুব জমিয়ত বাংলাদেশ। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিটি কর্মসূচি, প্রতিটি আন্দোলনকে সাফল্য দান করতে যুব জমিয়ত সবসময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুব জমিয়ত প্রতিটি ধাপে, রাজনৈতিক প্রতি কর্মসূচিতে তার শক্তি ও সক্ষমতার জানান দিয়ে উলামায়ে ইসলামের শানকে উচ্চে তুলে ধরেছে।
নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী আন্দোলন, তসলিমাবিরোধী আন্দোলন, ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিলের আন্দোলন, টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলন-রোডমার্চ, শাহবাগে সৃষ্ট নাস্তিক্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, হেফাজতের অবরোধ-লংমার্চ, হাইকোর্টে স্থাপন করা মূর্তিবিরোধী আন্দোলনসহ ছোট-বড় সব ইস্যুতে যুব জমিয়ত বাংলাদেশ তার বলিষ্ট ভূমিকা রেখেছে। উলামায়ে ইসলামের আহবানে যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও যুব জমিয়ত সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সিডরে, বন্যায় যুব জমিয়ত ত্রাণের তুহফা নিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মত মিয়ানমার থেকে জীবনরক্ষার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুহাজিরদের পাশেও দাঁড়িয়েছে যুব জমিয়ত। তবে, এইসব কর্মসূচি বাস্তবায়নেই থেমে থাকার জন্য যুব জমিয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর রাজ কায়েমের ঈমানি যে দায়িত্ব মুমিনের কাঁধে রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নেও দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ যুব জমিয়ত। এই জন্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
যুব জমিয়ত মনে করে, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর রাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শরীয়াসম্মত নীতি ও বৈশিষ্ট্যভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম প্রয়োজন। যেখানে আহলুল্লাহদের নেতৃত্বে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপ্রসূত তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। সত্যপন্থী উলামায়ে কেরামের মোহনা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এমনই একটি প্লাটফর্ম। মুজাদ্দিদে আলফেসানী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. এর সংগ্রাম ও চিন্তাধারাকে বুকে ধারণ করে জমিয়ত হয়ে উঠে শায়খুল হিন্দ, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ, সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি থেকে নিয়ে উপমহাদেশের সেরা মর্দে মুমিনদের সাধনার কেন্দ্রবিন্দু। এর নেতৃত্বে ভূমিকা রাখেন হিফজুর রহমান সিউহারওয়ি, শাব্বির আহমদ উসমানি, যফর আহমদ উসমানি, আহমদ আলী লাহোরি, আব্দুল্লাহ দরখাস্তি, ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানি, শায়খুল ইসলাম মুশাহিদ বায়মপুরী, আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া, শায়খ তাজাম্মুল আলী, মুফতি শাহ আহরারুজ্জামান, শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী, মাওলানা মুহি উদ্দীন খান, মাওলানা শামসুদ্দিন কাসেমী, শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী (রাহ.) থেকে নিয়ে সায়্যিদ আরশাদ মাদানি, মুফতি ফজলুর রহমান, আব্দুল গফুর হায়দরি, আব্দুল মোমিন শায়খে ইমামবাড়ি, মাওলানা নূর হোছাইন কাসেমী (দা.বা) পর্যন্ত মনীষাদের মহান এক কাফেলা।
জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি জমিয়ত দ্বীন ও মিল্লাতের প্রতিটি প্রয়োজনে ভূমিকা রেখে চলছে। ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ব্রিটিশ বিতাড়ন, ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা থেকে নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ে জমিয়ত গৌরবময় ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে দ্বীন ও ইসলামের হেফাজতের প্রতিটি সংগ্রামে জমিয়তÑ প্রধান ও মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আধিপত্যবাদ বিরোধিতা, মৌলিক গণদাবি, ইসলামি তাহযিব-তামাদ্দুনের সুরক্ষা ও নাস্তিক্যবাদ প্রতিরোধে জমিয়ত বরাবরই সোচ্চার। জমিয়তের এই যাত্রায় যুব জমিয়ত পালন করেছে মেরুদ-ের ভূমিকা, হয়ে উঠেছে ত্যাগ-কুরবানি এবং সংগ্রাম ও প্রতিরোধের পুরোধা। দেশ ও জাতির আসা-ভরসার স্থলে পরিণত হয়ে আগামীর দিকে এগিয়ে চলছে যুব জমিয়ত।
১৫ মার্চ যুব জমিয়তের জাতীয় যুব সম্মেলন ২০১৮ইং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আয়োজন। জমিয়তের আসন্ন শতবার্ষিকী বাস্তবায়ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান বাস্তবতায় বহুবিধ সঙ্কট মোকাবেলায় যুব জমিয়তের ভূমিকাকে আরো বলিষ্ট ও জোরালো করে তুলতে এ সম্মেলন থেকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হবে। ফলত আগামী দিনের অগ্রযাত্রায় এ সম্মেলন হয়ে উঠবে এক মাইলফলক।
সম্মেলন উপলক্ষ্যে ‘উকাব’ একটি স্মারক প্রকাশ হচ্ছে। যা যুবজমিয়ত বাংলাদেশের অবদান ও চিন্তাধারাকে দুই মলাটে জড়ো করার একটি প্রয়াস। যা থেকে যুব জমিয়ত কর্মীরা প্রেরণা ও পথনির্দেশনা লাভ করবেন। এর পাশাপাশি জাতিও পেয়ে যাবে সংগ্রামী এই কাফেলার পয়গাম। এই কাফেলা জনগণের অধিকারহারা অবস্থা, রাজনৈতিক শূন্যতা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, রাজনৈতিক স্বৈরাচার ও জুলুম শোষণের করালগ্রাস থেকে দেশ ও জাতির মুক্তির পথ প্রদর্শন করতে চায়। এই কাফেলা চায় আলোকিত ও ইনসাফভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র। দেশ ও জাতির সঙ্কটকালে যুব জমিয়তের পয়গামবাহী এই স্মারক তার লক্ষ্য পূরণে সাফল্য অর্জন করুক।

লেখক : সম্পাদক, সূর্যসকাল
তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক: যুব জমিয়ত সিলেট জেলা

Comment

Share.

Leave A Reply