আমরা যদি স্বাধীন হই তবে পরাধীন কারা?

0

ইলিয়াস মশহুদ

স্বাধীনতা নিয়ে মানুষ জন্মগ্রহণ করে কারণ, আল্লাহপাক মানুষকে স্বাধীন করেই সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জন্মগত অধিকার হচ্ছে-তার এই স্বাধীনতাভোগের অধিকার থেকে কেউ তাকে বঞ্চিত করবে না এবং জোর-জবরদস্তি করে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী করবে না। ইসলাম যখন স্বাধীনতাকে তার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করে, সময়টি তখন এমন ছিল যে, অধিকাংশ মানুষ বুদ্ধিভিত্তিক, রাজনীতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে আক্ষরিক অর্থেই ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল।
মানুষের এই বহুরূপ দাসত্ব-শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ইসলাম স্বাধীনতা ঘোষণা করল। বিশ্বাসের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং সমালোচনার স্বাধীনতা; সব ক্ষেত্রেই ইসলাম এই স্বাধীনতা দিয়েছে। চিরকাল ধরে এসব বিষয়েই মানুষ তাদের স্বাধীনতা প্রত্যাশা করে আসছে। এ হলো ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতা। আবার এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে জবরদখলের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, কোন এক সময় জাতি রুখ দাঁড়ায়, তীব্র প্রতিরোধ বা যুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলমুক্ত করে- এটাও একরকম স্বাধীনতা। আমরা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিক কিন্তু ব্যক্তি স্বাধীনতা পাইনি এখনো। এটাই চরম বাস্তবতা।
আমরা বাঙালি। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন বাংলাদেশের অধিবাসী। এজন্য আমরা গর্বিত। গর্বিত আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা বাঙালিদের কারণে। তবে আমরা আমাদের কাঙ্খিত এ স্বাধীনতা কারো সেবাদাস বা নিতান্ত দয়া-কৃপায় পাইনি; বরং আমরা আমাদের অদম্য মনোবল, সীমাহীন ত্যাগ ও বাহুজোরে অর্জন করেছি।
উনিশশো’ একাত্তরের এই মাসেই শুরু হয়েছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা। আজ আমাদের স্বাধীনতার বয়স সাড়ে চার দশক। আমাদের কাছে রক্তঝরা এই মার্চ মাসের রয়েছে অনেক মহাত্ম্য। ভিন্ন রকম এক আবেদন। কারণ, মার্চ অগ্নিঝরা ইতিহাসের মাস। বিষাদ-বেদনার মাস। আনন্দ-আহ্লাদের মাস। এই মাসের ২৫ তারিখ থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এক অমর মহাকাব্য; যার ফলশ্রুতিতে আজকের বাংলাদেশ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ। লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ।
বাঙালীর জীবনে ভাষা আন্দোলনের স্মারক ফেব্রুয়ারি মাসের পর মার্চের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয় এই মার্চেই। একাত্তরের গোটা মার্চ মাসই ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের পর এ দেশ যে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগোচ্ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় এই মার্চেই। ৭১’র ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই বজ্রধ্বনির পর দেশের মানুষ অন্য রকম এক প্রেরণা লাভ করে। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ে। ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত’ হওয়ার কথা বললেন। শত্রুর মোকাবেলা করার নির্দেশও ঘোষিত হয় তাঁর এই বজ্রকণ্ঠে।
সংবিধান আমাদের জীবনের স্বাধীনতা, ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এগুলোকে ‘মৌলিক অধিকার’ ঘোষণা করেছে। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে এগুলোই ভিন্নরূপে ‘সার্বজনীন মানবাধিকার’ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। অথচ এই দেশে এই মুহূর্তে এগুলোর অস্তিত্ব কোথায়?
পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাতি স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়েছিল। এ দেশের তরুণ-তরুণী, আবালবৃদ্ধবনিতা সেদিন বঙ্গবন্ধুর এই একটি কণ্ঠের মন্ত্রমুগ্ধে আবিষ্ট হয়ে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যার যার মতো করে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। স্বাধীনতা এবং মুক্তির মঞ্চে জাতি এক হয়। এরই মধ্যে নানা কূট-কৌশল চালাতে থাকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু তাদের সব কূট-কৌশল নস্যাৎ করে শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম। অসীম ত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম, ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দিয়েছে। প্রতিরোধযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি তার মুক্তির সংগ্রামে জয়ী হয়।
এখন যদি কেউ আমাদের প্রশ্ন করে, কত হাজার প্রাণের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি? সরল-সোজা উত্তর- ত্রিশ হাজার প্রাণের বিনিময়ে। কত মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে? মুখস্ত জবাব- অসংখ্য অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। তবে আসল কথা হচ্ছে- সংখ্যায় আমাদের কিছু যায় আসেনা। আমাদের কথা হল, স্বাধীনতার দীর্ঘ এই সময়ের পরও কি আমরা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হতে পেরেছি? স্বাধীন’র মত স্বাধীন হতে পেরেছি? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে কেন এখনো কুকুরের মত মানুষের হাতে মানুষ মরছে? কেন প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় প্রকাশ হয় ধর্ষণের খবর? ধর্ষক কেন সমাজে মাথা উঁচু করে ঘোরে? ফাঁসীর দ-প্রাপ্তরা দলীয় রাষ্ট্রপতির কৃপায় খালাস হয়ে বেরিয়ে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করা কি স্বাধীনতা? মানুষ খুন করে প্রভাবশালী হবার কারণে গ্রেফতার না হয়ে উল্টো শোকগ্রস্ত পরিবারকে মামলা না করার হুমকি প্রদান করে? কেন ব্যাংক কেলেঙ্কারীর মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে রাষ্ট্রকে দেউলিয়া বানিয়ে দেয়া? এর নামই কি স্বাধীনতা?
সারা বিশ্বের সামনে বড পতাকা তোলে ধরলেই কি স্বাধীনতা উদযাপন হয়ে যায়? সারা বছর গাঁজাখোর আর হেরোইঞ্চিদের বসবাসের সুযোগ দিয়ে ১৬ ই ডিসেম্বর পরিষ্কার করে ফুল দিলেই কি শহীদদের সম্মান হয়ে যায়?
স্বাধীনতা কি রাতারাতি আইন বানিয়ে ক্ষমতায় থাকার নাম? রাজাকাররা দল পরিবর্তনের কারণে হবে মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযোদ্ধাকে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে- এর নামই কি স্বাধীনতা? স্বাধীনতা মানে কি এক দলের হরতালে পুলিশ পিকেটিারের ভূমিকা পালন করবে আর একদলের হরতালে মাঠে নামলেই লাঠিপেঠা করে তাড়িয়ে দেবে? স্বাধীনতার মানে কি প্রশাসন দ্বারা বরোধী দলকে দমন করা? স্বাধীনতার মানে কি পেট্টল বোম দিয়ে মানুষ মারা? স্বাধীনভাবে দুর্নীতি করা? ব্যাংক থেকে অর্থ লুট করা? স্বাধীনতার মানে কি ছুটির দিনে হরতাল দিয়ে গণআন্দোলন ঠেকানো?
স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে? কী পার্থক্য হতো যদি পাকিস্তানের সঙ্গে থেকে যেতাম? পাকিস্তানের শাসকরা যেভাবে শোষণ করতো আমাদের, ঠিক সেভাবেই তো এখনো আমরা শোষিত হচ্ছি। শোষণ করা হচ্ছে আমাদের। তবে রূপ পাল্টেছে। আগের শাষণ ছিলো পাকিদের আর এখানকার শাষণ হচ্ছে স্বজাতি-বাঙালির দ্বারাই। শাসকের ভাষা বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি।
আমরা বাকস্বাধীনতা পাবো, ধর্মীয় স্বাধীনতা পাবো, মাছে ভাতে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা পাবো, আমরা শিক্ষা স্বাস্থ্য পাবো। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা পাবো, সেটা হচ্ছে নিরাপত্তা।
অবশ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি- আমরা যা পাবো বলে ভেবেছিলাম, প্রত্যাশার আকাশচুম্বি যে মিনারা নিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনছিলাম, তার সিকিভাগও কি আজ আমাদের পাওয়া হয়েছে?
১৬ কোটি মানুষ এখন অবরুদ্ধ। গণতন্ত্রের অর্থ এখন আর ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’ নয়। আমাদের নেতা-নেত্রীর কাছে ওই সংজ্ঞা এখন ‘তাঁদের দ্বারা, তাঁদের জন্য, জনগণের নামে তাঁদের ইচ্ছার শাসন’ হয়ে গেছে। তাঁদের কাছে গণতন্ত্র মানে পাঁচ বছর পর পর একদিনের ভোট, এছাড়া আর কিছু নয়। নইলে প্রতিদিন মানুষ বলি হবে কেন? কেন পথেঘাটে জ্যান্ত মানুষ কয়লা হবে?
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই কিন্তু রাজনৈতিক হানাহানি এখনো বন্ধ হয়নি। আমরা হয়তো ভূখ-ের স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো পাওয়া সম্ভবপর হয়নি। লাখ লাখ বেকার ঘুরে মরে পথে পথে, মুলো চোর ফাঁসিতে ঝোলে, ফেরারি আসামি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এ দেশে। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে মানুষে পিটিয়ে হত্যা করে প্রকাশ্য দিবালোকে। পুলিশ জনগণের হাতে মার খাচ্ছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে এমন অনিয়ম বা অপকর্ম কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই সাধারণ জনগণের কণ্ঠে এখনও উচ্চারিত হচ্ছে মুক্তি সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। এই সংগ্রাম শেষ করার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকেই নিতে হবে।
এখনো কী হানাহানি, কাঁদা ছোড়াছুড়ি ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখার সময় আসেনি? যদি না এসে থাকে আর আমরা নিজেদেরকে, দেশকে স্বাধীন বলে ভাবতে থাকি- প্রশ্ন জাগে তখন, তাহলে পরাধীন কারা? পরাধীনতার সংজ্ঞা কী?

Comment

Share.

Leave A Reply