চেতনার গায়েবানা জানাযা

0

রশীদ জামীল ::

… এর আগে দু’টি চেতনা নিয়ে বাণিজ্য হয়েছে বাংলাদেশে। একটি একাত্তরের চেতনা, অন্যটি দেওবন্দের। দু’টির পেছনেই কাজ করেছে রাজনীতি। একাত্তরেরটা হয়েছে দেশপ্রেমের লেবেল লাগিয়ে, দেওবন্দেরটা আহলে হক্বের। দু’হাজার তেরোতে হয়েছে চেতনা দুটোর গায়েবানা জানাযা। একটি শাহবাগ মোড়ে, অন্যটি শাপলায়। শাপলার ঘাপলা এবং শাহবাগের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। কথা আরো হবে। এসব কথা শেষ হয় না।

কয়লা ধুইলে ময়লা না গেলেও সোনা পোড়ালে খাটি হয়। সোনাও কিন্তু এক প্রকারের মাটি। মা আর মাটি অস্তিত্বের অপরিহার্যতা। একাত্তরের চেতনাপার্টি দেশকে বলে মা। দেওবন্দের চেতনাপার্টিও দেওবন্দকে বলে মাদরে ইলমি। ফারসি মাদর, বাংলায় মা। দু’টি চেতনাই এখন পুড়ে খাটি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য যে যা করার, দু’হাজার তেরোতে করে ফেলেছেন। মানুষও বুঝেগেছে আসল চেতনা আর বাণিজ্যিক চেতনার পার্থক্য কোথায়।

অতি সেনসেটিভ চামড়ার ভাই-বেরাদারগণের মুখ বেজার করার দরকার নাই। জানাযা হয়েছে বাণিজ্যিক চেতনার। রিয়েল চেতনা সচেতন থাকবে চৈতন্যের পরতে। শুদ্ধাচারি বোদ্ধাজনের সচেতন চেতনায়।

দুই:
একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা বিনা বিচারে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে না, অথচ চলছিল। বাংলাদেশের ফ্রন্টলাইন রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দহরম-মহরম ছিল তাদের সাথে। এদের বিরুদ্ধে, যেভাবেই জাগুক, তারুণ্যের জাগরণটা ছিল আশাব্যঞ্জক। দলান্ধতার বাইরে থাকা বাংলাদেশের মানুষ আশাবাদি হয়েছিল নতুন করে। এবার কিছু হবে। বেঈমানরা আর ছাড় পাবে না। যে কাজ বিএনপির পক্ষে করা সম্ভব ছিল না; তাদের ঘরেও আছে বলে। যে কাজ আওয়ামীলীগের পক্ষেও সম্ভব ছিল না; তাদের ঘরেও আছে বলে, সেই কাজটি, সেই বিচারটি এবার হতে পারে তারুণ্যের চাপে।

কিন্তু সপ্তাহ না ঘুরতেই লক্ষ তরুণের আবেগের সাথে প্রতারণা করে শাহবাগ নিজেকে বিক্রি করে দিলো। আরেকবার প্রমাণীত হল, ক্ষমতা ও পয়সার সামনে নীতি এবং আদর্শ কতবেশি অসহায়। সেইসাথে শাহবাগ তার মঞ্চে কয়েকটি জানোয়ারকেও জায়গা করে দিলো। একবারও ভাবলো না মানুষের মঞ্চে জানোয়ারের জায়গা দিতে নেই। সমস্যা হয়।

তিন
বাংলাদেশ, যে দেশের মুসলমান ঠিকমত পাঁচবেলা নামায পড়ে না, হালাল হারামের ধার ধারে না, কিন্তু তাদের আল্লাহ এবং নবীকে কটাক্ষ করে কেউ কিছু বললে আর সহ্য করতে পারে না। সেই দেশে গুটি কতেক বখাটে নবীজিকে নিয়ে আজেবাজে বকবে আর মুসলমান ঘরে বসে থাকবে, এটা কেমন করে হতে পারে?

বিক্ষিপ্তভাবে যে যার মত ক্ষোভ প্রকাশ করছিলো আর অপেক্ষায় ছিলো একজন মুয়াজ্জিনের, যিনি আযান দেবেন, ‘হাইয়্য আলাল ফালাহ’ বলবেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী মুসলমানের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অনুভব করলেন। নব্বই বছরের দুর্বল শরীর নিয়ে রাস্তায় নামলেন তিনি। বয়সের পিছুটানকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলেন সামনে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না নিজে, অথচ ষোলকোটি মুসলমানকে হাত ধরে দাঁড় করালেন। শারীরিক কারণে চলতে পারেন না কিন্তু দ্বন্দ্বিত দাবানলদের সাথে নিয়ে চললেন বিশ্বাসের মিছিলে। চট্টগ্রাম থেকে মতিঝিল। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠলো। কিন্তু কে জানতো হেফাজতের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে কিছুলোক, যারা গাছেরটা তো খায়ই, তলারটাও ছাড়ে না।

স্বপ্নটা যদি অনেক উপরে উঠে তারপর হোঁচট খায়, অধিকারটা যদি কেড়ে খায় শকুনের দল, ত্যাগের নযরানাকে কেউ যদি রাজনীতির আলমারিতে বন্দি করে, আঁতাত কিংবা সন্ধি করে, পকেট ভারির ফন্দি করে, তাহলে যা হবার তাই হয়। অথচ, কথাছিলো অন্যকিছু, ভিন্ন ধারার।

চার
পাঁচ বছর থেকে চেষ্টা ছিল শাপলার হিসাব মেলানোর।
লাশের হিসাব!
বাঁশের হিসাব!
পাওনা এবং প্রাপ্তির হিসাব!
আমানতের ঘাটতির হিসাব।
সওয়াব এবং খোয়াবের হিসাব।

সেদিনের সেই সুর, সে রাতের হাহাকার এখনো তাড়িত করে দিনরাত। প্রতিঘাত ছিলো না কোনো, তবুও বিক্ষত ছিলো আঘাতের পর আঘাত। এখনো যখন দেখি শহিদের নামগুলো কারো মুখে আসে না! এখনো যখন দেখি বড় বড় বাতচিত এখনো কারো মুখে ফাঁসে না। ছেলেহারা মা’গুলো শুকনো আঁচল ফেলে পথ চেয়ে বসে রয়,হয়ত আসবে কেউ মুছে দিতে জরা!
তবু কেউ আসে না।
তখন, ভাবনারা তাড়া করে। এলোমেলো করে দেয় হিসাবের খাতাটি। সত্যের স্লোগানে তো দোষ নেই। হলে হোক, শয্যা পাতাই আছে সমূদ্রের মাঝখানে, শিশিরের ভয় করে লাভ কী!

পাঁচ
বিশ্বাসের বহুবচন হল শাপলা এবং শাহবাগের পাণ্ডুলিপি একটু নেড়ে দেখা। বলা চলে নতুন করে হাশিয়া লেখা। সাথে একটু কওমিনামা। যাদের কাছে মনে হবে-কথা সত্য, তাদের জন্য ভালবাসা। যাদের গা একটু জ্বালাপোড়া করবে, তাদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক শুভ কামনা।

Comment

Share.

Leave A Reply