আফগানিস্তানে তো আমিও শহীদ হয়েছি!

0

যোবায়ের হাসান জেহাদ ::

কী লিখব, আর কী লিখব না? হৃদয়ের গভীরে এতটাই রক্তঃক্ষরণ হচ্ছে তা সত্যিই সীমাবদ্ধ ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না৷ কারণ, হৃদয়ের জ্বলন আর যন্ত্রনা এত বেশি যে, যতই লিখি, যতই বলি, কোনদিন এই লেখা আর বলা শেষ হবে না৷ কেননা সেই মুখগুলো তো আর কোনদিন ডেকে উঠবে না— আমি আজকের ফুল-শিশু, আমি নিষ্পাপ! আমি আগামীর তারুণ্য, আমি শক্তি! আমি আলো, আমি বিচ্ছুরিত হবো বিশ্বময়! এক রাঙা ভোরের অনল-সূর্য আনয়ণে আমি প্রতিশ্রুত, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ! আর কুরআন— সে যে বিশ্ব-মানবতার মুক্তির একমাত্র ঐশী গ্রন্থ—একে আমি জীবনের সূচনালগ্নে মিশিয়ে নিয়েছি নিজস্ব স্বত্ত্বার সাথে! আমি শুধু কুরআনের সাথে একাত্ম নয়; যেন কুরআনই হয়ে উঠেছি আদতে!

হ্যাঁ, কুরআনের প্রতিটি হাফেজ মূলত কুরআনেরই জীবন্ত ছবি৷ প্রাণিক-রবি৷ একথা অস্বীকার করার মতো নয়৷ কুরআনকে যে কষ্ট করে শিক্ষা-জীবনের প্রাথমিক স্তরেই আপনতর করে নিয়েছে৷ জীবনের পাথেয় বানিয়ে নিয়েছে তার ব্যাপারে কী বলা যায়? আর সে যদি হয় শিশু? বয়স যদি হয় এগারো কি বারো? তার ব্যাপারে সম্মানিত পাঠক আপনি কী বলবেন সে বিবেচনা আপনার৷ আমি এখানে নিশ্চুপ, নিষ্ক্রিয়৷ কিংবা বলতে পারেন আমি নিস্তব্ধ!

আমি জানিনা ঠিক কী ঘটছে আমার ভেতরে৷ দু’দিন ধরে আমি জানতে চেষ্টা করছি, বুঝতে চেষ্টা করছি এমনকি খুঁজতেও চেষ্টা করছি যে, আফগানিস্তানের কোথায় ‘ আমার লাশটি’, হ্যাঁ, আমার লাশটিই পাওয়া যায়৷ কারণ, আমার বিশ্বাস আমার বক্ষে ধারণকৃত কুরআন যারা ধারণ করেছে৷ তাদের পাগড়ী প্রদান অনুষ্ঠানে ‘সন্ত্রাসী’রা বোমা হামলা করেছে৷ আমার ভাইদের পরিকল্পিতভাবে শহিদ করেছে ওখানে তো নিশ্চিতভাবে আমিও শহিদ হয়েছি? ওখানের পাহাড়ি সবুজাভ ভূমিতে রক্তের যে বন্যা বয়েছে সে তো আমার রক্তই? আকাশ বিদীর্ণ করা যে আত্মচিৎকার সে তো আমারই মায়ের চিৎকার? বেঁচে থাকার যে আর্তি ওখানকার বাতাসকে ভারী করেছে সে তো আমার ভাইয়েরই আর্তি? লাশ সামনে করুণ চাহনি যে বাবার সে তো আমারই বাবা?

আমি এবং আমার ভাইয়েরা তো জানতাম না আজকের সূর্য টি কী অন্ধকারকে সাথে নিয়ে উদিত হয়েছে৷ কী দুর্ভিষহ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এর আলোয়৷ অনেকদিনের প্রতীক্ষিত একটি দিন—কী আনন্দই না ছিল মনে৷ কিন্তু… ৷ হাফেজ হয়েছে৷ পাগড়ী পাবে৷ একটি অনুষ্ঠান হবে তাদের মত করে৷ যুদ্ধ-বিগ্রহের একটি দেশ যতটুকু সম্ভব আনন্দ করবে৷ এমনটাই তো স্বাভাবিক ছিল৷ এখানে যে কথাটি না বললোই নয়৷ ওদের কাছে হাফেজ হওয়াটা কত বড় একটি সম্মান অর্জন তা একটি ভিডিও থেকে অনুধাবন করা যায়৷ পাহাড়ি এলাকা৷ চারপাশে পাহাড়ের বেষ্টনী৷ মাঝে একটুখানি ফাঁকা জায়গা৷ ওখানে একটি মাদরাসা এবং মসজিদ৷ এর বারান্দা ঘেঁষে স্থাপন হয়েছে একটি মঞ্চ৷ বড় সম্মানের সে মঞ্চ৷ সামনে সমবেত জনতা৷ মঞ্চের সামনে চেয়ার রাখা সারি করে৷ হাফেজে কুরআনেরা এখানে বসেছেন সবাই৷ একজন একজন করে ডাকা হচ্ছে পিতার নাম সহকারে৷ পিতাসহ সন্তান বিনয়ের সাথে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে৷ তারপর সনদ দেওয়া হলে সবাই একসাথে বসছে৷ এরপর হয়ত সুবিরল সম্মানের অধিকারী এই সূর্য-সন্তানেরা উৎফুল্ল হয়ে মায়ের কাছে যাবে৷ আজ বাসায় হয়ত মহিষের মাংসের সাথে সাধারণ রুটি নয় ভিন্ন কিছু রান্না হয়েছে৷ ছেলে যাবে মাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খাবে৷ কিন্তু… কিন্তু… কিন্তু হলো কি?

কী যে হলো৷ সেটা বাংলাদেশের মিডিয়ার দিকে তাকালে বুঝা যায়৷ বুঝা যায় আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দিকে তাকালেও৷ আসলে আমি অবাক হয়নি ওদের ভেতরের পাতায় সাদাকালো দু’লাইনের কলাম দেখে৷ অবাক হইনি দেশের অধিকাংশ টেলিভিশনে সংবাদটি না শোনায়৷ কারণ, বাংলাদেশ ‘জঙ্গিদের প্রশ্রয় দেয় না৷’ কিন্তু প্রশ্রয় তো কাউকে না কাউকে দিতেই হবে, বা দিবেই। কাকে দিবে? ‘সন্ত্রাসী’দের দিবে। দিয়েছেও।

শেষ যে কথাটি, ঐ ছেলেগুলো কিন্তু শিক্ষার্থী। শুধু এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে তো অবশ্যই; সারা বিশ্বাসের সব ক’টি স্কুলে সম্মিলিত প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা দরকার!

আজ এ পর্যন্তই। মনে যে পরিমাণ কষ্ট, ক্ষোভ, ঘৃণা এটা লিখে শেষ করা যাবে না। সুতরাং জ্বলুক। ছারখার হয়ে যাক। অনেক অনেক কথা থেকে অল্পবিস্তর বললাম। বলতে গেলে সূচনাতেই পরিসমাপ্তি টানলাম। দেখি আগামীতে আবারও একই বিষয় নিয়ে সামনে আসা যায় কিনা?
বড় করে কিছু লেখার ইচ্ছে আছে।

: লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

Comment

Share.

Leave A Reply