সিলেটের জৈন্তাপুরে মাওলানা মুজ্জাম্মিলের শাহাদাত; ঘটনার নেপথ্য কারণ

0

মাওলানা আবদুল ওয়াদুদ ::

প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সতের পরগনা সমৃদ্ধ বৃহত্তর জৈন্তায় শিরক-বেদআতসহ কোনপ্রকার ভন্ডামীর আবাস ছিলো না। এখানকার মানুষ যেমন সহজ-সরল, তেমন ধর্মপ্রাণ। এই জৈন্তা হক্কানী আলেমদের চারনভূমি। এখানে জন্ম নিয়েছেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী রহ., বীর মুজাহিদ আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ হরিপুরী রহ. সহ অসংখ্য জগদ্বিখ্যাত উলামায়ে কেরাম। বৃহত্তর জৈন্তায় তিন হাজারেরও বেশি কওমী মাদরাসা রয়েছে। এখানকার প্রতিটি জনপদ আলেমদের বাতলানো পথ অনুসরণ করত: সঠিকভাবে দ্বীনদারী পালন করে আসছে। নববী সুন্নতে আদর্শবান জৈন্তার মানুষের চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে কুতবে আলম আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এই ভূখণ্ডকে “জৈন্তা শরীফ” উপাধীতে ভূষিত করেছিলেন।

কিন্তু আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে খনিজ সম্পদে ভরপূর এই জৈন্তায় কতিপয় বহিরাগত শ্রমিক ও মজদুরের আবির্ভাব ঘটে। যারা জৈন্তার বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে শ্রমিকের কাজ করত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বিভিন্ন মতের এই শ্রমিকদের আবাসনের জন্য জৈন্তার কিছু পরিত্যাক্ত ভূমি বরাদ্ধ করা হয়। প্রথমে সংখ্যায় কম হলেও ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তারা আলাদা একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হয়ে যায়। জৈন্তার মানুষ যাদেরকে ‘আবাদী’ বলে সম্মোধন করে থাকে। সেই আবাদী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হলেও অধিকাংশ এখনও দিনমজুর।

আবাদী সম্প্রদায় যেহেতু বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত, সেহেতু তারা বিভিন্ন মতেরও অনুসারী। কেউ মাইজভান্ডারী, কেউ দেওয়ানবাগী কেউ রাজারবাগী, কেউ আটরশি আবার কেউ ফুলতুলিও বটে। তবে তাদের মধ্যে ভালো বুঝা-পড়া থাকার দরুন তারা সকলেই জোট বেধে নিজেদের সুন্নী দাবী করা শুরু করে। প্রথমে গোপনে তাদের কার্যক্রম চললেও সময়ের পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সুবাদে প্রকাশ্যে ভন্ডামী কার্যাদি পরিচালনা শুরু করে। মিলাদ-কিয়াম, উরুসসহ অন্যান্য শরীয়ত বিরুধী কাজ যখন প্রকাশ পেলো, তখন স্থানিয় উলামায়ে কেরাম এসব করতে মানা করলেন। কিন্তু তারা নিষেধ-বাধা অমান্য করে উল্টো বাহাসের চ্যালেঞ্জ করে বসলো। উক্ত চ্যালেঞ্জের ভিত্তিতে স্থানিয় মুরব্বীদের সমন্বয়ে একটি অঙ্গিকার পত্র তৈরী করা হয়। উক্ত অঙ্গিকারপত্রে আলেমদের পক্ষে চ্যালেঞ্জ গ্রহিতা হিসেবে স্বাক্ষর করেন হরিপুর বাজার মাদরসার মুহাদ্দিস হযরত মাও. আব্দুস সালাম। পক্ষান্তরে ভন্ডদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মো: গোলাম কাদির মিলন। অঙ্গিকারপত্রে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ হয় যে,৫-৪-২০১২ ইং বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় সতের পরগনার মুরব্বিয়ান ও স্থানিয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে বাহাস অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত বাহাস অনুষ্ঠানে উভয় পক্ষ স্ব স্ব দাবীর পক্ষে দলিল পেশ করবে। দলিলের ভিত্তিতে সঠিক দল প্রমাণিত হবে এবং অপর দলের সমস্ত কার্যক্রম বাতিল বলে ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো তারা উক্ত বাহাস অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার মতো সৎসাহসটুকু দেখাতে পারে নাই। চ্যালেঞ্জ করেও বাহাসে উপস্থিত হয় নাই। দুই ঘন্টা অবধি অপেক্ষার পর সতের পরগনার মুরব্বী ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একটি লিখিত সিদ্ধান্তনামা করা হয়। সেদিনের সিদ্ধান্তনামা পাঠকদের জন্য হুবহু উল্লেখ করছি।

“অদ্য ০৫-০৪-২০১২ ইং রোজ বৃহস্পতিবার স্থানিয় ইরাদেবী মিলনায়তনে বৃহত্তর জৈন্তিয়া সতের পরগনা সালিস সমন্বয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব আবু জাফর আব্দুল মৌলা চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও স্থানিয় গণ্যমান্য ওলামা ও মুরব্বীয়ানে কেরামের উপস্থিতিতে ১৭ পরগনা সালিস সমন্বয় কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জৈন্তাপুর মডের থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব আব্দুল জলিল সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সভায় নিম্ন লিখিত প্রস্থাবাদি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

১. আটরশি ভক্তদের পক্ষে স্বাক্ষরদাতা মিলন আজকের বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় প্রতীয়মান হয় যে, এহেন কার্যকলাপ ভণ্ডামী, শরীয়ত বিরোধী ও অনৈসলামিক। এই সিদ্ধান্তে সকল মুরব্বিয়ান একমত।
২. ওলামাদের পক্ষে চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীসহ ১৭ পরগনার গণ্যমান্য ওলামায়ে কেরাম যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে আটরশির পীর ভক্তদের শরীয়ত বিরোধী ভ্রান্ত ধারণাগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করলে আজকের সভা সর্ব সম্মতভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আমাদের সতের পরগনাধীন কোন এলাকায় উক্ত আটরশির পীর ভক্তদের কর্মতৎপরতা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ এবং নিষিদ্ধ।
৩. মো: গোলাম কাদের মিলন কর্তৃক বিগত ১৯-০১-২০১২ ইং তারিখে সতের পরগনা সালিস সমন্বয় কমিটির অনুষ্ঠিত সভায় অত্রাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো লঙ্ঘন, বিভিন্ন সময় সতের পরগনা নিয়ে কঠুক্তি, বিতর্কিত সভা আয়োজনের মাধ্যমে এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি এবং অঙ্গিকার অনুযায়ী আজকের সভায় উপস্থিত না হওয়া সহ তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগের বিচারের দায়ভার সতের পরগনার পক্ষ হতে তার নিজ এলাকা জৈন্তাপুর পরগনার ওপর অর্পণ করা হয় এবং সতের পরগনার পরবর্তী সভায় উক্ত বিষয়ে অবহিত করার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৪. সতের পরগনাধীন কোনো এলাকায় যদি পীর-মুরীদির নামে ভ্রান্ত আকীদা পোষণকারী কোনো জামাত যেমন- আটরশি, দেওয়ানবাগী, রাজারবাগী, মাইজভান্ডারী, চন্দ্রপুরী, সুরেশ্বরী গং সহ ওই সমস্ত ভ্রান্ত মাজারপুজারী দল ইসলামী সভা সমাবেশের নামে মানুষের মাঝে ভ্রান্ত আকীদা প্রচার করে, তাহলে স্থানিয় মুরব্বীয়ান ও ওলামাগণ সেখানে গিয়ে সতের পরগনার আদেশের প্রেক্ষিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাধা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়।

অতএব, উক্ত এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষে উপরোল্লিখিত সিদ্ধান্তাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য সতের পরগনার আপামর জনসাধারণেরর প্রতি অনুরোধ রইলো।

অনুরোধক্রমে
আলহাজ্ব আবু জাফর আব্দুল মৌলা চৌধুরী
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি
বৃহত্তর জৈন্তিয়া ১৭ পরগনা সালিস সমন্বয় কমিটি, জৈন্তাপুর, সিলেট।”

উপরোক্ত সিদ্ধান্তের পর বহুদিন যাবৎ তাদের তৎপরতা মোটামুটি বন্ধ ছিলো। কিন্তু এভাবে আর ক’দিন বন্ধ থাকা যায়! এবার মুরব্বীদের কাছে এসে বিনয়ের সুরে প্রস্তাব করলো যে, আমরা কোনো প্রকার বিতর্কিত বিষয়াদির আলোচনা ছাড়া কেবলমাত্র ইসলাহী বিষয়ের ওপর আপনাদের পরামর্শে মাহফিল করতে চাই।

এটি যে মূলত তাদের একটি চক্রান্তমূলক গভীর ষড়যন্ত্র ছিলো, সে বিষয়ে আমাদের সরলমনা মুরব্বীরা সম্পূর্ণ বে-খবর ছিলেন। তাই কতিপয় শর্তের ভিত্তিতে মাহফিলের অনুমতি দিয়ে দেন। তবে শর্তানুযায়ী মাহফিল হলে অবশ্য অসুবিধার কিছু ছিলো না। কিন্তু কে মানে কার কথা- ওরা যে মূলত মিথ্যাবাদি, তার প্রমানও তারা অক্ষরে অক্ষরে দিয়ে গেলো। মুরব্বীদের আরোপিত শর্তাদির মধ্যে অন্যতম ছিলো-
১. মাহফিলে বিতর্কিত কোনো বিষয়ে আলোচনা করা যাবে না।
২. বিতর্কিত কোন বক্তাকে দাওয়াত করা যাবে না।
৩. স্থানীয় বিশেষজ্ঞ কোন আলেমকে মাহফিলের সভাপতি করতে হবে।

উপরোক্ত সমুদয় শর্ত মেনেই তারা মাহফিলের অনুমতি নেয়। জৈন্তার বিভিন্ন স্থানে উক্ত শর্তের ভিত্তিতে কয়েকটি মাহফিলও হয়। স্বাধীনভাবে মাহফিলে ভন্ডামি করতে না পারায় তারা আগ্রাসী মনোভাবে অবতীর্ণ হয়। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে বিগত ২৬-২-২০১৮ ইং আমবাড়ির মাহফিল আয়োজন করে। এই মাহফিলে মুরব্বীদের আরোপিত শর্তের তোয়াক্কা না করেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র স্টেজের নিচে রেখে মাহফিল শুরু করে।

উক্ত মাহফিলে হযরত মাও. আব্দুস সালামকে সভাপতি রাখতে বাধ্য হয়। তিনি তাঁর মাদরাসা (হরিপুর বাজার মাদরাসা) কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সেখানে উপস্থিত হন। সাথে যাওয়ার জন্য কিছু ছাত্র আগ্রহ প্রকাশ করলে হুজুর অনুমতি প্রদান করেন। বিতর্কিত ভন্ড বক্তা গাজী সোলায়মান ছিলো সেখানকার প্রধান বক্তা। বয়ানের বিষয় ‘যাকাত’ থাকলেও তিনি তা ওভারটেক করে নবী সা. নূরের তৈরীর আলোচনা শুরু করে একটি জাল হাদীসের উদ্ধৃতি দিলে পাশে বসে থাকা মাও. আব্দুস সালাম বিনয়ের সাথে উক্ত হাদীসের রেফারেন্স তলব করেন। বক্তা তখন রেফারেন্স দিতে ব্যর্থ হয়ে পাশ কেটে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং উপস্থিত দর্শকদের উত্যক্ত করে পরিস্থিতি উত্তাল করে তোলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্টেজের নিচে রাখা হাতিয়ার নিয়ে ভন্ড সন্ত্রাসীরা মাও. আব্দুস সালামের দিকে তেড়ে আসে। শুরু হয় এলোপাতাড়ি আক্রমন। সাথে থাকা ছাত্ররা হুজুরকে বাঁচাতে চাইলে তাদের ওপর চড়াও হয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। অনেকেই তখন মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হুজুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিন্তু শহীদ মুজ্জাম্মিল কিছুতেই হুজুরকে ফেলে যায় নি। আঘাতের পর আঘাত সহ্য করেও হুজুরকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। এ যেনো অহুদের প্রান্তরে আবু তালহার বক্ষ প্রাচীর। নিজের জীবন বাজি রেখে উস্তাদকে বাঁচানোর এক অনবদ্য ইতিহাস রচনা করে গেলো বাচ্চা বয়সী মুজ্জাম্মিল। হুজুরের প্রাণ রক্ষা হলেও শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনাময়ী সেই মুজ্জাম্মিল শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে চলে গেলো মাওলার সান্বিধ্যে। নিথর দেহখানি পড়ে রইলো রাস্তার ধারে। গলায় সবুজ রুমাল বেষ্টিত ঘুমন্ত মুজ্জাম্মিল ছিলো জান্নাতি হুর-পরীদের চাহিদা ও পছন্দের পাত্র।

এখানে একটি কথা বলা বাহুল্য যে, ভন্ডদের টার্গেট ছিলো মাও. আব্দুস সালামকে হত্যা করা। গোপন সূত্রে পাওয়া খবরে জানা যায়, সেই সন্ত্রাসীদের মধ্যে একজন ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলে- “সালামকে তো মৃত ভেবেই ছেড়ে আসলাম। কিন্তু শালা মরে নি। ওকে মারতে গিয়ে সবচে’ বাধার সম্মুখীন হয়েছি মুজ্জাম্মিলের কাছে। কোন দিক থেকে আক্রমন করলেই মুজ্জাম্মিল বাজপাখির মতো উড়াল দিয়ে এসে নিজের ওপর নিয়ে নেয়। বার বার তাকে সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। টেনে-হেঁচড়ে একটু সরালে আবার উড়াল দিয়ে এসে পড়ে।”

মুজ্জাম্মিলের শাহাদাতের পর মাও. আব্দুস সালামকে একটি ঘরে নিয়ে রাখা হয়। সেই ঘরেও সেই মানবরূপী হায়েনাগুলো আক্রমন করে ঘরকে জ্বালিয়ে দেয়। পরে সেখান থেকেও তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয়। ছাত্ররা গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রামের বিভিন্ন ঘরে আশ্রয় চাইলে পাষন্ড মহিলারা আশ্রয়ের বদলে আক্রমনে উদ্যত হয়। তখন ব্যাকুল হয়ে এই মুমূর্ষ অবস্থায় বিভিন্ন গোহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ওদিকে ভন্ড সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে এখনও তাঁদেরকে খোঁজে বেড়াচ্ছে।

এই লোমহর্ষক ঘটনার খবর যখন হরিপুরে আসে, তখন স্থানিয় চেয়ারম্যানসহ কিছু মুরব্বী পর্যবেক্ষণের জন্য ঘটনাস্থলে যান। পরবর্তী আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করার জন্য হরিপুর থেকে কিছু মানুষ সেখানে যান এবং আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করেন। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান, সাবেক চেয়ারম্যান ও হরিপুরের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শহীদ মুজ্জাম্মিলের লাশ থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। শান্তিপূর্ণভাবে প্রশাসনের কাছে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হয়। প্রশাসনও সুষ্টু বিচারের ব্যাপারে সবাইকে আশ্বস্ত করেন।

পরের দিন মঙ্গলবার বাদ জোহর লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে শহীদ মুজ্জাম্মিলের নামাযে জানাযা সম্পন্ন হয়। জানাযা শেষে বৃহত্তর সিলেটের ওলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে ‘ঈমান আক্বীদা সংরক্ষণ কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের রূপরেখা তৈরী করা হয়। প্রায় পঞ্চাশজন সন্ত্রাসীদের নাম উল্লেখ করে জৈন্তাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা মাও. আব্দুস সালামকে বাদী করে দায়ের করা হয়। পরবর্তী কর্মসূচী এই সংগঠনের মাধ্যমে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়। জৈন্তার বটতলায় স্মরণকালের ঐতিহাসিক সমাবেশ হয়। তাছাড়া হরিপুর, দরবস্ত, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাটসহ বৃহত্তর জৈন্তার বিভিন্ন স্থানে শহীদ মুজ্জাম্মিলে খুনীদের ফাঁসি ও ভন্ডমুক্ত জৈন্তার দাবীতে বিশাল বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ একই দাবীতে উত্তাল হয়ে ওঠে। ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মিছিল, মিটিং ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়। সর্বশেষ জাফলং আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে লক্ষ লক্ষ জনতা স্বতস্ফুর্ত উপস্থিতিতে বিশাল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সকলের দাবী একটাই ছিলো, খুনীদের ফাঁসি চাই- মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চাই।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শহীদ মুজ্জাম্মিলের হত্যাকারী কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় নি। প্রধান আসামীরা জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। খুনীরা উল্টো উলামায়ে কেরাম ও মান্যবর ব্যক্তিদেরকে জড়িয়ে হয়রানীমূলক মামলা একের পর এক করেই যাচ্ছে। তৌহীদি জনতার আন্দোলনকে স্থিমিত করার জন্য নানাবিদ কৌশল অবলম্বন করছে।

সর্বশেষ সতের পরগনা সালিস সমন্বয় কমিটি বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিস্পত্তি করার জন্য তৌহিদী জনতার মতামত নিয়েছেন। অবশ্য শর্তসাপেক্ষে বিষয়টি তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে। জানিনা হকপন্থি জনতার প্রাণের দাবী পূরণ হবে কি না? তবে সারাদেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে, যেনো শহীদ মুজ্জাম্মিলের খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। শিরক-বেদআতমুক্ত হয় পবিত্র “জৈন্তা শরীফ”।

লেখক: মুহাদ্দিস, খতীব ও বিশিষ্ট লেখক

Comment

Share.

Leave A Reply