হেফাজত : ক্রিয়া, প্রক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া

0

রশীদ জামীল ::

অজয় ও বিজয় ছিলো দুই বন্ধু। অজয় ছিলো পড়ালেখায় মেধাবী। আর বিজয়ের অবস্থা ঠিক উল্টো। বলা যায় গাধাবী। ক্লাশ ওয়ান থেকে প্রতিটি পরীক্ষায় বিজয় বসেছে অজয়ের পেছনে। অজয়ের খাতা দেখে দেখে প্রায় হুবহুই মেরেছে সে। রেজাল্ট বেরুনোর পর দেখা গেছে দু’জনেই পাশ। এভাবে একদিন তারা দু’জনেই বিএ পাশ করে ফেললো। এবারে চাকরি খোঁজার পালা।

একদিন একটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তারা গেল ইন্টারভ্যু দিতে। অজয় যখন সাক্ষাৎকার দিতে ভেতরে ঢুকতে যাবে, তখন বিজয় গিয়ে কানেমুখে বললো, দোস্ত, তুই তো জানিস, আমার অবস্থা হচ্ছে চাঁদের মত। চাঁদের যেমন নিজস্ব কোনো আলো নেই, সুর্যের আলোয় সে আলোকিত, তেমনি আমার সব ইলিমই তো তোর সৌজন্যে। এ পর্যন্ত এসেছি তোর উপর ভরসা করে, তোর সাহায্য নিয়ে। আজ আমাকে শেষ সাহায্যটুকু কর।
অজয় বললো, আমাকে কী করতে হবে?
বিজয় বললো, তোকে যখন ওরা প্রশ্ন করবে, তখন উত্তরগুলো একটু জোরে দিস, যাতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুনতে পাই।
সম্মতিসূচক মাথা দুলিয়ে অজয় ভেতরে ঢুকে গেল। দরজায় কান পেতে রইলো বিজয়।

নিয়োগদাতারা অজয়কে মোট তিনটি প্রশ্ন করলেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল নিম্নরূপ:

প্রশ্নকর্তা: মিষ্টার অজয়! খুব সহজ একটি প্রশ্ন করছি। বলুন দেখি বাংলাদেশ কবে স্বাধীন হয়েছিলো?
অজয়: প্রক্রিয়াটি তো স্যার শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। অবশেষে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর এসে চূড়ান্ত সাফল্য আসে।

প্রশ্নকর্তা: গুড। তো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মোট কতজন লোক শহিদ হয়েছেন? কতজন বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন? কয়েকজনের নাম বলুন তো?
অজয়: লক্ষ লক্ষ লোকের অবদান আছে স্যার। দু’একজনের নাম বলে বাকীদের অবদানকে আমি খাটো করতে চাই না।

প্রশ্নকর্তা: (খুশি হয়ে) অত্যন্ত চমৎকার করে বলেছেন তো। আপনার জন্য শেষ প্রশ্ন, মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় সেটা বেরিয়ে এসেছে। বলুন দেখি এ ব্যাপারে অগ্রগতির সর্বশেষ অবস্থা কী?

অজয়: এ ব্যাপারে স্যার গবেষণা চলছে। এখনো চূড়ান্ত করে কিছু বলা হয়নি। চুড়ান্ত রেজাল্ট পাওয়া গেলে আপনারাও জানতে পারবেন, আমিও জানতে পারবো।
প্রশ্নকর্তা: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
.
সাক্ষাৎকার দিয়ে বেরিয়ে এলো অজয়। এবার ডাক পড়লো বিজয়ের। নির্ভার গতিতে হাসিমুখে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। অজয় কথামত সবগুলো উত্তরই স্বাভাবিকেরচে জোরে দিয়েছে। শুনতে কোনো অসুবিধাই হয়নি। কাজ শুধু একটাই, উত্তরের সিরিয়ালগুলো ঠিক রাখতে হবে। কোন্ উত্তরের পরে কোন্টা, সেটা মনে রাখতে হবে। এটা কোনো ব্যাপার না। তিনটাই মাত্র প্রশ্ন। সুতরাং প্রিপারেশন কমপ্লিট। টেনশনের কারণ নেই।
.
এখানে একটি কথা জানিয়ে রাখি, অজয় বিজয়ের কথামত উত্তরগুলো জোরে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্নকর্তারা তো আর প্রশ্নগুলো জোরে করেন নি। ফলে বিজয় প্রশ্নগুলো আর শুনতে পায়নি।
.
এদিকে হয়েছে আরেক সমস্যা। বিজয়ের আবেদনপত্রে তথ্যগত ছোট্ট একটি অসঙ্গতি ধরা পড়েছে নিয়োগদাতাদের চোখে। বয়স লিখা হয়েছে পঁচিশ, আবার জন্ম তারিখের কোঠায় যে তারিখ লেখা হয়েছে, সেটা হিসাব করলে বয়স গিয়ে দাঁড়ায় আঠাশে।

প্রশ্নকর্তারা যখন বিজয়কে প্রশ্ন করতে করছেন, তখন বিজয় উত্তরের সিরিয়াল সঠিকভাবে মনে রাখার কাজে এতই ব্যস্ত ছিল যে, প্রশ্নকর্তারা কী প্রশ্ন করছেন, সেদিকে কান দেয়ার সুযোগই ছিল না তার। আবেদনপত্রে জন্মতারিখ ও বয়স সংক্রান্ত তথ্য বিভ্রাটের কারণে প্রশ্নকর্তা বিজয়কে জিজ্ঞেস করলেন-

– মিষ্টার বিজয়! আপনার প্রকৃত জন্ম তারিখটা যেনো কবে?
অজয়ের এক নাম্বার উত্তর বিজয়ের ঠোঁটের আগায়তেই ছিল। ঝটপট উত্তর দিল, ‘প্রক্রিয়াটি তো স্যার শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। অবশেষে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর এসে চূড়ান্ত সাফল্য আসে!

পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ী করতে লাগলেন জুরিবোর্ডের কর্মকর্তারা। এই ছেলে কী বলছে! কোনো পাগল-টাগল ভুল করে ভেতরে ঢুকে অন্য কারো আবেদনপত্রের বিপরীতে ইন্টারভ্যূ দিতে শুরু করেনি তো? নিশ্চিত হবার জন্য তারা দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন-

– এ্যাই ছেলে! তোমার বাবার নাম কী?
এক সেকেন্ড না ভেবেই বিজয় উত্তর দিল, ‘লক্ষ লক্ষ লোকের অবদান আছে স্যার। দু’একজনের নাম বলে বাকীদের অবদানকে আমি খাটো করতে চাই না!

বিস্ময়ের ষোলকলা পূর্ণ হলো জুরিবোর্ডের সদস্যদের। এই ছেলের মাথায় যে বেশ ভাল গণ্ডগোল আছে, এ ব্যাপারে আর তাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিছুটা ধমকের সুরেই তারা বললেন-

-এ্যাই ছেলে! তোমার কি মাথা খারাপ? কী সব আবোল তাবোল বকছো?
বিজয় সাথে সাথেই উত্তর দিল, ‘এ ব্যাপারে স্যার গবেষণা চলছে। এখনো চূড়ান্ত করে কিছু বলা হয় নি। চূড়ান্ত রেজাল্ট পাওয়া গেলে আপনারাও জানতে পারবেন, আমিও জানতে পারবো…’

হেফাজতের তিন জাদরেল যুগ্ম মহাসচিবসহ যে নেতাকেই হেফাজতকেন্দ্রিক সেনসেটিভ কোনো প্রশ্ন করেছি, জবাব দিয়েছেন বিজয়ীয় স্টাইলে। প্রশ্ন যেমনই হোক, উত্তরটা তাদের কমন ছিলো…

Comment

Share.

Leave A Reply