কোটা নিয়ে ছোটাছুটি

0

রশীদ জামীল ::

[সময় বদলেছে, সমস্যা বদলায়নি। তখনও রক্ত ঝরছিলো, আজও রক্ত ঝরছে! রক্তের রঙ লাল। আগের মতই। সুতরাং পুরনো কথা নতুন করে সামনে আনাই যায়।]

কোটা
কোটা পদ্ধতি নিয়ে রীতিমতো রক্তারক্তি অবস্থা! কেউ বলে থাকতে হবে, কেউ বলে মানি না। সাধারণ জনগণ বলে, আমরা এসব জানি না! ক্ষিধা লাগলে ভাত চাই, পরার জন্যে কাপড় চাই। সাথে একটু নিরাপত্তা। ব্যস!

-সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে একেক দপ্তরে কোটা পদ্ধতি একেক রকম। কোটা ব্যবস্থা থাকবে কি থাকবে না অথবা থাকা উচিৎ কি না-সেটা নিয়ে কথা বলছেন তিন কোটার লোক।
১. সুবিধাভোগী
২. সুবিধাবঞ্চিত
৩. বিজ্ঞজন
আমরা যারা এই তিনের কোনো কোটাতেই পড়ি না, আমাদের ভাবনা কী?

সমাজের সেই অংশ, যারা সকালে ঘর থেকে বেরো’য় কাজের সন্ধানে। সে জানে না কোথায় তার জন্য একটু সুযোগ আছে খাঁটুনির। এদের জন্য কোথাও কোনো কোটা পদ্ধতি নেই! কাজ পেলে খাও, না পেলে না খেয়ে থাকো। আফসোস! নির্বাচনের আগে হাতেগোনা কয়েকদিন ছাড়া এদের জন্য ভাববার সময় থাকে না সেই তাদের, যারা মানবতা আর দেশপ্রেমের মৌসুমি স্লোগান দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন!

রমযানের প্রথম সকাল রক্তাক্ত হল কোটা পদ্ধতির কারণে। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রথম শ্রেণির চাকরিতে ৫৫ শতাংশ নেয়া হয় বিভিন্ন কোটা থেকে, আর ও ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে। যারা ভাবছেন, কোটা পদ্ধতি উঠিয়ে দেয়া দরকার, তাদের কথা হচ্ছে, এতেকরে মেধার অবমূল্যায়ন হয়। তুলনামূলক কম মেধাবী বা অযোগ্যরা সুযোগটা পেয়ে যায়।

আবার কোটা পদ্ধতির পক্ষেও একশ’ এক যুক্তি দাঁড় করানো যায়। উদাহরণ দিই।

বিসিএস ক্যাটাগরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ ও উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ। এখানে অনেকগুলো ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আজ শুধু একটি নিয়ে কিছু বলি। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান কোটা।

যাদের ত্যাগে এদেশ পেলাম, তাদের কথা ভুলে গেলে গাদ্দারি করাহয়। সঙ্গতকারণেই তাদের সন্তান-সন্ততির প্রতি জাতির মানবিক একটা দায়ভার আছে। কিন্তু যে যুগে পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ হাসিল করা যায়, যে দেশে মার্কামারা স্বাধীনতাবিরোধী দলের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধা শাখার কথা শোনা যায়, যে দেশের রাজনীতির মূলনীতিই হয় নীতিহীনতা, যে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন একটিও খুঁজে মিলে না, যারা তাদের ক্ষমতার রাজনীতির জন্য দেশের অস্তিত্বের সাথে আপোষ করে না, চেতনার চিৎকারে গলা ভেঙ্গে ফেলার পরপরই পতাকা নিয়ে বাণিজ্য করে না, সে দেশে বিতর্কের উর্ধ্বে ওঠে কীভাবে কী করা সম্ভব; ব্যাপারটি নিয়ে আরো স্বচ্ছতার সাথে ভাবা দরকার। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা, সেটা অরাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত হওয়া দরকার। মুক্তিযুদ্ধটাকে রাখা দরকার বিতর্কের উর্ধ্বে। চেতনা নিয়ে বাণিজ্য করবার সুযোগ যেনো কারো না হয়!

দেশে সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা কতো?
দু’লাখের মতো তো!

আমরা জানি এদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ লোক শহিদ হয়েছেন। তাদের কি কোনো তালিকা আছে? আমরা কি কখনো তাদের তালিকা করার কথা ভেবেছি? ৩০ লাখ লোক জীবন দিলো, তাদের বংশধরদের জন্য কি কোটা আছে কোনো? আমরা কেমন মানবিকতার কথা বলি! সনদধারী দু’লাখ মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের দায়িত্ব নেব কিন্তু ত্রিশ লাখ শহীদের অসহায় পরিবারের কে কোথায় কেমন আছে, একটু খোঁজও নেব না?

আমি জানি না যে পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, কোটা পদ্ধতি বহাল থাকে কি-না। না থাকলে বিকল্প কী হতে পারে, সেটা নিয়েও নিশ্চয় ভাবা হবে। আর থাকলে আমার দাবি হল, ত্রিশলাখ শহীদানের সন্তান-সন্ততির জন্যও ব্যবস্থা থাকা দরকার। এ জন্য আগে তাদের তালিকা করতে হবে। যারা তাদের জীবন দিলো আমাদের জন্য, তাদের কথা ভুলে বসে থাকলে তো হল না। একই ক্যাটাগরিতে রক্ত ঝরানো দেশের সুর্য সন্তানদের ২ লাখকে মূল্যায়ন করা হবে ৩০ লাখকে ভুলে, এটা কেমন কথা?

Comment

Share.

Leave A Reply