হোলি উৎসবের বলি

0

সাইফ রাহমান ::

রাস্তায় নেমেছে। কিশোর-কিশোরী। যুবক-যুবতীরা। হোলি উৎসব বরণ করে নিতে। সাথেসাথে উল্লাসে মেতে উঠছে সবাই। বাজনার তালবেতাল আওয়াজে জমছে খুব করে। একজন আরেকজনকে ধরে দুলছেন। অবাধে রঙ মাখামাখি চলছে। বোতলের মধ্যে রঙবেরঙের রঙ। রাজধানীর শাহবাগ চত্বর পুরোটাই বন্ধ। রঙ মাখামাখির উৎসব বলে কথা। একেঅপরের গায়ে রঙ ছিটিয়ে দিচ্ছেন।

এমতাবস্থায় সিএনজি করে আসছেন সানজিদা ও তার বাবা আব্দুল কুদ্দুস সাহেব। তারা এদিক দিয়ে যাবেন। অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসে। ঠিক এগারোটার সময় সানজিদার পরীক্ষা। সানজিদা এর আগে দু’বার পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু রিটেনে ভালো করলে ভাইভায় ভালো করতে পারেনি, ভাইভায় ভালো হলে রিটেনে না! এভাবেই দু’টা পরীক্ষা গোল্লায় গেছে সানজিদার। এবার লাস্ট পরীক্ষা। জীবন মরণের লড়াই। সানজিদাকে এবার পাশ করতেই হবে। নয়তো তার বাঁচামরা সমান হয়ে যাবে। সানজিদা যখন ছোট, তার মা মারা যান। তারপর থেকেই সে চাচা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবকে পিতা বলে চিনে। আব্দুল কুদ্দুস সাহেব এভাবেই সানজিদাকে কোলেপিঠে মানুষ করছেন। সানজিদার পিতা অস্ট্রেলিয়া থাকেন। সানজিদা ছোট থাকতেই তিনি অস্ট্রেলিয়া চলে যান। তাকে তার মার কাছে রেখে। জীবিকার তাগিদে।

তারপর হঠাৎ করেই সানজিদার আম্মু ক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে যান। ক্যান্সারের রোগীর রক্ষা নেই। সবাই জানে। তিনিও জানতেন। সানজিদার বাবার দেওয়া মুক্তোখচিত একখানা রুমাল ছিলো তার কাছে। বিয়ের দিন রাতে এই রুমালখানা দিয়েছিলেন। ভালোবাসার উপহার। যেহেতু এবার আর তার রক্ষা নেই, তাই তিনি ভাবলেন এই রুমালটা সানজিদাকে দিয়ে যাই। সে যেন নিজ হাতে রুমালটা তার বাবাকে পৌঁছায়। তিনি তাই করলেন। রুমালটা সানজিদাকে দিয়ে বললেন, এই রুমালটা তুমি তোমার বাবার কাছে দিবে। যেভাবেই হোক। শেষসময়ে তোমার কাছে এটাই আমার আবদার।

সানজিদার মা মারা যাবার দুইদিন আগে হঠাৎ করে তার বাবার খোঁজ নেই। তিনি দেশে আসার কথা ছিলো। যেদিন দেশে আসবেন, তার আগের দিন থেকে খবর নেই। মোবাইল বন্ধ। কেউ খোঁজে পাচ্ছেনা। অনেক চেষ্টা করেও খোঁজে পাওয়া গেলো না। এদিকে তার মা মারা গেলেন। কী করা! মুখ তুবড়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান সানজিদাকে চাচা আব্দুল কুদ্দুস সাহেব ভরণপোষণ করে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলতে চাইলেন। ইংলিশমিডিয়াম স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ভর্তি করে দিলেন ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল এন্ড কলেজে। তারপর স্টুডেন্টভিসায় অস্ট্রেলিয়া যাবার সিদ্ধান্ত।

ছোটকালের সানজিদা। সবকিছু মনে না থাকলেও শেষসময়ে তার মার আবদারটা মনে রেখেছে। একেবারে হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে। সে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে তার বাবাকে খোঁজে বের করে মায়ের আবদারটা পূরণ করতে চায়।

দু’বার পরীক্ষা দিয়েছে, কাজ হয়নি। কিন্তু এবার লাস্ট। উত্তীর্ণ না হলে আত্মহত্যা করবে, সানজিদার এমন বেগতিক অবস্থা। সানজিদা রেডি। লাস্ট পরীক্ষা বলে কথা। সবকিছু মুখস্ত। সানজিদার ধারণা এবার সে কৃতকার্য হবেই। আব্দুল কুদ্দুস সাহেব আর সানজিদা সিএনজি করে আসছেন। শাহবাগ চত্বর দিয়ে যাবেন এজন্য যে, এদিক দিয়ে গেলে অস্ট্রেলিয়া দূতাবাস একেবারে কাছে। সময় বাঁচবে। হাতে আর মাত্র আধাঘণ্টা সময় বাকী। উপায় নেই। শাহবাগ আসতে না আসতেই হোলি খেলা খেলতে ব্যস্ত নারীপুরুষ। অবাধে। রঙমিশিয়ে। সিএনজি ড্রাইভার যেতে পারলো না। রাস্তা বন্ধ।

আব্দুল কুদ্দুস সাহবে উদ্বিগ্ন। কী করা এখন। বিষণ্ণ হয়ে আছে সানজিদা। তার ইচ্ছে হচ্ছে লাফ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসাবে পৌঁছে যেতে। কিন্তু কী করবে এখন! ভেবে কুল পাচ্ছেনা। বসে আছে সিএনজির ভেতরে। অন্যদিকে ঘুরিয়ে যাবে ভাবছে, এমতাবস্থায় কয়েকটা যুবক ছেলে দৌড় দিয়ে সিএনজির সামনে এসে হাত ভেতরে ঢুকিয়ে সানজিদার গালে, বুকে রঙ লাগিয়ে দিলো। রঙ বেরঙের রঙ। সারাটা মুখ, সম্পূর্ণ জামা নষ্ট হয়ে যায়। দূতাবাসের পরীক্ষার সময় আর মাত্র আধাঘণ্টা বাকী। জামা পাল্টাবে, মুখ ধুবে, না সিএনজি অন্যদিকে ঘুরিয়ে যাবে? এখানে যেকোন একটা করলেই আধাঘণ্টা লেগে যাবে। সিএনজি ঘুরিয়ে নিয়ে গেলেও হবেনা। ঠিকমতো পৌঁছতে পারবে, কিন্তু জামা পাল্টাবে আর মুখ ধুইবে কী করে? জামা পালটানো আর মুখ ধুয়া ছাড়া তো এরকম রঙমাখা অবস্থায় কখনো দূতাবাসের ভেতেরে ঢুকতে দিবেনা। তাদের একটা পরিবেশ আছে। আপনি একজনের জন্য কখনো তার পরিবেশ বিনষ্ট করতে দিবেনা।

সুতরাং অবাধে এই হোলি খেলার বলি হয়ে সানজিদা আর এক্সাম দিতে পারলো না। তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া হলো না। মায়ের আবদারটা পূরণ করা হলো না। জন্মদাতা পিতাকে খোঁজে বের করা হলো না। জীবিত আছেন, না মারা গেছেন! সেটাও সানজিদার জানা হলো না। এভাবে হোলি উৎসবের দিন কত মানুষের যে এই রঙমাখামাখির ফাঁদে পড়ে চাকরী যায়, টাইমিং মিস্টেকের কারণে হসপিটালে কত মানুষ মারা যান, কতধরণের ক্ষয়-ক্ষতি হয়, হিসেব নেই। তবে এখন থেকে হিসেব কষতে হবে আমাদের। শুরু করতে হবে এক্ষুণি।

Comment

Share.

Leave A Reply