শ্রীলঙ্কাকে রাখাইন বানানো হচ্ছে যেভাবে

0

 

কথাসাহিত্যিক আর্থার মিলার তার একটি বইয়ে লিখেছিলেন, ‘ওরা এত বেশি ঘৃণা করতে পারে যে, পৃথিবীটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে।’

যখন এ কথাগুলো লিখছি, তখন কান্ডি জ্বলছে। বৌদ্ধধর্মের নামে মুসলমানদের, তাদের বাড়িঘর ও সহায় সম্পদকে টার্গেট করা হয়েছে। এসব করা হয়েছে (বৌদ্ধদের) দন্ত মন্দিরের কাছেই।

ওই মন্দিরে সংরক্ষিত, স্মারক দন্তের হেফাজতকারী শীর্ষস্থানীয় ভিক্ষুরা মালওয়াত্তে ও আসগিরিয়া এলাকার প্রধান পুরোহিত। তারা যদি জানালা দিয়ে তাকাতেন, তাহলে সহিংসতার অন্তত ধোঁয়া তাদের চোখে পড়ত।

বৌদ্ধধর্মের নামে হত্যাকাণ্ডের চেয়ে আর কোনো কিছু এ ধর্মের বড় বিকৃতি হতে পারে না। বুদ্ধের শিক্ষায় কোনো প্রকার সহিংসতার স্থান নেই; এমনকি ‘পবিত্র’ যুদ্ধেরও কোনো উল্লেখ নেই।

কোনো অপরাধের প্রতিশোধ নেয়ার অনুমতি নেই বৌদ্ধধর্মে। উল্লিখিত ভিক্ষুরা যদি বুদ্ধদেবের সত্যিকার অনুসারী হতেন, তারা হেঁটে দাঙ্গাবাজদের মাঝে চলে যেতেন এবং শান্তি রক্ষার আবেদন জানাতেন; কিন্তু কান্ডিতে কেবল সেসব ভিক্ষুকেই দেখা গেল এবং শুধু তাদের কথাই শোনা গেল, যারা সহিংসতার আগুন আরো উসকে দিলেন। ঊর্ধ্বতন সব ভিক্ষু রইলেন নীরব।

তাদের কেউ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নিন্দা জানালেন না; আবেদন জানাননি ন্যায়নীতিবোধ আর শান্তি ফিরিয়ে আনতে। যদি জ্বলন্ত কান্ডি শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্মের ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে তাকে, ওই ভিক্ষুদের নীরবতার ইঙ্গিত দেয়, কেন এই ব্যর্থতা। স্মর্তব্য, ১৯৮৩ সালেও প্রধান ভিক্ষু মুখ খোলেননি।

অতীতের সে ঘটনার স্মৃতি- তথা জুলাই মাসের কালো দিনের সেই ছবি- বাকি জীবন আমি বয়ে বেড়াব। ঘটনাটি ছিল- কিরুলাপোনে এলাকায় একজন তামিল নারীকে জনতা দোকান ভস্মীভূত করার দাউ দাউ আগুনে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। আর পুলিশ এটা দেখছিল কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে।

আজো মনে আছে, সে মহিলা হালকা দেহের, উচ্চতা মাঝারি, শাড়ি পরিহিতা, তার চুলের রঙ কী রকম ছিল, তা-ও ভুলিনি। তার চেহারাটা দেখতে পাইনি। একটি চলন্ত বাস থেকে দেখেছিলাম সে দৃশ্য।

আমি বাস থেকে লাফিয়ে নামলেও হয়তো মহিলাটিকে বাঁচাতে পারতাম না; কিন্তু এ ধরনের ‘যুক্তি’ সেই আতঙ্কের স্মৃতি আর আমার ব্যর্থতার বোঝা এতটুকুও কমাতে পারে না।

আজ আবার শ্রীলঙ্কায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এখন টার্গেট আরেকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। আমাদের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের নামে সহিংসতা ঘটানো হলেও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি দুর্বৃত্তদের থামাতে, আক্রান্তদের বাঁচাতে; এমনকি এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যথেষ্ট জোরালো কণ্ঠে নিন্দা জানাতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে আমরা ব্যর্থ।

তেলদিনিয়াতে যা শুরু হলো, কান্ডিতে যা ছড়িয়ে পড়েছে, এ সবকিছু ধর্মীয় সঙ্ঘাত নয়। সংঘর্ষ মানে, দু’পক্ষ পরস্পর মারামারি বা সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়।

কিন্তু তেলদিনিয়া ও কান্ডি, এর আগে আমপারাতে দেখা গেল- হামলাকারীরা সশস্ত্র আর আক্রান্তরা নিরস্ত্র। ৪ মার্চ তেলদিনিয়াতে সূচিত সহিংসতা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এই সহিংসতার উৎপত্তি ও বিস্তার হঠাৎ ঘটেনি।

২০ ফেব্রুয়ারি তেলদিনিয়াতে তিন চাকার একটি গাড়ির সাথে একটি ট্রাকের সামান্য সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে এটাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হামলা হলো। ছোট গাড়িটার চার যাত্রী মিলে ট্রাক ড্রাইভারের ওপর হামলা চালায়। যাত্রীরা ছিল মুসলিম আর ট্রাকের চালক সিংহলি বৌদ্ধ।

তবে এ ঘটনায় নৃতাত্ত্বিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ যুদ্ধ এবং দু’টি বিদ্রোহের পরিণামে সমাজে নিষ্ঠুরতার যে বিস্তৃতি, এ ঘটনা তার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ।

যা হোক, ওই ঘটনার পরপরই চালককে হাসপাতালে পাঠানো হলো। হামলাকারীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়। দুই সপ্তাহ পরেও তারা রিমান্ডে। পুলিশ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেনি এবং কোনো রাজনীতিক করেননি হস্তক্ষেপ।

দুই সপ্তাহ পরে ৩ মার্চ ট্রাকচালকের মৃত্যু হয় হাসপাতালের আইসিইউতে। কথা হলো, তেলদিনিয়ার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা যদি স্বতঃস্ফূর্তই হতো, এটা সেই চালকের ওপর হামলা কিংবা তার মৃত্যুর দিনে সঙ্ঘটিত হতো; কিন্তু দাঙ্গা শুরু হয় পরে।

৪ মার্চ সন্ধ্যায় ভিক্ষু গালাগোদা আত্তে জ্ঞানাসারা মৃত চালকের শেষকৃত্যের স্থান পরিদর্শন করেন। এর ঘণ্টা কয়েক পরই শুরু হলো হামলা। মুসলমানদের সম্পত্তি ধ্বংস করা হলো, দেয়া হলো পুড়িয়ে।

পুলিশ কিছু দাঙ্গাকারীকে গ্রেফতার করে। তবে সরকার তখনি অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করলে, কারফিউ জারি করা হলে এবং যদি দেখিয়ে দেয়া যেত- জনতার সহিংসতা সহ্য করা হবে না, হয়তো পরবর্তী ট্রাজেডি এড়ানো যেত; কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ফলে চরমপন্থী সিংহলি বৌদ্ধরা অবাধে নতুন করে ’৮৩ সালের ‘কালো জুলাই’ মাসের সে ঘটনার পুনরাবৃত্তির সুযোগ পেয়ে যায়।

৫ মার্চ সকালে বহু লোক থানা ঘেরাও করে দাঙ্গাবাজদের মুক্তির দাবি জানায়। ভিক্ষু জ্ঞানাসারা সেখানে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’র নামে হাজির হয়ে মূলত উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে বাঁচিয়েছেন।

অপরাহ্নে দ্বিতীয় দফা দাঙ্গা শুরু হয়। বাত্তিকালোয়ার বিতর্কিত একজন ঊর্ধ্বতন ভিক্ষু জনতাকে প্রতিশ্রুতি দেন, এক ঘণ্টার মধ্যেই ‘আমাদের লোকজন’কে মুক্ত করে আনব।

এতে বোঝা যায়, এসব গেরুয়াবসনধারী অপরাধী কতটা ক্ষমতা ও দায়মুক্তি ভোগ করছে। দায়মুক্তির অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন কায়েমের জন্য সরকার বারবার ওয়াদা করা সত্ত্বেও এটা ঘটছে।

এটা সত্য, সিংহলিদের অধিকাংশ ১৯৮৩ কিংবা ২০১৭-এর সহিংসতায় জড়িত নয়। আসলে তাদের জড়িত হতে হয়নি। তাদের যা করণীয় ছিল, তা হলো- কাঁধ ঝাঁকিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলা আর চোখ বুঁজে থাকা। উদাসীনতাকে নিরপেক্ষতা কিংবা ভদ্রতা, কোনোটাই বলা যায় না। উদাসীনতা হত্যা ও ধ্বংস ডেকে আনে।

১৯৮৩ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের নীরবতার সাথে সরকারের পক্ষপাত এবং পুলিশ ও মিলিটারির যোগসাজশ এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল যে, অল্প কিছু চরমপন্থীই সারা দেশে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিল।

এ হেন সামষ্টিক উদাসীনতাকে মদদ দিয়েছিল কিংবদন্তি এবং ভুয়া সংবাদ ও পরিসংখ্যান। তখন প্রচার করা হয়েছিল, তামিলরা আমাদের ভার্সিটিগুলোতে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করছে, আমাদের চাকরি বাকরি দখল করে নিচ্ছে, খরগোশের মতো বংশ বিস্তার ঘটিয়ে ওরা দেশটাকে দখল করে নেবে।

আজ একই ধরনের মিথ্যাচার চলছে মুসলমানদের ব্যাপারে। ‘বিবিএস’ সংগঠন এই উন্মত্ততা শুরু করে ২০১২ সালে, যার মদদ জোগায় রাজাপাকসের লোকজন। তারা স্পর্শকাতর ও রঙচঙ দেয়া গল্প ছড়িয়ে মুসলমানদের তুলে ধরে শত্রু হিসেবে। এই পটভূমি ছাড়া এবারে সহিংসতা ঘটত না।

একটি ছুতা ধরে আমপারাতে দাঙ্গা বাধানো হয়। মুসলিম মালিকের রেস্তোরাঁ থেকে এক ব্যক্তি খাবার কেনার পর এতে নাকি বন্ধ্যকরণ বড়ি পেয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের সাথে সাথেই এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়া উচিত ছিল। তারা বক্তব্য দিয়েছেন এক সপ্তাহ পরে। তত দিনে বহু লোক সে গুজবে বিশ্বাস করে ফেলেছে।

যদি শ্রীলঙ্কার পুলিশ ঢিলেমি দিয়ে থাকে এবং সরকার পরিচয় দেয় অদক্ষতার, তাহলে একই সাথে বলতে হয়- সমাজটাও এর চেয়ে ভালো কিছু নয়। তাই মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে বন্ধ্যকরণ পিলের ব্যাপারে।

অথচ বেশির ভাগ ডাক্তার বসে রইলেন মুখে কুলুপ এঁটে। কয়েকজন সাহসী ব্যক্তি অবশ্য মুখ খুলেছেন। অপর দিকে, চিকিৎসাসংক্রান্ত সংগঠনগুলোর নীরবতা মদদ দিয়েছে বিভ্রান্তিকে। এসবই বিপজ্জনক প্রবণতা।

কেননা, এ অবস্থায় চরমপন্থীদের বক্তব্যই গৃহীত হয় এবং তারাই ‘উদ্যোগ’ নেয়। গেরুয়াবসনের শক্তিতে পুষ্ট হয়ে চরমপন্থী নেতারা যখন কার্যত দায়মুক্তি উপভোগ করে, তখন বিপদ ওঠে চরমে। অথচ এমন সব পুরনো প্রবণতা ও আচরণ এতদিনে বিদায় নেয়ার কথা।

গেরুয়াবসনের দুর্বৃত্তদের দায়মুক্তির অবসান এবং সব ধরনের উগ্রপন্থার প্রতি জিরো টলারেন্সই সিরিসেনা-বিক্রমাসিংহে সরকার থেকে আশা করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার বর্ণবাদী না হওয়া তাদের একটি কৃতিত্ব।

তবে বিশেষত গত দুই বছর সরকার রাজনৈতিক ও নৈতিক সাহস দেখাতে না পেরে হতাশ করেছে। সব ধরনের চরমপন্থার বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে সরকার ভিক্ষুসহ ধর্মীয় নেতাদের কাছে নতিস্বীকার করেছে।

এই সরকার উগ্রপন্থী বানায়নি; তবে তাদের তোষামোদ করেছে এই আশায় যে, এতে উগ্রপন্থার ধার কমবে। বাস্তবে ওদের দাঁতগুলো অনেক বেশি ধারালো হয়ে উঠেছে। সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং ভীরুতা উগ্রপন্থাকে দুর্বল করতে পারেনি।

মুসলমানেরা এই সরকারকে দলে দলে ভোট দিয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশায়। সরকার এতে ব্যর্থ হয়েছে। মুসলমানেরা এখন কাকে বিশ্বাস করতে পারে?দাঙ্গার আগুন নিভলেও তারা কি কখনো নিজেদের নিরাপদ ভাববে? কিভাবে তা সম্ভব?নিজেদের নিরাপদ মনে করা কি তাদের উচিত?

: এরাবিয়ান জার্নাল

Comment

Share.

Leave A Reply