আলেম রাজনীতিকদের প্রতি খোলা চিঠি

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ!

ক্ষমতা ও নির্বাচন থেকে দীর্ঘসময় আপনারা দূরে থাকার কারণে এদেশের রাজনীতিতে ও রাষ্ট্রক্ষমতায় সৎ, নীতিবান, ধার্মিক, দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল নেতার অভাব প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সর্বব্যাপী দুর্নীতি, গুম-খুন ও ফ্যাসিবাদ সীমাহীন হয়ে পড়েছে। অতিষ্ঠ জনগণ এখন বিকল্প চায়।

আপনারা ভারতের দেওবন্দের অনুসারী। কিন্তু ভারতের রাজনীতিতে দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের প্রভাব ও কর্মপদ্ধতি যে পর্যায়ে আছে, এদেশের রাজনীতিতে আপনারা তার কতটুকু অনুসরণ করেন, জানি না।

বর্তমান সময়ের জীবিত উল্লেখযোগ্য একজন দেওবন্দি আলেমের নাম বলি, মাওলানা মাহমুদ মাদানী। তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের জেনারেল সেক্রেটারী। তিনি ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা ছিল উত্তর প্রদেশ, যেখানে দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসা অবস্থিত। গুগলে সার্চ দিলেই ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে সেদেশের মুসলমানদের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা জানা যায়। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের জন্যও অনুসরণযোগ্য।

রাজনীতি করছেন, অথচ আপনাদের হাতে ক্ষমতা নেই। কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় আপনাদের উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব নেই! সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানো এবং ইসলাম ও মজলুমদের পক্ষে কথা বলার গুরুত্ব অপরিসীম। যেমনটা ভারতের মাওলানা মাহমুদ মাদানী’র ভূমিকায় আমরা দেখতে পাই। এছাড়া ভারতে মুসলমানদের পক্ষে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজনৈতিক ভূমিকা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমনকি রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্বে গণবিচ্ছিন্ন পতিত সেক্যুলার বামদের তুলনায় আপনাদের ক্ষমতাধিকার ও অবস্থান নিতান্তই হতাশাজনক!! তাহলে কীভাবে পারবেন সমাজ ও দেশটাকে ইসলামী মূল্যবোধে রূপান্তরিত করতে?

ক্ষমতা না পেলে আপনারা কীভাবে আপনাদের ভিশন বা রূপরেখা সমাজে বাস্তবায়ন করবেন?

তবে শুধুমাত্র ক্ষমতাই আপনাদের মূল টার্গেট হতে হবে, তা বলছি না। বরং আপনাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই দরকার ক্ষমতা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে জোরালো ভূমিকা। আপনারা এখলাস নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একযোগে লড়াইয়ে নামলে সেই ক্ষমতা আল্লাহই আপনাদের হাতে দিবেন। তিনিই তো সকল ক্ষমতার উৎস, মালিক ও দাতা।

আপনারা নির্বাচনে না এসে বহু আগ থেকেই ক্ষমতার ময়দান ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে জনগণের শত্রুরা জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতদিন আপনাদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো করে রাজনীতি করার ফলে ক্ষতিটা হয়েছে রাজনীতিরই। ফলে রাজনীতি ও ক্ষমতা দখল হয়ে গেছে অযোগ্য, সন্ত্রাসী, নীতিহীন, দুর্নীতিবাজ, প্রতারক ও লুটেরা শ্রেণীর হাতে। রাজনীতিতে আজ এমনকি ভালো ও মন্দের ন্যূনতম প্রতিযোগিতাটুকুও নেই।

আপনাদের দুর্ভাগ্যজনক অনুপস্থিতির সুযোগে আজকে যেসব লোকের হাতে ক্ষমতা চলে গেছে, তারাই কিন্তু মদ ও বারের লাইসেন্স দিচ্ছে, মিলাদ পড়িয়ে সিনেমা হলের উদ্বোধন করছে, ভিনদেশি সংস্কৃতির আমদানি করে আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় চূড়ান্ত করেছে। দলবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের গডফাদার তো তারাই। তাদের কোল থেকেই একের পর এক ধর্ষক, খুনি ও সন্ত্রাসীর জন্ম হচ্ছে আজ। দেশের বেশিরভাগ অপকর্মের সাথে কোনো-না-কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতাবান লোকদের সম্পর্ক থাকছেই।

আর যারা মডারেট ইসলামিজম নীতিগতভাবে সমর্থন করেন না, তাদের কাছে গণতন্ত্র হারাম। কিন্তু হারামতন্ত্রের বিকল্প হালালতন্ত্রের বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের ব্যাপকভিত্তিক কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এটা সত্য যে, পাশ্চাত্য থেকে গণতন্ত্র আমদানিকৃত। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাও ব্রিটিশ সংদীয় মডেলের অনুরূপ।

কিন্তু যারা হারামতন্ত্রের বিরুদ্ধে, তাদেরকে অবশ্যই এর বিকল্প হালালতন্ত্র সম্পর্কে জনমত গঠন করতে হবে। কুফরি হারামতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামের হালাল রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রতাত্ত্বিক প্রস্তাবনাগুলো জনগণের সামনে পেশ করা জরুরি। জনগণকে বাদ দিয়ে হালাল-হারাম কোনো তন্ত্রই বাস্তবায়িত করা সম্ভব না। হারামতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং হালালতন্ত্রের পক্ষে জনমত গঠন ও জনগণকে সংগঠিত করতে না পারলে তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ বাঁও জলে পতিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই।

তবে যতদিন প্রচলিত রাজনৈতিক সিস্টেম বজায় থাকছে, ততদিন লুটপাটকারী ও অযোগ্যদের হাতে রাজনীতির ময়দান একেবারেই ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তবে মোটেও দলবিশেষের লেজুড়বৃত্তি নয়, বরং রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ময়দান এবং সামাজিক নেতৃত্বে শিরদাঁড়া সোজা করে বলিষ্ঠভাবে আলেমসমাজের স্বতন্ত্র অবস্থান ও প্রভাব সুদৃঢ় করাই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সময়ের চাহিদা ও জনপ্রত্যাশা পূরণে আপনাদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

সুতরাং, সমমনা ডানপন্থী শক্তিসমূহের সাথে আপনারা আলোচনায় বসুন। তৌহিদি জনতা ও নির্বিশেষ মজলুমদের স্বার্থের পক্ষে নেগোশিয়েশন করুন। অন্যপক্ষ তাদের নিজেদের কায়েমী স্বার্থচিন্তা বাদ দিয়ে আপনাদের পক্ষে কাজ করার কথা নয়। তাই, আপনাদের দাবি ও রূপরেখা আপনাদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে। সেজন্যই দরকার ক্ষমতা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রয়োজনীয় অংশীদারিত্ব।

তাছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে জনকল্যাণ ও উন্নয়নবিষয়ক কী কী কাজ আপনারা করবেন এবং কীভাবে কাজ করবেন, সেসব বিষয়ে আপনারা জাতীয়ভাবে বিস্তারিত রূপরেখা বা ভিশন উপস্থাপন করুন। আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের জন্য গণকর্মসূচী নির্ধারণ করুন। সর্বাগ্রে আপনাদের পলিটিক্যাল ভিশন সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার করতে হবে। তারা আশ্বস্ত হলে আপনাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য আসবে, ইনশাআল্লাহ।

তবে সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনারা যেন ঐক্যবদ্ধ থাকেন এবং আপনাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়, বোঝাপড়া, জবাবদেহিতা, দায়িত্ব সচেতনতা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক ভিত্তি যেন মজবুত হয়। সবশেষে জনগণ অবশ্যই আপনাদের স্বাগত জানাবে। আপনারা কামিয়াব হোন, এই কামনায় শেষ করছি।

আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী-

তারেকুল ইসলাম

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় ইংরেজি পত্রপত্রিকার কলামিস্ট।

Comment

Share.

Leave A Reply