রাজাকার : একটি শব্দ সন্ত্রাসের নাম

0

সৈয়দ শামছুল হুদা ::

পাকিস্তান ভীতি একটি পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যে দেশটি দ্বারা আমরা বেষ্টিত তার অপকর্মগুলো আড়াল করা। এখন আর কারো পক্ষে পাকিস্তানের রাজাকার হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিবেশি দেশটির রাজাকার এখন অনেকেই। ১২শ মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তানের সাথে কোনদিন বাংলাদেশের মিশে যাওয়ার আর সুযোগ নেই। যারা কথায় কথায় দেশকে পাকিস্তান বানানোর তসবীহ জপে, তারাই মুলত: দেশকে ভারতীয় বানাতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। তাদেরকেই ইদানিং দেখা যায় সেজে গুজে দলবেধে প্রভুদের সাথে সাক্ষাত আর আশীর্বাদ লাভে ধর্ণা দিতে দেখা যায়।

সর্বশেষ ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। সেখানে এমন ধারা নাকি সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র কিনার আগে ভারতীয় প্রভুদের অনুমতি নিতে হবে। আমাদেরকে যারা প্রতিনিয় ঠকাচ্ছে, আমাদের স্বাধীন রাজনীতির অধিকার যারা কেড়ে নিয়েছে তারাই আমাদের বন্ধু। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবিরা কথা বলেন না। এদেশে সত্যিকার দেশপ্রেমিক একজনই বুদ্ধিজীবি ছিলেন, তিনি হলেন আহমদ ছফা। তিনি এসব শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, লিখতেন। তাঁর লেখাগুলো পড়লে এখনো সাহস পাই। প্রেরণা পায়। আজকে যারা গোটা ছাত্র সমাজকে বমিতে ভাসিয়ে দিতে চায়, তারা কোনদিন অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয় না।

আমাদের চিন্তার জগতটা খুব সীমিত। আমাদের ভাবনাগুলো খুব গন্ডীবদ্ধ। দেশ ও স্বাধীনতা আজ কোন কোন ক্ষেত্রে অরক্ষিত তা বলার জন্য মেজর জলিলরা এখন জীবিত নেই। তিনি যখন বলতেন, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, তখন আমরা সেটার গুরুত্ব উপলব্দি করিনি। এখনো করছি না। আসলে আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা কী হেরে যাচ্ছি? আমাদের রাজনৈতিক অধিকার আজ নেই। সাংস্কৃতিক অধিকার নেই। ইসলামের বাহ্যিকরূপটা এখনো দেখা যায়, ভেতরটা শুন্য। কোটি কোটি মানুষ ইসলামের প্রতি দরদ অনুভব করলেও জানে না, ইসলাম কি জিনিস।

বাংলাদেশের অনেক মুসলমান ইসলামের চরম শত্রু। তারা ভেতরে ভেতরে বদলে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। এদেশের যে সকল রাজণৈতিক গুরুরা ভারতের তৎকালীণ কংগ্রেসের জুলুম, বৈষম্য সহ্য করতে না পেরে ৪৭সালে ইসলামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দেশ বিভাজনের মতো কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিল, আজকে আমরা তাদেরকে বোকা মনে করছি। তারা যদি সেদিন দেশটাকে পাকিস্তানের সাথে ভাগ না করতো, তাহলে দেশটা কি কোনদিন ভাগ হতো? পেরেছে কি কাশ্মীর স্বাধীন হতে? পেরেছি কি হায়দারাবাদ স্বাধীন থাকতে?

এখন সময় এসেছে শব্দ সন্ত্রাসের মোকাবেলা করার। রাজাকার একটি শব্দ সন্ত্রাস। এখন আর কেউ পাকিস্তানী রাজাকার নেই। যারা আছে তারা ইসলাম প্রেমিক। ইসলামপ্রেমকেই রাজাকারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটা খুব পরিস্কার কথা। মানুষ যেন ইসলাম পালন থেকে দূরে থাকে, আগামী প্রজন্ম যেন ইসলামকে ভালো না বাসে, ইসলাম অনুশীলনে যেন তারা যেন কোন প্রকার উৎসাহি না হয় তার জন্যই রাজাকারি গল্প। কেউ যেন ইসলামী সাহিত্য না পড়ে, কুরআন ও সুন্নাহর চর্চা না করে তার জন্যই এসব শব্দ সন্ত্রাস প্রয়োগ করা হয়।

কেন আমি শব্দ সন্ত্রাস বললাম, তাও একটু খুলে বলি। কোটা বিরোধী আন্দোলনে দেশের কত পার্সেন্ট ছাত্র/ছাত্রী অংশ নিয়েছিল? এদের সংখ্যা কত? আপনি ভালো করেই জানেন। এদের সংখ্যা লাখে লাখে। আর এদেরকে রাজাকার বলছে কজন? অল্প কয়েকজন। তাদের মধ্যে মতিয়া আর জাফর ইকবালের নাম নেওয়া যায়। একটি সমাজে সন্ত্রাসী কতজন থাকে? অল্প কজনই। কিন্তু এরা গোটা সমাজকে গ্রাস করে রাখে। তেমনি আজ যাদেরকে রাজাকার হিসেবে গালি দেওয়া হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে তারাই দেশপ্রেমিক। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একটি ছেলেরও জন্ম পাকিস্তান আমলে নয়। পাকিস্তানের স্বেচ্চাসেবি হিসেবে কাজ করার তো প্রশ্নই আসে না। তারপরও কেন তাদেরকে রাজাকার বলা হয়? কারণ এটা একটি সন্ত্রাসী ভাষা। সন্ত্রাসী পরিভাষা।প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম একটি ত্রাসসৃষ্টিকারী শব্দ বানানো হয়েছে এটাকে।

পাকিস্তান নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের এখন আর কোন প্রকার মাথা ব্যাথা নেই। আর দশটি মুসলিম দেশের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ যেমন ভালোবাসা দেখানো হয়, পাকিস্তানের প্রতি তাই। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু ভারতভীতি আমাদের মধ্যে প্রবল। ভারতে উগ্রপন্থী বিজিপি ক্ষমতায় আসার পর ‍মুসলমানদের ওপর যেভাবে জুলুম-নির্যাতন নতুন মাত্রা পেয়েছে, তার দ্বারা আবারও সুপ্রমাণিত হচ্ছে, আমরা ৪৭সালে দেশটাকে ওদের থেকে ভিন্ন করে কতটাই না নিরাপত্তা লাভ করেছি। আজ ভারতে যে সব কর্মকান্ড বিজিপি করছে, তা ভারতকে আবারও খন্ড-বিখন্ড করে দিতে পারে। প্রকাশ্যে নামায পড়া যাবে না, গরু জবাই করা যাবে না। ৩তালাক চলবে না। আরও কত কিছু।

বাংলাদেশের মানুষ এসব আজাব থেকে দীর্ঘদিন যাবত নিরাপদে আছে বলে স্বাধীনতার সুখটা অনুভব করছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানেরও প্রতিষ্ঠাতা। কেন বঙ্গবন্ধু লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের কর্মী হয়েছিলেন, তার বিবরণ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পরিস্কার। তৎকালীণ হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে মুসলমানরা কতটা ক্ষিপ্ত ছিল, তা বঙ্গবন্ধুর জবানীতেই পাঠ করলে আপনি ভালো ভাবে উপলব্দি করতে পারবেন।

আসুন, মিথ্যার পেছনে না ছুটে সত্যের পথে লড়াইটা করি। শত্রু যখন চিহ্নিত না হয়, তখনই কামড়াকামড়ি শুরু হয়। আমাদের মধ্যে কামড়াকামড়ির একটা স্বভাব চলে এসেছে। এটা বিপদের কারণ। শঙ্কারও কারণ। আসুন, একটু সচেতন হই। দেশের সামগ্রীক নিরাপত্তা নিয়ে ভাবি। আমাদের আগামী রাজনীতি নিয়ে একটু চিন্তা করি। সীমান্তটা একবার দুর্বল হয়ে গেলে এটাকে সবল করার মতো শক্তি আমাদের নেই। নেই আমাদের ভালো কোন প্রতিবেশিও। ভারত এবং মায়ানমার এই দুই প্রতিবেশিই আমাদের উপর জুলুম করছে।

আমরা এখনো দুর্বল হয়ে যায়নি। এখনো প্রতিরোধের শক্তি আমাদের আছে। জেগে উঠার এখনো সময় আছে। শেষ হয়ে যায়নি। ষোল কোটি মানুষের বত্রিশকোটি হাত এতটা দুর্বল নয়। তবে কেউ কেউ আমাদের শ্নায়ু দুর্বল করতে চাচ্ছে। মনস্তাত্বিকভাবে পরাজিত করতে চাচ্ছে। আমাদের স্নায়ু পরীক্ষা করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু নিয়েছে। আজকের বুদ্ধিজীবিরা অনেকেই বাংলাদেশের প্রেমিক নয়। আজকের অধিকাংশ মিডিয়া আমাদের নয়। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা বড় ধরণের বিপদ ঘটে যেতে পারে।

লেখক: সম্পাদক, নূরবিডি ডটকম

Comment

Share.

Leave A Reply