কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারাই টিকে থাকবে

0

সৈয়দ শামছুল হুদা ::

পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে কোনকিছুই নির্দিষ্ট রূপরেখার ওপর অঠল এবং বহাল থাকতে পারে না। সময় এবং বাস্তবতার কারণে কৌশলগত নানা পরিবর্তন গ্রহন করতে হয়। সাম্প্রতিক দুটি নির্বাচন এ বাস্তবতা আরো বেশি জোড়ালো করেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তি দেশ মালয়েশিয়ায় মাহাথির মুহাম্মদ যে খেলা দেখিয়েছেন তা এক কথায় অকল্পনীয়। তিনি আজন্ম শত্রুর সাথে গলাগলি করেছেন। ধরেছেন মিত্রের সাথে পাঞ্জা। বিজয়ী হয়েছেন। টিকে আছেন। অপরদিকে তুরস্কের নির্বাচনে এমন একজন ব্যক্তি নিবাচিত হয়েছেন যাকে সারা দুনিয়া যাকে ‍মুসলিম নেতা, ইসলামী নেতা বলে আখ্যায়িত করছে। অথচ তিনি নিজে এসব কিছুই বলছেন না। বলছেন না, কারণ তিনি জানেন, সামান্য একটি কবিতা পাঠের জন্য তাকে কোথায় যেতে হয়েছিল।

বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যত খুব উজ্জল। কিন্তু কিছু কৌশল তাকে নিতে হবে। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে যে ধাচে শিক্ষা দেওয়া হয়, যে পরিবেশে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা যথার্থ। ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরীতে এ পদ্ধতিই টেকসই। কওমী মাদ্রাসাগুলো যদি বর্তমান শিক্ষাধারা ধরে রাখার পাশাপাশি কিছু কৌশলী পদ্ধতি গ্রহন করতে পারে, তাহলে এর সামনে অন্য কোন শিক্ষা ব্যবস্থা টিকতে পারবে না। এজন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহন খুবই জরুরী।

প্রথমত: অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার কাজে-কর্মে শৃংখলা ধরে রাখা। যমানার স্রোতে হাল ছেড়ে না দেওয়া। ছাত্রদের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালা, শিক্ষকদের জন্য অনুসৃত নীতিমালা, প্রতিষ্ঠানের জন্য গৃহিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কোন শৃংখলাবদ্ধ জাতি পরাজিত হয় না। বিশৃংখল জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।

দ্বিতীয়ত: সকল কওমী মাদ্রাসার মধ্যে শিক্ষার সমন্বয় গড়ে তোলা। একেক মাদ্রাসায় একেক রকম শিক্ষা, এটা ক্ষতিকর। যেনতেন প্রকারে আলেম বানানোর মানসিকতা পরিহার করা। ১৬-১৭বয়সের ছেলেরা আজকাল দাওরায়ে হাদীস পাশ করে ফেলছে। এটা একটি শিক্ষাধারার জন্য আত্মঘাতি। উচ্চতর ইলম ধারণ করার জন্য যে পরিমান বয়স হওয়া দরকার, তার আগেই অনেক ছাত্র সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে ফেলছে। এর কারণ সমন্বয়হীনতা। দরসের শ্রেণিবিন্যাস, ধারাবাহিকতা, পাশপদ্ধতি কঠোরভাবে অনুরসণ না করার কারণে এসব হচ্ছে।

তৃতীয়ত: সকল কওমী মাদ্রাসার মধ্যে কেন্দ্রীয় কমান্ড তৈরী করা। একককেন্দ্রের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তাহলে কেউ চাইলেই কওমী মাদ্রাসার ক্ষতি করতে পারবে না। ইচ্ছে করলেই কেউ কওমী মাদ্রাসা বন্ধ করে দিতে পারবে না। এটা না হলে যে কোন সময় কওমী মাদ্রাসায় শকুনের শ্যনদৃষ্টি পড়তে পারে। কাউকে ধোকায় ফেলে দিতে পারে। সকল কওমী মাদ্রাসার চিন্তা-চেতনা এক ও অভিন্ন। শুধু খামখেয়ালী, আর আত্মগরিমার কারণে মাঝে মাঝেই বিরোধ জেগে উঠে।

চতুর্থত : সকল কওমী মাদ্রাসায় নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা। প্রতিটি স্তরে জীবনমুখি শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ নতুন করে সাজিয়ে সিলেবাসে ধাপে ধাপে অন্তর্ভূক্ত করা। শিক্ষার আধুনিক উপরকণ, কৌশল কওমী মাদ্রাসার পাঠ পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাইপুর্বক প্রয়োগ করা। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইহ ও পরকালের আদর্শ, নীতি, চরিত্র সমন্বয় করা। ক্ষমতা, কর্তৃৃত্ব, নেতৃত্ব কোন কিছুকেই অবহেলা না করা। রাষ্ট্র পরিচালনার মনমানস ছাত্র জীবন থেকেই তৈরী করে দেওয়া। স্বীকৃতির পেছনে না দৌড়িয়ে শিক্ষার গতিকে অব্যহত রাখা।

পঞ্চমত: কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আর্ন্তজাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেও সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহন করা। শুধুমাত্র দারুল উলূম দেওবন্দেই সীমিত না থাকা। দেওবন্দকেই একমাত্র শেষ ঠিকানা না বানানো। দেওবন্দ অবশ্যই আমাদের অন্যতম আদর্শ। এটাকে ধারণ করার পাশাপাশি আরব বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি, কৌশল,গবেষণা ইত্যাদি অনুসরণ করা। কওমী ধারার বাইরেও উচ্চতর ইলম আছে, সেটাকেও হজম করার উদার মানসিকতা লালন করা।

আজকের বিশ্বে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে, যারা কৌশল অবলম্বন করছে। কওমী মাদ্রাসার শত্রু অনেক। এদের মোকাবেলা করতে হলে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক সকলকে আরো বেশি উদার ও চৌকস হতে হবে। এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নোংরামি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল থাকতে হবে। যে সকল বিষয় একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজন সেসব বিষয় সিলেবাসে পর্যায়ক্রমে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।

আমি রাজনৈতিক উদাহরণ দিয়ে শুরু করেছিলাম। রাজনৈতিক চিন্তা দিয়েই শেষ করতে চাই। কওমী মাদ্রাসাগুলো যদি সমকালীন রাজনৈতিক মারপ্যাচ না বুঝে তাহলে বেশি ক্ষতি হবে এ শিক্ষাধারারই। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল রাজনৈতিক চিন্তা থেকে। শুধু ঈমান-আমলই হেফাজত নয়, রাষ্ট্রকে শকুনদের শ্যানদৃষ্টি থেকে হেফাজতের দায়িত্বও কওমী শিক্ষার্থীদের।

উপরোক্ত বিষয়সমূহ কওমী মাদ্রাসাসমূহে যথাযথ বাস্তবায়ন হলে কওমী মাদ্রাসার আদর্শ শিক্ষার পরিবেশের কারণে এ শিক্ষাধারাই টিকে থাকবে। অন্যগুলো জ্ঞানশুন্য হয়ে যাবে। শুধু কাগজের সনদই থাকবে।

Comment

Share.

Leave A Reply