রাজনীতির সব বিষয়ে আলেমদের সম্পৃক্ত থাকা উচিৎ

0

সৈয়দ শামছুল হুদা ::

দেশে একের পর এক ঘটনার জন্ম হচ্ছে। এক ঘটনাকে চাপা দিতে নতুন ঘটনা তৈরী করা হচ্ছে। সবকিছুর পেছনে আছেন কোন বিশেষ গোষ্ঠী, যারা এদেশকে অস্থিতিশীল দেখতে চায়। যারা নতুন ঘটনা তৈরী করে পুরাতন ঘটনাকে হালাল করে দিতে চায়। এমনি অবস্থায় কিছু প্রশ্ন বারবার দেখা দেয়। সেটা হলো- প্রতিটি ঘটনার শেষে এদেশের ইসলামপন্থীদের টেনে আনা হয়। বিশেষ করে কওমী আলেমদের নিয়ে একটি উপসংহার টানা হয়।

প্রথমে বলা হয়, এদেশে ইসলামপন্থীরা আজ কোথায়?
তারা নিরব কেন? তারা কেন জনসম্পৃক্ত বিষয়ে কথা বলে না?
আবার কিছু লোক আছে, একটু আগ বাড়িয়ে বলেন- এদেশের আলেম সমাজ আজ কথা বলেন না কেন? কওমী আলেমদের দিকে ইঙ্গিত করে, দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের সাথীদের দিকে ইঙ্গিত করে নানা কটুক্তি করেন। যারা করেন, তারা কোন না কোন ভাবে রাজনৈতিক তৎপরতার সাথে জড়িত। কেউ অনলাইনে, কেউ অফ লাইনে। বিভিন্ন জায়গায় আকারে ইঙ্গিতে আলেমদের দিকে ইশারা করা হয়। ইঙ্গিত করে আঙ্গুল তোলা হয়।

এরফলে আলেমদের মধ্যে একটি অংশের মধ্যে নানা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কেউ এটা দেখে বলেন, হ্যাঁ, ঠিকইতো, আসলে আমরা কি করছি? আমরা কেন দরস ও তাদরীস নিয়ে পড়ে আছি। মানুষ সমালোচনা করছে, এ অবস্থায় কি ঘরে বসে থাকা উচিত? আবার কেউ মনে করেন, এসব বিষয়ে আমাদের নাক গলানোর কি প্রয়োজন?

এসব বিষয় দেখে একটি জিনিস আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেটা হলো- এদেশের কিছু মানুষ আলেম সমাজকেও নেতৃত্বের আসনে দেখতে চায়। আলেম সমাজ সামনে থেকে কিছু করুক এটা চায়। এটা একটি পজিটিভ ভাবনা। কিন্তু আলেমদের বড় একটি অংশ শুধুমাত্র নিজেদের অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে চায়। জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব গ্রহনের জন্য এখনো তৈরী নয়। এটা বড় ধরণের রাজনৈতিক শুন্যতা। কিছু কিছু বিষয়ে যখন আলেমদের সক্রিয় দেখে, তখন সাধারণ মানুষ আশা করে, তারা সববিষয়েই কথা বলুক, সব বিষয়েই এগিয়ে আসুক।এটা আলেম সমাজের জন্য বিরাট অর্জন।

এই যে জনমানুষের চাওয়া, এটা আলেম সমাজ অর্জন করতে পেরেছে। এটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের মধ্যে নানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই সকল ক্ষেত্রে আলেম সমাজ যতটা সৎ ও সাহসের থাকে কাজ করবে, এটা অন্যরা করে না। ফলে তথাকথিত গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের প্রতি জনমানুষের আস্থা কমে এসেছে। এটা যদি আলেম সমাজ বুঝতে পারেন, তাহলে আমি মনে করি অনেক কল্যাণ।

আমি মনে করি, আলেম সমাজের সববিষয়েই কথা প্রয়োজন নেই। তবে কিছু বিষয় আছে, যে সকল ক্ষেত্রে অন্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না, দেশ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ এমন সব বিষয়ে আলেমদের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কথা বলা উচিত। কারণ জনগণ আলেমদেরকে সামনের কাতারে দেখতে চায়। সুতরাং সামনে থাকার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাচ বুঝতে হবে।

বর্তমানে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, সেটা হলো মানুষকে ক্ষুদ্র বিষয় দিয়ে মূল্যায়ন করা। যেমন এরদোয়ান বা মাহাথির মুহাম্মদ এরা দু’জন বিপুল ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজের দায়িত্বে ফিরে এসেছেন। এখন কেউ কেউ এটা তালাশ করছে, তাদের মুখে দাঁড়ি আছে কি না? গায়ে জুব্বা আছে কি না? কিন্তু এরচেয়েও জরুরী বিষয়, এরা উম্মাহর প্রতি দায়বদ্ধ কী না এটা দেখা। তাদের রাজনৈতিক আচরণ, তাদের রা্ষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহনে উম্মাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে কী না এসব বিষয় প্রায়শই ভেবে দেখা হয় না। ফলে উম্মাহর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলেম সমাজের একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত অংশ যারা রাজনীতি বিষয়ে দক্ষতা রাখেন, তাদের সব বিষয়েই কথা বলা দরকার। মতামত দেওয়া দরকার। বৃহত্তর আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করা দরকার বলে মনে করি। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে হলে, সেই সমাজের হাল-চাল বুঝতে হবে। তাদের চাওয়া-পাওয়া, চরিত্র বুঝতে হবে। এ জন্য সবার সাথে মিশতে হবে।

আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, সব আলেমেরই সববিষয়ে কথা বলার দরকার নাই। হ্যাঁ, যখন দেশে চূড়ান্ত কোন সংকট দেখা দিবে, তখন সবাইকেই কথা বলতে হবে। যেমনটা হেফাজত করেছিল। যখন কথা বলার আর কোন শক্তি ছিল না, তখন আলেম সমাজ সম্মিলিতভাবে কথা বলেছেন। তাদের সাথে জনগণও সমর্থন দিয়েছেন। তাদের ডাকে জনগণ সাড়া দিয়েছিলেন বলেই হেফাজত একটি সফল আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিল।

মনে রাখতে হবে, এমন আন্দোলন ইচ্ছে করলেই কেউ সবসময় গড়ে তুলতে পারবে না। এটা পরিবেশ-পরিস্থিতিই তৈরী করে দেয়। তবে জাতীয় ইস্যূতে আলেমদের একটি অংশের বিশেষভাবে উপস্থিতি সময়ের দাবী।আজকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথাই বলতে পারি, এর দ্বারা কওমী আলেমদের কোন উপকার নেই। কিন্তু কথা বলতে হবে। কেন? কারণ এখানে জুলুম করা হচ্ছে। এক পক্ষে আরেকটি পক্ষকে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে, ফ্যাসিবাদী স্টাইলে আক্রমন শাণিত করা হচ্ছে। এর পরোক্ষ প্রভাব হলো- যে কোন ন্যায্য আন্দোলনকে দমনের অবাধ লাইসেন্স পাওয়া। এটা চলতে দেওয়া যায় না। যেমন শাহবাগ আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেখানে এক পর্যায়ে এসে আলেমদের নেতৃত্বের হাল ধরতে হয়েছিল। এভাবেই একদিন পরীক্ষিত আলেম নেতাদের মাধ্যমে দেশে রাজনীতির সুষ্ঠুধারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তাই আলেমদের কথা বলা উচিত। এবং কথা বলার ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা অর্জন করা উচিত।

Comment

Share.

Leave A Reply