অপারেশন থিয়েটারে প্রিয়নবি সা.

0

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ ::

জাহেলিয়াতের নোংরা আঁধারে নিমজ্জিত সাড়ে পনেরোশ বছর পূর্বের মক্কা নগরী। অমানুষের আখড়া ছিল উত্তপ্ত মরুর সমগ্র আরব। তপ্ত মরুর কোথাও যেখানে তেষ্টা মেটানোর এক ফোঁটা পানি মিলতো না সেখানে রহমদিল মানব আশা করা ছিল নিতান্তই বোকামির পরিচয়। মানুষগুলোর ব্যবহার ছিল অসভ্যতার শেষ সীমায় উপনিত। কিন্তু আল্লাহ পাকের দয়া হল। হৃদয়ে মায়া জাগলো এদের জন্য। করুণার বারিবর্ষণ করলেন মরুর বুকে। মরুআরব নেচে উঠলো আনন্দের জোয়ারে। তপ্ত সাহারায় ফুটলো একটি ফুল। আজব ফুল। যিনি বিশ্বের জন্য নির্বাচিত হলেন রাসূল হিসেবে।
জন্ম নিলেন তৎকালীন আরবের সব’চে খানদানি বংশে। যে বংশের বাতি আলোকিত করলো পুরো দুনিয়া। সে বংশের নাম কুরাইশ। সম্মানিত। মর্যাদাশীল। অবনত মস্তকে সব বিচার মেনে নেয় আরবজাতি। এদের বিচারবুদ্ধিও ছিল জাতির জন্য মডেলস্বরূপ।
জন্মের আগেই হারালেন প্রিয় বাবাকে। জন্মের পর হারালেন মাকে। হৃদয় ভরে কাউকে ডাকতে পারেননি। চাচার কাছেই খুঁজে ফিরেছেন মায়ের আদর। বাবার আদর। দাদার সাথে কাটিয়েছেন অবুঝকাল।
বেড়ে উঠেছেন দুধমা হালিমা সা’দিয়ার হীমছায়ায়। শৈশবকাল সেখানেই কাটিয়েছেন। দুধভাই আব্দুল্লাহ’র সাথে বেড়ে উঠেছেন গলাগলি করে। মাঠে মেষ চড়াতেন দু’জনেই। যেখানে অন্যদের মেষ খাদ্যাভাবে হাড্ডিসার সেখানে সবুজ তৃণলতা খেয়ে শিশু মুহাম্মদের মেষগুলো নাদুসনুদুস। এটি শৈশবের অন্যতম এক অলৌকিকতা। যদিও জন্মের আগে পরের অনেক কারিশমাই অবাক করে দেয়। সত্যায়িত করে ইনিই শেষনবী আহমদ সা.।
প্রতিদিনের মত আজও ভাই আব্দুল্লাহকে নিয়ে মাঠে আসলেন। মেষ চড়াচ্ছেন। আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে কী যেন ভাবছেন। চোখ নিচে নামাতেই ভড়কে গেলেন। মানুষ হিসেবে সহজাত যে ভয় কাজ করে। সেটাই ভীতির সঞ্চার ঘটাল।
চোখে পড়ল সাদা পোষাকধারী দু’জন লোক আসছে। আসছে ঠিক শিশু মুহাম্মদ সা. বরাবর। হাতে সোনার তশতরী। এতে কিছুটা জলও আছে। পবিত্র জল। জান্নাত থেকে আনা। আমরা যেটাকে জমজম বলে ডাকি। যার ফোয়ারা বয়ে চলছে মক্কার মাটি ফেড়ে। সিক্ত হচ্ছে পুরো জগত।
সোনার পাত্র হাতে লোক দু’জন এসে উপস্থিত বালক মুহাম্মদের (সা.) সামনে। গুরুগম্ভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে শিশুটির অবয়ব। বিষণ্ণতার ছাপ আঁচ করা যাচ্ছে খুব সহজেই। পরিবেশটা দারুণ ভীতিকর মনে হচ্ছে সুবোধ বালকের জন্য। সিভিল পোশাকের মানুষ দু’জন মাটিলোকের বাসিন্দা মনে হয় না। ঐশী আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল নিষ্পাপ চেহারায়।
কোন কিছু বোঝার আগেই পাঁজাকোলা করে সামনে বাড়তে লাগলো লোক দু’জন। নবী মুহাম্মদ সা. ভয় পেয়ে গেলেন। অবাক দৃষ্টি ঘোরাতে লাগলেন এদিকওদিক।
কি ঘটছে এসব?
কেনই বা হচ্ছে!
আমাকে কী করবে তারা!
ভাবাপন্ন মুহাম্মদ সা.। ডর ভাড়ছে ক্রমেই। বেড়ে যাচ্ছে বুকের ধুকপুক। নিস্তেজ হয়ে পড়ছে পুরো দেহ মুবারক।
কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই চিৎ করে শুইয়ে দিলেন সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাটির ‘ওটি’তে। সফেদ পিরহানে আজনবি লোক দু’জন এখন দেখতে এপ্রোন পরিহিত ডাক্তার।
দূর থেকে সবকিছুই দেখছে দুধভাই আব্দুল্লাহ। এক পর্যায়ে আর স্বাভাবিক থাকতে না পেরে দিল ভোঁ দৌড়। এক দৌড়ে মায়ের দোরগোড়ায়। কান্না এবং ভয়ের তীব্রতায় বোবা কান্না শুরু হল। শ্বাসের গতি এখন দিগুণ। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে লাগল-
মা! ও মা!
জলদি চলো।
কোথায়? কি হল তোর?
মাঠে চলো।
ছেলে আব্দুল্লাহ’র কথা শুনে কণ্ঠ শুকিয়ে আসছে ধাত্রীমা হালিমা সা’দিয়ার। তড়পানো হৃদয় ব্যাকুল হয়ে পড়লো শিশু মুহাম্মদের জন্য। সামান্য সময়ের জন্যও দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললেন। তর সইছে না। স্বামীকে জানালেন তৎক্ষণাত। দু’জনে মিলেই ছুটলেন মাঠ পানে।
অন্তরে ভয়ের উদ্রেক হল। কুরাইশি সন্তান! যদি কিছু হয়ে যায়! কী জবাব দিব তার অভিভাবকের কাছে। যত্তসব চিন্তা। পাগল করে তুলছে দুধমা হালিমার অবচেতন। বাস্তবেই পাগলিনী বনে যাচ্ছে। না! আর দেরি নয়। আরো জলদি যেতে চাই। পথ ফুরাচ্ছে না কেন?
এদিকে বিবর্ণ মুহাম্মদ। শুরু হতে যাচ্ছে ওপেন হার্ট সার্জারি। সার্জন আসমানিলোকের বাসিন্দা। প্রধান সার্জন জিবরীল আমীন আ.। অন্যজন তার সহযোগী। দু’জনেই পাকাপোক্ত।
মুহাম্মদের বুকের মাঝ বরাবর হাত রাখলেন সার্জন জিবরীল আমীন। থরথরানি শুরু হলো মুহাম্মদের কোমল বক্ষদেশে। চাতক পাখির মতো নির্বাক তাকিয়ে আছে। তাহলে কী মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হচ্ছে। নাহ! অমনটা ভাবা যাবে না। অন্যকিছু ঘটতে চলেছে আজ।
মুহাম্মদের চোখের সামনেই ঘটছে সব। স্পষ্ট আঁচ করতে পারছেন। চেতনানাশক কোন ওষুধ খাওয়ানো হয়নি। চৈতন্যহারা হননি তাই। ভয়ের ভেতরেও দিব্যি দেখে যাচ্ছেন সব।
সিনা বিদীর্ণ করলেন। হাত ঢুকালেন বুকের ভেতরে। কী যেন একটা বের করে আনলেন। গোশতের টুকরা। হৃৎপিণ্ড ভেদ করে আনা হল। তাহলে কি সেটা কলব?
হ্যাঁ। কলবে আতহার। পবিত্র আত্মা। যে আত্নার সম্পর্ক মহাসত্ত্বার সাথে। তা’আল্লুক মা’আল্লাহ।
মাংসপিণ্ডটি হাতে নিলেন জিবরীল আ.। পাশে রাখা সোনার তশতরিতে চুবালেন। জমজমের ফ্রেশ পানি। শতভাগ পরিশোধিত মিনারেল ওয়াটারও এর কাছে অবনত মস্তকে কুর্নিশ জানায় হাজারবার।
ধৌত করলেন জমাটবাধা রক্তপিণ্ডটি। ধুয়ে মুছে সাফ করা হল সে অংশটি। তারপর প্রতিস্থাপন করা করা হল যথাস্থানে। নিখুঁত অপারেশন। অপারেশন সাকসেসফুল। ধরে বসালেন বালক মুহাম্মদকে। এতক্ষণে খেলার সাথীরা ভয়ে পালিয়েছে। ছুটাছুটি করতে লাগল এবাড়ি ওবাড়ি। মেরে ফেলা হয়েছে মক্কার কুরাইশি বন্ধুকে। ফেড়ে ফেলা হয়েছে তার বুক। এমনটাই চাউর হতে লাগল এ কান থেকে ওকান।
সহিহ মুসলিম শরিফের ২৪০/১৬৪ নং হাদিসে হজরত আনাস ইবনে মালিক রা. এর নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিবরীল আমিন আ. আগমন করেন, তখন তিনি ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলেন। ফেরেশতা তাকে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তার হৃৎপিণ্ডটি বের করে আনেন। তা থেকে বের করেন একটি রক্তপিণ্ড। ফেরেশতা বলেন, এ হচ্ছে তোমার ভেতরকার শয়তানের অংশ।
তারপর হৃৎপিণ্ডটি সোনার তশতরিতে নিয়ে জমজম এর পানি দিয়ে ধুয়ে নেন এবং জোড়া লাগিয়ে আগের জায়গায় প্রতিস্থাপন করেন। এ দৃশ্য দেখে ছেলেরা দৌড়ে মা হালিমার কাছে এসে বলে, মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। তারা দ্রুত গিয়ে দেখে, তার চেহারার রঙ বিবর্ণ। বর্ণনাকারী আনাস রা.বলেন, হজরতের বক্ষে পরবর্তী সময়েও সেলাইয়ের চিহ্ন দেখা যেত।

লেখক: সহ-সম্পাদক, আওয়ার ইসলাম

Comment

Share.

Comments are closed.