হিজরি সন ও হিজরতের তাৎপর্য

0

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে অন্যতম ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত ঘটনা ‘হিজরত’। হিজরত হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া কিংবা স্থান ত্যাগ করা।

ইসলামের ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনা ‘হিজরত’ হলো- ইসলামের দাওয়াতি কাজ প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে মহান আল্লাহ তাআলার নির্দেশে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে চিরশান্তির শহর মদিনায় চলে যাওয়া।

পবিত্র নগরী মক্কা থেকে চিরশান্তির শহর মদিনায় চলে যাওয়ার এ ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে ঐতিহাসিক হিজরত হিসেবে পরিগণিত। প্রিয়নবির সঙ্গে হিজরতে শরিক হয়েছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী মক্কার অধিবাসীরাও।

ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আল্লাহর নির্দেশে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার প্রিয় সাহাবিদের মাতৃভূমি পবিত্র নগরী মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় চলে যাওয়ার এ ঘটনা ‘হিজরত’কে স্মরণ করেই হিজরি সালের গণনা শুরু হয়েছে।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিদের প্রতি স্বদেশি ও নিজ জাতি-গোত্রের বিরোধিতা নতুন ছিল না, যুগে যুগে নবি-রাসুলগণ তাদের স্বজাতির দ্বারা বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। অপবাদ, গালমন্দ এমনকি হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধাবোধ করেনি।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত লাভের আগে মক্কার লোকদের কাছে ছিল আল-আমিন বা বিশ্বাসী। শুধু তা-ই নয়, পবিত্র নগরী মক্কার শান্তির অনন্য প্রতীকও ছিলেন তিনি। তাইতো ইসলামের আগমনের আগে তিনি মক্কার বিভিন্ন জটিল ও কঠিন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান দিয়েছিলেন।

ইসলামের আগমনের আগেই গঠন করেছিলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ এবং বাইতুল্লাহর গায়ে স্থাপন করেছিলেন হাজরে আসওয়াদ।

প্রিয়নবি যখন ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। আর মক্কার সেই সব লোকদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন, যারা তাকে জীবনের শুরু থেকে নবুয়ত লাভের আগ পর্যন্ত আল-আমিন তথা বিশ্বাসী হিসেবে জানতো, তারাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেন।

তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষ্যান্ত হননি বরং অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা চরম আকারে বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ ৩ বছর শিয়াবে আবু তালিব নামক স্থানে মক্কার অধিপতি আবু তালেবসহ প্রিয়নবির পরিবার-পরিজনকে বয়কট করে রাখে। আর তাতে ইসলামের অনুসারিদের মক্কায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে ওঠে।

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনায় মক্কায় প্রিয়নবির প্রতি অত্যাচারে ঘটনা ওঠে এসেছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমাকে আল্লাহর পথে যেভাবে ভীত করা হয়েছে তেমনটি আর কাউকে করা হয়নি। (আবার) আমি আল্লাহর পথে যেভাবে নির্যাতিত হয়েছি, এমনটি আর কেউ হয়নি। মাসের ৩০ দিন ও রাত আমার ও আমার পরিবারের কোনো খাদ্য জোটেনি। বেলালের বগলে যতটুকু লুকানো সম্ভব ততটুকু ছাড়া।’ (মুসনাদে আহমদ)

একটা সময় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করতেই হত্যার সব পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তখনও প্রিয়নবি পবিত্র নগরী মক্কা ছেড়ে কোথাও যাননি।

হিজরি সন ও হিজরতের ইতিহাস মুসলিম উম্মাহকে প্রিয়নবি ও তার সাহাবাদের স্মৃতি বিজড়িত ইসলামের প্রতি তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলামের বিধানের প্রতি তার অনুসারিদের আনুগত্যকে বাড়িয়ে দেয়।

ইসলামের দুষমনরা যখন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দিনক্ষণ ঠিক করে, তখনই আল্লাহ তাআলা প্রিয়নবিকে সে কথা জানিয়ে হিজরতের নির্দেশ দেন। কাফের মুশরেকদের সেই চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে আল্লাহ তাআলা প্রিয়নবির উদ্দেশ্যে বলেন-

‘আর কাফেররা যখন প্রতারণা করে আপনাকে বন্দি অথবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে বের করে দেয়ার জন্য তারা যেমন ছলনা করেছিল, আল্লাহও তাদের বিরুদ্ধে ছলনা করেন। বস্তুত আল্লাহর ছলনা সবচেয়ে উত্তম।’ (সুরা আনফাল)

আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের-মুশরেকদের সব ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দিয়ে প্রিয় সহচর হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে মদিনার বিপরীত দিকে গারে সাওর তথা সাওর গুহায় অবস্থান গ্রহণ করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর পবিত্র নগরী মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত শুরু করেন। বহু চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৮ রবিউল আওয়াল কুবায় পৌঁছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ১২ রবিউল আওয়াল চিরশান্তির শহর মদিনায় পৌঁছেন।

ইসলামের ইতিহাসে প্রিয়নবির দেশ ত্যাগের এ ঘটনার ঐতিহাসিক স্মৃতিবহন করছে হিজরি সন। হিজরতের পর থেকেই ইসলামের প্রচার ও প্রসার বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইসলাম। আর প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হন রাষ্ট্র প্রধান। বিশ্বব্যাপী শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে তিনি ঘোষণা করেন ‘মদিনার সনদ’। এ সবই হিজরতের ফলাফল।

সর্বোপরি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের গুরুত্ব বিবেচনা করেই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হিজরি সাল গণনা শুরু করেন। এ হিজরি সাল ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত নিজস্ব সাল। হিজরি সাল অনুযায়ী মুসলিম উম্মাহর ইবাদত-বন্দেগি তথা রমজানের রোজা, ঈদ, হজ, কুরবানিসহ নানা বিষয় নির্ধারিত হয়।

সে পরিক্রয় মুসলিম উম্মাহ অতিক্রম করেছে ১৪৩৯টি হিজরি বছর। আগামীকাল থেকে শুরু হবে ১৪৪০ হিজরি বর্ষ। নতুন হিজরি বর্ষে মুসলিম উম্মাহ ইসলামের ইতিহাসের সেসব আত্মত্যাগের স্মৃতিকে নিজেদের হৃদয়ে জাগ্রত করে ইসলামের বিধান পালনে একনিষ্ঠ হোক। ত্যাগের মহিমায় নিজেদেরকে নতুন করে সাজিয়ে তুলবে এ প্রত্যাশায় শুভ নববর্ষ…

Comment

Share.

Leave A Reply