প্রিয় কওমিয়ান : তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ

0

সৈয়দ শামছুল হুদা ::

গতকাল মীরপুরে অনুষ্ঠিত ওযাহাতি জোড়ে অংশ নিয়েছিলাম। খুব ভোর বেলাতেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। মূল্যবান আলোচনাও শুনেছিলাম। আলোচনা শুনার ফাঁকে ফাঁকে কিছু কথা আমার মনে বারবার উদয় হচ্ছিল। সে কথা গুলোই বলার চেষ্টা করছি।

মাহফিলে খুব ভোর থেকেই যেভাবে একদল তরুন আলেমদের আগমন লক্ষ্য করছিলাম, তা আমাকে ভিন্ন একটি জগতে নিয়ে যায়। হাজার হাজার তরুন আলেম। যাদের চোখে-মুখে প্রতিভার স্বাক্ষর। যাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা এক একজন বিশাল বিশাল স্বপ্ন নিয়ে পায়চারি করছে। তাদের দেখে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের চাহনীতে কী যেন পুণ্যের হাতছানি।

একদল নবীন কওমিয়ান, এরা সত্যিই পরিশ্রমী, এরা সত্যিই সাধনায় রত। দ্বীনের প্রতি, কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি এদের আনুগত্য, আলেম- উলামাদের প্রতি এদের আনুগত্য, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি এদের আনুগত্য যেন তুলনাহীন। আমি নবীন ও তরুন আলেমদের দেখে দেখে আপ্লুত হচ্ছিলাম। তাদের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা সবকিছুই উপচে পড়ছিল।

শুধু ভাবছিলাম, রাষ্ট্র কত হতভাগা, হাজার হাজার ফেরেশতাতুল্য এই আলেমদের কাজে লাগাতে ব্যর্থ। রাষ্ট্রের যে কোন গঠনমূলক কাজে এদের দায়িত্ব দিলে তারা যে সক্ষম তা তাদের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝা যাচ্ছিল। সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে এদেরেকে রাষ্ট্রের যে কোন কাজেই লাগানো হোক না কেন, আমার বিশ্বাস তারা সফলকাম হবে। মাঠে তিল ধারণের ঠায় ছিল না। চতুর্প্বাশে শুধু আলেম আর আলেম। ফাঁকে ফাঁকে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতে সুন্নতী লেবাসধারী সাধারণ মানুষও ছিল, যাদেরকে দেখলে আলেমের মতোই মনে হয়। তদুপুরি আলেমের সংখ্যাই ছিল বেশি।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে, এদেশে লক্ষ লক্ষ তরুন আলেম তৈরী হয়েছে। হাফেজে কুরআন তৈরী হয়েছেে। এজন্য অবশ্য এদেশের সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তাদের দান ও সহযোগিতায় এত পরিমান আলেম বাংলাদেশে তৈরী হয়েছে যা আর কোন মুসলিম দেশে নেই। একজন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র যে পরিমাণ শ্রম ও মেধা ব্যয় করে কুরআন ও হাদীসের ইলম অর্জন করে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানেই এমন শ্রম ও মেধা ব্যয় করা হয় না। একজন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র দ্বীন শিখার জন্য যে পরিমান সময় দেয়, এমনটা আর কোন শিক্ষা ধারায় দেখা যায় না।

কওমী মাদ্রাসার সনদ, কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা কারিকুলাম, কওমী মাদ্রাসার শ্রেনিবিন্যাস অন্য আর দুটি শিক্ষা ধারার মতো নয়। এটা অনেকেই বুঝতে চায় না। সবাই যে যার মতো করে কওমীকে মূল্যায়ন করে। আর এখা্নেই বিভ্রান্তিটা তৈরী হয়। কওমী মাদ্রাসার সিলেবাসটা এমনভাবে তৈরী, যেটা যে কেউ সত্যিকার অর্থে অনুসরণ করলে সে কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানের গভীরতায় যেতে পারবে। এখানে বিজ্ঞান, এখানে বাংলা, ইংরেজি, এখানে ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং শিখানোর কাজ হয় না। এখানে শুধু এমন কিছু মৌলিক কিতাব গুরুত্বসহকারে পড়ানো হয়, যার দ্বারা একজন শিক্ষার্থী কুরআন ও হাদীসের মূল বিষয়া আয়ত্ব করতে পারে। ধারণ করতে পারে। আর বাস্তবেও সেটাই আমরা কওমীতে লক্ষ্য করি। বর্তমান সময়ের কওমী ছাত্রদের অধিকাংশেই মেধাবী।প্রখর মেধাবী।

ব্যতিক্রম নাই এমনটা বলা যাবে না। কিছু ফাঁকিবাজ, কিছু মতলববাজ থাকবেই। কিন্তু অধিকাংশ কওমী ফারেগীণ বর্তমানে যথেষ্ট মেধা নিয়েই বের হয়। এই মেধাবী তরুণদের যথাযথ জায়গায় মূল্যায়ন হয় না। তাদের সততা, তাদের একনিষ্ঠতা, তাদের মেধাকে কাজে লাগানো হয় না। ফলে একদিকে দেশ একদল সৎ মানুষের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অপরদিকে দেশেরই একটি বিরাট র্অংশকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে।

বর্তমান ফারেগিন যারা তারা কিতাবী ইলমের পাশাপাশি জাগতিক প্রয়োজনীয় ইলমও অর্জন করছে। সম্প্রতি বর্তমান সরকার তাদের শিক্ষার সনদের মান ঘোষণা করেছে। এ জন্য বর্তমান সরকার অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য হলো, তাদেরকে যে সকল জায়গায় নিযুক্ত করলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে, সে সকল জায়গায় তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা। বেসরকারীভাবে তাদেরকে মুল্যায়ন করা। তাদের কর্মসংস্থানের চিন্তা করা, ব্যবস্থা করা।

আমি কওমিয়ানদের চোখে আগামীর নেতৃত্ব দেখতে পাচ্ছি। তারা দেশকে অনেক কিছুই দিতে পারবে সেই স্বপ্ন দেখছি। পাশাপাশি দেশের সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাচ্ছি, এ সকল কওমিয়ানদের আপনারা কাজে লাগান। তাদের হাতে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিন। তাদেরকে কিছু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যে কোন কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব।

হেফাজতে ইসলামীর আন্দোলনের পরবর্তী তরুণ আলেমগণ আরো অনেক বেশি মেধাবী। অনেক বেশি চৌকস। অনেক বেশি সতর্ক। তাদেরকে কেউ চাইলেই বিপথগামী করতে পারবে না। তাদের চোখ মুখ এখন অনেক বেশি সচেতন। এরপর তারা এখন স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর মান পেয়েছে। তাদের মধ্যে সেই দায়িত্বের অনুভুতিও আছে। ইনশাআল্লাহ, আমার বিশ্বাস এদেরকে যারাই কাজে লাগাবে, তারাই সফলকাম হবে। এদের থেকে যারাই মুখ ফিরিয়ে নিবে তারাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

ওহে কওমিয়ান, তোমাদের প্রতি আমার সালাম। তোমাদের প্রতি আমার অফুরন্ত ভালোবাসা। তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যত কামনা করি। তোমাদের হাত ধরে এদেশে ইসলামের বিজয় কেতন উড়বে সেই স্বপ্ন দেখি। তোমাদের যোগ্য নেতৃত্ব পরবর্তী কওমিয়ানদের জন্য হবে রোলমডেল। তোমরা ছড়িয়ে পড়ো সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি সেক্টরে। বিশেষ করে শিক্ষা, সেবা, চিকিৎসা, দাওয়াত ইত্যাদি প্রতিটি সেক্টরে। সবচেয়ে বেশি ভালো হয়, নিজেরাই নিজেদের কর্মস্থল গড়ে তুলতে পারলে। শুধু নিজেরই নয়, নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের জন্যও তোমরা গড়ে তোল নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। দেশে ও বিদেশে বেসরকারী উদ্যোগে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। প্রয়োজন মেধাটাকে কাজে লাগানোর। প্রয়োজন বড়দের থেকে আইডিয়া ধারণ করা।

আল্লাহ তোমাদের কবুল করুন।

Comment

Share.

Leave A Reply