কওমি স্বীকৃতির শেষ ধাপ এবং বাতাসে বায়ূ-দূষণের বার্তা!

0

রশীদ জামীল ::

কওমি স্বীকৃতির শেষ ধাপ, পার্লামেন্টের শেষ অধিবেশন এবং বাতাসে বায়ূ-দূষণের বার্তা! বার্তাটি যেন সত্যি না হয়। স্বীকৃতি নিয়ে রাজনীতি করে শেষটা যেন ক্লেষ্টা না হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
কেমন আছেন জানতে চাইলাম না। আপনি সবসময় ভালো থাকেন-জানি। আপনার এই ব্যাপারটি আমার ভালো লাগে। আমিও তাই থাকতে চেষ্টা করি। অবস্থা যখন যেমনই হোক, ভালো থাকি। ভাবি; দুইদিনের এই দুনিয়ায় মন্দ থেকে লাভ কী!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আমি জানি, এই লেখা আপনার কাছে গিয়ে পৌঁছাবে না। কয়েককোটি বাঙালি ফেইসবুকে লেখালেখি করেন। সুতরাং কে কী লিখল, সঙ্গতকারণেই আপনার পক্ষে জানার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

আবার যখন দেখি, আপনার সরকার অথবা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অজোপাড়া গায়ের কেউ কোনো কটাক্য করলে সাথেসাথেই তাকে সাতান্ন ধারায় গ্রেফতার করে ফেলাহয়, তখন অনুমান করি আপনার একটি বিশাল সাইবার টিম ফেইসবুকে খুবই সক্রিয় এবং চৌকষ থাকে। সুতরাং, তাদের কারো মাধ্যমে লেখাটি হয়তবা আপনার নজরে পড়লেও পড়ে যেতে পারে। আশা তো করাই যায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
দু’হাজার আট থেকে টানা দশবছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন আপনি। সাংবিধানিক সুযোগে আরো তিন/চারমাস থাকছেন।
তারপর…
… তারপর নির্বাচন… জন-ম্যান্ডেট… হয়তো আরো পাঁচ বছর… হয়তো না।

মানুষ যদি তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করার পরিবেশ পায়, যদি আপনাকে ভোট দেয়, তাহলে তো ভালো। আর না হলে তো এই মাস চারেকই আপনার মেয়াদের শেষ সময়। সঙ্গতকারণেই আজ থেকে শুরু হতে চলা অধিবেশনই হচ্ছে দশম সংসদের শেষ অধিবেশন। অতএব, শেষটাকে স্মরণীয় করে যান। সুযোগ আছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে এদেশে অনেক রাজনীতি হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬-এর শাসনামলে তৎকালীন সরকার স্বীকৃতি নিয়ে খেলা কম করেনি। মুক্তাঙ্গনে পড়ে থাকার পরও স্বীকৃতির দাবি মেনে নেবে দূরে থাক, মন্ত্রী পর্যায় থেকে একটু সম্মানজনক সহানুভূতি নিয়েও কেউ কাছে আসেনি। কেন এলো না- নেপথ্য কারণ অনুমান করতে পারলেও সুনির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ ছিল না। আপনি যেদিন কওমি স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন, তার একদিন কি দুইদিন পরে সেটা প্রকাশ করলেন তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তিনি পরিস্কার ভাষায় বললেন, স্বীকৃতির এই বাহবাটা বেগম জিয়ার পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। কেনো এবং কাদের চাপে সেদিন তারা স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে পারেননি, তারা কারা ছিল, তখন তাদের ঘাড়ে কারা সওয়ার ছিল এবং কারা কখনোই চায় না কওমির ছেলেরা স্বীকৃত হোক; সেটা কি আর ব্যাখ্যা করার দরকার আছে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আমরা জানি আপনি অত্যন্ত স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড কথাবার্তায় অভ্যস্ত। আমরা দেখেছি আপনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তখন কারোই তোয়াক্কা করেন না। কে কী বলল, কে কোন ভাষায় সমালোচনা করল; আপনি থোড়াই কেয়ার করেন। আপনি জানতেন কওমি সনদের স্বীকৃতি দিলে বামপাড়া থেকে প্রতিবাদ আসবে। আপনি জানতেন প্রগতির সাইনবোর্ডধারী বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রচুর সমালোচনা হবে। তবুও আপনি এদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি সন্তানের হৃদয়ের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েছেন। স্বীকৃতির দাবি মেনে নিয়ে কওমি সনদকে মাস্টার্সের মান দিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় সেটা সর্বসম্মতিক্রমে পাশও হয়েছে। এখন পার্লামেন্টে পাশ হলেই আইনি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষহয়। তারপরও বিলটি মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হওয়াটা হবে সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

এদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি সন্তান আশা করে বসে আছে সংসদের চলতি এবং শেষ অধিবেশনেই বিলটিকে পাশ করিয়ে দেয়া হবে। সবাই বিশ্বাস করছে ব্যাপারটি নিয়ে কোনো ধরণের রাজনীতি করা হবে না। ‘’আইনি প্রক্রিয়া চলছে। বিলটি আরো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের আবার ক্ষমতায় নিয়ে আসলে প্রথম অধিবেশনেই এটাকে পাশ করিয়ে নেওয়া হবে’’- এমন কিছু বলে ব্যাপারটিকে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

বাংলাদেশ ৫০ লক্ষ কওমি সন্তান বাংলাদেশেরই সন্তান। এরা কেউ বানের পানির সাথে ভেসে আসেনি। এরা অন্যদেরচে’ বাংলাদেশকে কম ভালবাসে না। এদের ঠিক ততটুকুই অধিকার আছে, যতটা আছে অন্যদের- ব্যাপারটি অনুধাবন করে আপনি কওমি ছাত্রদের প্রাপ্য অধিকারের দাবি মেনে নিয়ে স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছেন। অভিনন্দিত হয়েছেন। আমরা আশা করছি শেষবেলায় ব্যাপারটি ধরে রাখবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, ৫০ লক্ষ কওমি ছাত্র, তাদের এককোটি বাবামা, আরো দেড়কোটি ভাইবোন/ফ্যামিলি মেম্বারস, সবমিলিয়ে কম করে হলেও তিনকোটি মানুষের এই পরিবারটির সাথে কোনো প্রকার ছল-চাতুরি করা হবে না। তাদের সামনে স্বীকৃতির ব্যাপারটিকে মূলা বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হবে না। তাহলে আপনার প্রতি এই প্রজন্মের সিম্পেতির শেষ বিন্দুটিও আর অবশিষ্ট থাকবে না। উপরন্তু পুরনো ঘাগুলোও বেদনার জানান দিতে শুরু করতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আপনার ডানেবামে যারা থাকে, তারা আপনাকে দেশের মানুষের অবস্থা কতটা জানতে দেয়, আমি জানি না। আমি জানি না তারা আপনাকে এই ব্যাপারটি সঠিকভাবে জানতে দিয়েছে কিনা যে, কোটাবিরোধী আন্দোলন ইস্যুতে দেশের কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রী অর্থাৎ ইয়াং জেনারেশন আপনার সরকারের উপর খুব একটা খুশি নেই।

আমি জানিনা, সদ্য-সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্কুল/কলেজের কিশোর/কিশোরীরাও যে আপনার উপর খুব একটা সন্তুষ্ট নেই; ব্যাপারটি আপনার সামনে তারা ক্লিয়ার করেছেন কিনা। এই কিশোর ছেলেমেয়েগুলোর সকলের ভোট না থাকলেও তাদের বাবামা কিন্তু ভোটার। এই যখন অবস্থা, তখন কওমি স্বীকৃতিকে নির্বাচনী ফায়দা হাসিলের জন্য ঝুলিয়ে রেখে কওমি জনগোষ্ঠিকেও দূরে ঠেলে দেওয়া কি ঠিক হবে- মনেহয় ভাবা উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। স্বীকৃতির বিলটিকে পাশ করে দিয়ে যান। সব ভালো হোক আর না হোক, বেশ ভালো হবে। ভালোটা আপনারই বেশি হবে। কারণ, কওমি প্রজন্ম যখন একবার জেগে গেছে, তখন স্বীকৃতি; সেটা আজ হোক, কাল হোক, আদায় করেই ছাড়বে। আপনি নন্দিত হবেন, যদি কাজটি শেষ করে যেতে পারেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
আপনি নন্দিত হোন।

#লেখকের ফ সবুক ওয়াল থেকে

Comment

Share.

Leave A Reply