রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

0

 সৈয়দ শামছুল হুদা ::

কৌশলী রাজনীতিতে বিএনপি আরো একধাপ এগিয়ে গেলো। বিএনপির সামনে এরচেয়ে ভালো কোন বিকল্প আছে কি না আমার জানা নেই। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে এতটাই আতঙ্কগ্রস্থ এবং হুমকিময় করে তোলা হয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত কোন দলের পক্ষেই আর রুখে দাঁড়ানোর সুযোগ রাখা হয়নি। ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার প্রাপ্তির আশাও এখন কেউ করে না। যখন-তখন যে কোন সিনিয়র ব্যক্তিকে পর্যন্ত অপমান করা হয়, হেনস্থা করা হয়। কোন সিনিয়র ব্যক্তিও এখন এ কখা বলতে পারে না যে, রাস্তায় যে কোন ন্যায্য অধিকার নিয়ে মাঠে নামলে তাকে অপমান করা হবে না। এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি। এটা হওয়া উচিত ছিল না।

এহেন পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে বৃহত্তর ঐক্য গঠন এবং সে ঐক্যে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার নীতিটি যৌক্তিক হবে, ফলপ্রসু হবে, কার্যকর হবে বলেই মনে করি।২২সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে যে সভাটি হলো সেখানে আমরা নতুন চিত্র দেখলাম। ড. কামাল এর আহবানে অধিকাংশ বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সেখানে কয়েকটি ইসলামী দলও উপস্থিত ছিল। বিষয়টি আমার কাছে অন্য রকম মনে হয়েছে। শক্তির বিচারে ইসলামী দলগুলো বড় বড় মহারথিদের চেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু প্রচার ও প্রভাবের ক্ষেত্রে বামরা বরাবরই এগিয়ে। সেই বাম, ডান মিশ্রনের সমাবেশে দুয়েকটি ইসলামী দলের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এখানে বামরা চাইলেও যেমন এককভাবে কিছু করতে পারে না, পারবে না, তেমনি ইসলামী দলগুলোও তাদের এড়িয়ে কিছু করতে পারবে না।

সকলে মিলে একই পথে যাত্রার এই দিকটি সম্ভাবনাময় করে তুলেছে ক্ষমতাসীন জগদ্দল পাথরকে অপসারণের পথ। এদেরকে যুদ্ধাপরাধীও বলা যাচ্ছে না, রাজাকারও বলা যাচ্ছে না। আবার ওদের পেছনে পাশ্চাত্যের বড় বড় শক্তির সমর্থন আছে সেটাও স্পষ্ট। বর্তমান সরকার অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে দেওয়ার যে কৌশলে এতদিন পার পেয়ে এসেছে, তা মনে হয় এখন আর সহজ হয়ে উঠবে না। কারণ নির্যাতিত গোষ্ঠীটি যারা নিজে মাঠে দাঁড়াতে পারছিল না, তারা সামনে নিয়ে এসেছে এমন একটি শক্তিকে যাদের পাশ্চাত্য ভালোবাসে। তাদের ওপরে আঘাত আসলে তারা চেচিয়ে উঠবে। কিন্তু নির্যাতিত গোষ্ঠীটি যদি নিজেরা রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করে, তাহলে শত অত্যাচারের ভিতরও ওদের সমর্থন মিলবে না। ফলাফল হবে আরো একটি টার্ম সরকারকে সুযোগ করে দেওয়া।

চলমান রাজনীতি বামদের উত্থানে সাহায্য করবে। এটা নিশ্চিত। সেক্যুলার রাজনীতি একেবারে মাথাচাড়া উঠতে পারবে না। কারণ সেখানেও কিছু ইসলামী দল থেকেই যাচ্ছে। যদিও জামাতকে প্রকাশ্যে সভায় আমন্ত্রন জানানো হয়নি। তথাপি পরোক্ষভাবে তারা বিএনপির সাথে নির্বাচনে থাকবে এটাই ধারণা করা হচ্ছে। এরফলে একটি মিশ্রশক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হবে বর্তমান অপশক্তি। হয়তো অনেকেই তীব্র আপত্তি তুলবে, ইসলামী দলগুলো কীভাবে কট্টর বামদের সাথে মঞ্চে উঠছে। বামদের উত্থানে তারা কেন ভুমিকা রাখছে? নৈতিক প্রশ্নে এটাকে গ্রহন করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ তা যারা রাজনীতির মাঠে আছেন নিশ্চয় তারা অনুভব করেন। রাজনীতি করতে হলে অনেক বেশি উদার হতে হয়। দূরদর্শী হতে হয়।

প্রশ্ন আসতে পারে, ইতিমধ্যেই দুটি ইসলামী দল সরকারের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের নিয়ে প্রশ্ন আসলে এদের নিয়ে কেন কথা উঠবে না?।প্রশ্ন উঠবেই। ইতিমধ্যেই সে আলোচনা শুরুও হয়ে গিয়েছে। তথাপি একটা চিরাচরিত নিয়ম হলো, মানুষ সাধারণত মজলুমকে সমর্থন করে। ২০০১সালে চারদলীয় জোট সরকারে মুফতি আমিনী এবং শায়খুল হাদীস সাহেব সমর্থন দিয়েছিলেন এই নীতিতেই। যদিও এ দুজন মহান ব্যক্তির রেখে যাওয়া দল ২০০১এর কাফফারা দিতে তারা আওয়ামীলীগের সাথে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তুলেছে। সর্ম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করাটার মধ্যে খুব বেশি যুক্তি খোঁজার দরকার নেই।

নতুন ফ্রন্ট আমাদের জন্য খুব কল্যাণকর হবে এমনটা মনে করি না। বিশেষকরে যারা সারা জীবন ইসলামী আদর্শ ও নীতির বাইরে থেকেছে তাদেরকে ক্ষমতায় এনে নিজের পায়ে কুড়াল মারা হবে কী না এমন একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। এ বিশেষ পরিস্থিতিটাকে বাধ্য করেছে বর্তমান সরকার। এর কোন বিকল্প আপাতত এদেশের রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। তবে আশা করা যায়, সব মতের দলগুলোর এই মিশ্রন যতটা আতঙ্ক ছড়ানোর কথা, তারা বিজয়ী হলে এতটা উগ্র ও ধর্ম বিদ্বেষী হয়ে উঠতে পারবে না। এবং এর সাথে ইসলামীশক্তিগুলোর কিছুটা মিশ্রন থাকার ফলে মন্দের ভালো হয়ে উঠতেও পারে।

এছাড়া ভারতীয় আধিপত্যবাদ যেভাবে ভিত গাড়ছে, সেখানে এখনই কিছুটা পরিবর্তন দরকার। এটা না হলে আমাদের স্বকীয়তা হুমকির মধ্যে পড়বে। একচেটিয়া ভারত সব সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে আমাদের কিছুই দিচ্ছে না। একটি অবৈধ সরকারকে, অগণতান্ত্রিক সরকারকে, অনির্বাচিত সরকারকে তারা বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে, ঠকাচ্ছে। এই ঢেউ সামলানোর জন্য হলেও যে কোন মুল্যে ক্ষমতার পরিবর্তন দরকার।

সব মতের বিরোধী দলগুলো যেভাবে একটি দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, সেটা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে। আর একবার পরিবর্তনের আশার সঞ্চার করতে পারলে অনেক কিছুই বদলে যাবে। হিসাব-নিকাশ উল্টে যাবে। অনেকের চেহারাই ঘুরে যাবে এটা নিশ্চিত। পরিবর্তনের আশা না জাগাতে পারলে শুধু আন্দোলন দিয়ে কিছু হবে না। ২০১৪সালে বিএনপি কম কষ্ট করেনি। আন্দোলন কম হয়নি। একাধারে প্রায় ৩মাস পর্যন্ত দেশ প্রায় অচলই ছিল বলা যায়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তন হয়নি। কারণ তখন বিএনপি আশা জাগাতে পারিনি। পরিবর্তনের ঢেউ তুলতে পারেনি। এবার মনে হয় পারবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এই ঐক্যকে সমর্থন করা যায়।

Comment

Share.

Leave A Reply