‘নিরাপদ বিশ্ব গড়তে ইসলামভীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে হবে’

0

চলতি মাসের ৩ তারিখ বুধবার ইউরোপীয় শিক্ষাবিদগণ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনসভায় এক বৈঠকে মিলিত হন। তারা পুরো ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইসলামোফোবিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি কার্যক্রম হাতে নেন যেটিকে তারা “toolkit” নামে অভিহিত করছেন।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের আটটি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন আইনসভায় উপস্থাপন করা হয়। তাতে বলা হয়- ‘ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া খুব খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে’ এবং মুসলিমরা ‘তাদের প্রাত্যাহিক জীবনযাত্রায় নতুন ধরনের বৈরিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনসভায় যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি গ্রিন পার্টির সদস্য জেয়ান লামব্রেট বলেন- ‘এটি এমন একটি ইস্যু যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমাজ ব্যবস্থায় বিষক্রিয়া ছড়াচ্ছে এবং আমাদের সমাজের সামনে এগিয়ে চলার পথে বাধা তৈরি করছে।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইসলামোফোবিয়ার প্রভাব কতটা তা কিছু উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। সম্প্রতি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব বরিস জনসন হিজাব পরিধানকারী মুসলিম নারীদেরকে ‘ডাক বাক্স’ এর সাথে তুলনা করে যুক্তরাজ্যের একটি পত্রিকায় কলম লিখে আলোচিত হন। অন্যদিকে সম্প্রতি বিভিন্ন ইউরোপিয়ান দেশসমূহে ‘বোরকা নিষিদ্ধ’ করে আইন পাশ করা হয়েছে।

যেখানে ইউরোপের দেশসমূহে বিদেশিদের এবং মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়াকে বিপদজনক মনে করা হয় সেখানে “Counter Islamophobia Kit” নামের ইউরোপীয় আইনসভায় উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে একে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বলে অভিহিত করা হয়।

ইউরোপের শিক্ষাবিদগণ লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় আটটি ইউরোপীয় দেশে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম ভীতিমূলক কর্মকান্ডের স্বরূপ উন্মোচন করতে একটি গবেষণা চালিয়েছেন। এই আটটি দেশ হল- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, চেক রিপাবলিক, গ্রিস, হাঙ্গেরি এবং পর্তুগাল।

Counter Islamophobia Kit নামে পরিচালিত এই গবেষণার প্রধান কর্মকর্তা আমিনা ইসাত বার্তা সংস্থা মিডেল ইস্ট আই’কে বলেন- ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, ইউরোপে আমাদের ধারণার চাইতেও বেশী পরিমাণে ইসলাম ভীতি ছড়িয়ে আছে এবং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিভিন্ন উপাদানে অনেক বেশী প্রভাব পেলতে সক্ষম।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চলমান ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রমগুলোকে রুখে দিতে চাই এবং এগুলোকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে চাই একই সাথে সমাজে মুসলিমদের অবদানগুলো সম্পর্কে সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।’

ইসলাম-ভীতির স্থানীয় ভিন্নতা

কিছু ইউরোপীয় দেশের মানুষ মুসলিমদের ‘নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি’ হিসেবে মনে করেন এবং এ কারণে সেসব দেশে ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রম বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে কিছু দেশের জনগণ মুসলিমদের ‘স্থানীয়, জাতীয় এবং ইউরোপীয় পরিচয়ের’ জন্য হুমকি মনে করে এবং এভাবেই এসব দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ইতিহাসে ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের বিভিন্ন সরকারি নীতি বাস্তবায়ন সংস্থাগুলো ধর্ম নিরপেক্ষতাকে তাদের জাতীয় চেতনা হিসেবে দেখে থাকে এবং এসব সংস্থা অধিকাংশ মুসলিমকে ধর্ম নিরপেক্ষতার বিরোধী হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। পর্তুগালের ইতিহাস এমনভাবে রচিত হয়েছে যাতে করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে এমন ভীতি গড়ে উঠেছে যে, তারা সবসময় মুসলিমদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তৈরি থাকে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিসের জনগণের মধ্যে এমন ধারণা জন্মেছে যে, তারা মনে করে তুরস্ক সারা ইউরোপে অভিবাসী ছড়িয়ে দিয়ে এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায় এবং এভাবেই এখানে মুসলিম অভিবাসীদের প্রতি ইসলাম ভীতিমূলক ঘৃণা ছড়িয়ে পড়েছে।

আর হাঙ্গেরির মত অন্যান্য দেশে যেগুলো অনেক আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য ইউরোপে যাওয়ার জন্য একটি সুবিধাজনক ট্রানজিট হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, সেসব দেশে মুসলিমদের কে স্বভাবগত সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান জার্মানির বিল্ড পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা এসব লোকজনদের মুসলিম অভিবাসী হিসেবে দেখতে চাই না বরং আমরা এদেরকে মুসলিম আগ্রাসনকারী হিসেবে দেখে থাকি।’

এমনকি যুক্তরাজ্যের মত দেশ যেটি দীর্ঘ সময় ধরে বৈচিত্র্যের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেছে, সে দেশের মুসলিম জনগণ প্রায়শই ইসলাম ভীতিমূলক আক্রমণের স্বীকার হন এবং তাদেরকে অনেক সময় ইসলামিক স্টেটের সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করে হয়রানি করা হয়।

যুক্তরাজ্যের Islamic Human Rights Commission (IHRC) এর প্রধান গবেষক আরজু মেরালি বুধবারের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনসভায় কিভাবে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মুসলিম বিদ্যালয়গুলো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয় এবং কিভাবে এসব আক্রমণকে বৈধতা দেয়া হয় তা তুলে ধরেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের অনেকে মুসলিমদেরকে ‘যুক্তরাজ্যের নাগরিক’ হিসেবে মানতে চান না।

তিনি আরো বলেন, ‘এটি শুনতে নাটকীয় মনে হতে পারে কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আমরা এসব কিছুর মুখোমুখি হচ্ছি।’

জার্মানির Islamic Human Rights Commission (IHRC) এর কর্মকর্তা লুইস ম্যানুয়েল বলেন, ‘অতি দ্রুতই ইসলামোফোবিয়াকে বর্ণবাদমূলক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’, ‘ইউরোপের দেশসমূহের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রায় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে কিভাবে ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে’ সে দিকটি তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘এসব দেশে ইসলাম-ভীতিকে সরকারিভাবে বৈষম্যমূলক বলে মনে করা হয় না।’

লুইস ম্যানুয়েল আরো যুক্ত করে বলেন, ‘জার্মানিতে এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, একজন মুসলিম মানে একটি সমস্যা।’

Counter Islamophobia Kit এর পরিচালক আমিনা ইসাত জানান, ‘আমি আশংকা করছি যে- ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ফ্রান্স নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে। ফ্রান্সের নেতাদের মনে এমন ধারণা জন্মেছে যে, ইসলাম ভীতিমূলক কাজ গ্রহণযোগ্য।’

তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, ফ্রান্সে যখন ‘নিকাবের(বোরকা) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল তখন তা বেলজিয়ামে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এর পরে তা ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমার শঙ্কা হচ্ছে যে, এভাবে চলতে থাকলে এটি বৈধতা পেয়ে যাবে।’

বিষাক্ত মতের বিরুদ্ধে কাজ করা

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণা এবং এসব দেশের নেতারা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ইসলাম ভীতি যেভাবে গেঁড়ে বসেছে তা দূর করার জন্য Counter Islamophobia Kit ইসলাম সম্পর্কে এসব বিষাক্ত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আহ্বান জানায়।

ইসলাম-ভীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিবেদনটি জানায়, ইউরোপের জনগণের মধ্যে ‘মুসলিমদের স্বাভাবিকভাবে’ তুলে ধরার মাধ্যমে এমন ধারণা ছড়িয়ে দিতে হবে যে মুসলিমরাও অন্যদের মতই সমাজে অবদান রেখে চলেছে। উদাহরণ স্বরূপ চেক রিপাবলিকের হিউম্যান লাইব্রেরী নামে একটি সংস্থা মুসলিম এবং অমুসলিমদেরকে একে অন্যের খাদ্যাভ্যাস, ফ্যাশন এবং সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

কিছু কিছু ক্ষেত্র ইসলাম ভীতিমূলক কাজের বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে যেমন- গ্রিসের খ্রিস্টানপন্থী একটি সংস্থা ‘জাতীয়তাবাদ বিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ এবং সমাজে খ্রিস্টান ধর্মীয় আদর্শ যেমন শান্তি, আতিথিয়তা এবং সেবা’ ইত্যাদি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছে। তারা বিশেষত অভিবাসীদের জন্য তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আইনি প্রক্রিয়া

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনসভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘ইউরোপিয়ান দেশসমূহের মানবাধিকার আইনে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে কার্যক্রম নেয়ার জন্য খুবই কম চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে একই সাথে ইউরোপের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আইনি ব্যাপারগুলোতে ইসলাম ভীতিমূলক কাজের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে তা পরিষ্কার করা হয় নি।’

এই প্রতিবেদন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হিউম্যান রাইটস বিষয়ক আইনসমূহের ব্যাপক সমালোচনা করে। এসব দেশের আইনে ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং তা প্রমাণ করা অনেকটাই কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনসভায় তুলে ধরা প্রতিবেদনটিকে স্বাগত জানানো হয় এবং ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রমকে ব্যাখ্যা করার জন্য একই সাথে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বাধ্যতামূলক নয় এমন রেজুলেশন পাশ করা হয়।

আইনসভা তাদের বৈঠকটিকে সফল বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, ‘বিভিন্ন সংস্কৃতিমূলক, ঐতিহাসিক কারণ এবং আর্থসামাজিক অবস্থাই ইসলামভীতিমূলক কার্যক্রমের জন্য দায়ী।’

তবে একই সাথে জানানো হয় যে, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার মূলক আইন গুলোতে ইসলামোফোবিয়াকে মোকাবেলা করার জন্য কার্যকরী বিষয়সমূহের অভাব রয়েছে।’

যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির নেতা সাজ্জাদ করিম ইউরোপীয় দেশসমূহে ইসলাম-ভীতির বিরুদ্ধে গড়ে উঠা উদ্বিগ্নতাকে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি এবং গত কয়েক মাস ধরে এটি ইউরোপীয়দের নিজস্ব স্বার্থ হিসেবে দেখা দিয়েছে।’

লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমান সাইয়্যেদ বলেন, নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে রক্ষা করার চাইতেও এখন ইসলাম-ভীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দরকার হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইউরোপে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ইসলাম ভীতিমূলক কার্যক্রম একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে আমি মনে করি এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। এটি শুধুমাত্র মুসলিম সমাজকে প্রতিরক্ষা দেয়ার জন্য নয় বরং একটি নিরাপদ বিশ্বের জন্যই এটি প্রয়োজনীয়।’

সূত্রঃ মিডেল ইস্ট আই।

Comment

Share.

Leave A Reply