স্বীকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি নয়

0

সৈয়দ শামছুল হুদা :: 

কওমী মাদ্রাসা সনদের রাষ্ট্রীয় মান ঘোষিত হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, যেভাবে হয়েছে এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বক্তব্য আছে। কথা আছে। এটা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। চলতে পারে। একটি শিক্ষাধারার এভাবে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন একটি নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি অনেকের কাছে স্পষ্টও নয়। সেহেতু এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের কাজ হলো- কওমী স্বীকৃতির বিষয়টি জনগণের কাছে পরিস্কার করা। আলেমদের চাওয়া-পাওয়া, রাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়া এবং তৃতীয় পক্ষের চাওয়া-পাওয়ার যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সেটাকে সামাল দেওয়া।

ইসলামী ঘরানার বহুল পরিচিত অনলাইন ম্যাগাজিন ইনসাফ২৪ডটকম এর উদ্যোগে এ বিষয়গুলো পরিস্কার করার জন্য বিভিন্ন ঘরানার লোকদের জড়ো করেছিলো হোটেল রাহমানিয়া ইন্টারন্যাশনালে। সেখানে যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে তার আলোকে এটা খুব পরিস্কার হয়েছে যে, স্বীকৃতি প্রয়োজন ছিল। এটা হয়েছে। এর জন্য বর্তমান সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ দেওয়াটাই ভদ্রতার পরিচয়। তবে এটা করতে গিয়ে যেন কেউ বাড়াবাড়ি করে না ফেলেন সে ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা উচিত। মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ সাহেব পরিস্কার বলেছেন, শুকরিয়া আদায়ের নামে আমরা যেভাবে মিছিল-মিটিং করছি এটা এক প্রকার অতিরঞ্জন।

আলোচকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছিলেন, কলেজের শিক্ষক ছিলেন, আলেম রাজনীতিবিদ ছিলেন, কওমী শিক্ষকরাও ছিলেন। সকলেই একমত যে, এই স্বীকৃতিটা প্রয়োজন ছিল। তবে যেভাবে এটা অর্জন হয়েছে, তা দিয়ে কতটুকু উপকৃত হওয়া যাবে, এই স্বীকৃতির ফলে সরকারের দায় কতটুকু বাড়লো, কওমী মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের দায় কতটুকু বাড়লো এসব বিষয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে। সমালোচনাবিহীন কওমী স্বীকৃতি কোনভাবেই আসতো না। যেভাবেই আসুক, কোন না কোন পক্ষ এর সমালোচনা করবেনই।

তবে আলোচনায় এ বিষয়টাও এসেছে যে, যেভাবে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে আইন আকারে কওমী সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে এর কোন নজির নেই। ভারত -পাকিস্তানেও নেই। সরাসরি মাননীয় এমপিদের কণ্ঠভোটে, আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বাংলাদেশেই প্রথম। এটা একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এখন কথা হলো, স্বীকৃতি যেভাবে এসেছে, যে সকল আইন ও বিধানের আলোকে এসেছে, তাতে স্বীকৃতির কারণে কওমী মাদ্রাসার ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা তেমন একটা নেই। তবে আমরা যদি অতি উৎসাহি হয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ডেকে না আনি।

অতি উৎসাহ দেখাতে গিয়ে কোন কোন মাদ্রাসার অযোগ্য মুহতামিম তার গদি টিকিয়ে রাখতে গিয়ে এমন সব কান্ড ঘটিয়ে বসবেন যা দেখে না পারা যাবে কিছু কইতে, না পারা যাবে সইতে। জনাব মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ বলেন- অতি উৎসাহি হয়ে অনেক অযোগ্য, অথর্ব কিছু মাওলানা খতমে বুখারীতে মহিলা অতিথিকে মঞ্চে নিয়ে আসেন। অথচ এটা করতে কেউ বাধ্য করে না। নানুপুর ও দারুল মাআরিফে যা হয়েছে তা অতি উৎসাহের ফল। যে এনজিওরা একসময় কওমী মাদ্রাসার ভয়ে তটস্থ থাকতো, সেই এনজিওরা এখন বড় বড় কওমী মাদ্রাসার হলরুমে নারী অতিথিদের প্রধান আসনে বসিয়ে বাদ্যসমেত সোনার বাংলা গান শুনে। এটা বড় আজিব ঘটনা। পরাজিত মানসিকতার মনোবৃত্তি।

কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতির শুকরিয়া আদায় করতে গিয়ে হাইয়াতুল উলয়াকে দিয়ে গণসংর্ধণার চিন্তা করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে যারা কাজ করছেন তারা অবচেতন মনে সরকারের খুব প্রিয় হতে চাচ্ছেন। কিছু বাগিয়ে নিতে চাচ্ছেন। দুুমুখো নীতি অবলম্বন করছেন। এটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেলেও আমি আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর কোন সিদ্ধান্ত, কোন মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করবো না। এমন কোন কথা বলবো না যা হুজুরের শানের খেলাফ হয়।

এটা সত্য যে, আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর কারণেই এভাবে নিঃশর্ত স্বীকৃতি মিলেছে। নতুবা এমন কোন মহারথি বাংলাদেশে বর্তমান নাই, যার আহবানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এভাবে স্বীকৃতি দিতেন। শেখ হাসিনা এক প্রকার দায়মুক্তি ভাবনা থেকে, আল্লামা আহমদ শফী একপ্রকার প্রাপ্য অধিকার চাওয়ার নীতি থেকে এটা গ্রহন করেছেন। অতীতে বড় বড় উলামায়ে কেরাম যেভাবে স্বীকৃতির জন্য কোরবানী করে গেছেন, সেটাকে পুর্ণাঙ্গ রূপ দিতে তিনি এই পথ মাড়িয়েছেন।

স্বীকৃতি নিয়ে অনেক অস্পষ্টতা আছে। সেটা কেটে উঠতে সময় লাগবে। কিন্তু যারা এই স্বীকৃতির বিরোধিতা করছেন তাদের যন্ত্রনা আমাদের কাছে বোধগম্য। আমরা বুঝি তাদের জ্বালাটা কোথায়। আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. বলেছেন, একসময় কওমী সন্তানেরা আলিয়া মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিতে যেতো, আগামীতে ইনশাআল্লাহ আলিয়া থেকে অনেক সন্তানরা কওমীতে পরীক্ষা দিতে আসবে। এটা বাস্তবতা।

স্বীকৃতি নিয়ে আমরা কোন প্রকার বিভ্রান্তির শিকার না হই। বাংলাদেশের আকাবিরতুল্য বড় বড় আলেমগণ সকলেই এই স্বীকৃতি চেয়ে গেছেন। আমার বিশ্বাস, মরহুম এবং বর্তমান মুরুব্বিগণ যেভাবে আশা করেছিলেন স্বীকৃতি সেভাবেই এসেছে। এখন বিতর্কের মুল বিষয়টা হলো হেফাজতের রক্তের ওপর দিয়ে এই স্বীকৃতি না কি অধিকার আদায়ের বিষয় থেকে এই স্বীকৃতি? যেভাবেই হোক স্বীকৃতি এসেছে। বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য হলো- কোন অধিকারই প্রচন্ড আন্দোলন ছাড়া হয় না। আল্লামা আজিজুল হক রহ.কে ৫দিন মুক্তাঙ্গনে পড়ে থাকতে হয়েছে। তারপরই বিএনপি জোট সরকার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তারা চূড়ান্ত করতে পারেনি। আওয়ামীলীগ পেরেছে। আমরা সবার কাছেই কৃতজ্ঞ।

Comment

Share.

Leave A Reply