মধ্যপ্রাচ্যের ক্রাউন প্রিন্সরা যেভাবে অত্যাচারী হয়ে ওঠে

0

আনসেল পেফফার : 

এটি একটি অনিবার্য বর্ণনা। স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী তরুণ এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের এই ব্যক্তি রাখঢাক না রেখেই তার আগমন জানান দিচ্ছেন। ক্ষমতা কখনো স্বেচ্ছায় আসে না এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের এই উত্তরাধিকারী কারো সাথে কোনোরূপ আলাপ আলোচনা ছাড়াই রাষ্ট্রীয় সকল কাজ নির্বাহ করতে চান।

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড এবং তার মরদেহকে টুকরো টুকরো করার যে বার্তা প্রকাশিত হয়েছে তা তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটের কার্যক্রমকে বহির্বিশ্বের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে দিয়েছে।

একই সাথে উপরোক্ত বর্ণনাটি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অভিযোগ অনুযায়ী যার লোকেরা খাসোগি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন। কিন্তু উপরের বর্ণনাটি সমানভাবে তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যারা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আসছেন।

এমনকি সিরিয়ার প্রাসাদে বসবাসকারী রাজপুত্র অপেক্ষারত এমন করেই অপেক্ষায় ছিলেন, কখন তিনি দামেস্ক এর ক্ষমতায় আসবেন, সে সময় তার বয়স ছিল ৩৪ বছর এবং তিনি তখন আমাদের বর্তমান রাজপুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানের চাইতে মাত্র এক বছরের বড় ছিলেন।

সিরিয়ার এই রাজপুত্র পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন অপথালমোলজি (ophthalmology) ডাক্তার যিনি লন্ডন থেকে ডাক্তারি পাশ করেছেন। বাশার আল আসাদ শুধুমাত্র একজন তরুণ এবং মধ্য-শরীরের ব্যক্তিই নন বরং তার রয়েছে অপরূপ সুন্দরী একজন স্ত্রী যাকে ফ্যাশন ম্যাগাজিন Vogue ‘মরুভূমির গোলাপ’ অভিধায় ভূষিত করেছিল।

কোনোভাবেই আসাদ জুনিয়রের শাসনামলের অত্যাচারগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, যাকে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ‘সংস্কারমনা’ বলে থাকে। একই সাথে তিনি বিশ্বের নেতাদের সমর্থন নিয়ে তার সুন্দরী স্ত্রী আসমাকে সাথে নিয়ে অন্তত ১১ বছর ধরে এমন শাসন পরিচালনা করেছিলেন যাতে করে সিরিয়ার বর্তমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভবপর ছিল না।

এমনকি সিরিয়ার মিলিয়ন মিলিয়ন নাগরিক যখন ক্রমাগত নিষ্পেষিত হচ্ছিল ঠিক তখনও কিছু পশ্চিমা দেশ বাসার আসাদকে বাঁচাতে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।

২০১৫ সালের নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সেক্রেটারি জন কেরি বলেছিলেন, বাসার আল আসাদ মূলত তার মাতা এবং ভাইদের দ্বারা বাধ্য হয়েই বিক্ষোভকারীদের উপর কঠোর নির্যাতন চালাচ্ছেন।

পশ্চিমা রাজনৈতিক এবং সাংবাদিকদের স্বৈর শাসকদের প্রতি সমর্থন জানানো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি মুদ্রা দোষ এবং তাদের সমর্থন পেয়ে যেকোনো স্বৈর শাসকরা তাদের পূর্বসূরি পিতার চাইতেও আরো বেশি আলোকিত হয়ে পড়েন।

তবে মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্যাতন তার পূর্বসূরিদের মত দ্রুতই বিস্তার লাভ করবে এটি বলা এখনো সমীচীন নয়। অথবা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আসাদ জুনিয়র যেমন কসাইয়ের মত মানুষ মেরে চলেছেন তা তার পূর্বসূরি পিতা হাফেজের তিন দশক ধরে চালানো নির্যাতনের চাইতে কম এমনটি বলা যাবে না।

কিন্তু উপরোল্লিখিত দুটো ক্ষেত্রই অত্যাচারের মাত্রা তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অতিমাত্রায় বিস্তার লাভ করবে এমন বিশ্বাসেরও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, গণ-হত্যাকারী স্বৈরশাসকগণও শেষ পর্যন্ত রক্ত-মাংসের মানুষ।

রাশিয়ার স্বৈরশাসক স্টালিন হলিউড ছায়াছবি দেখতে খুব পছন্দ করতেন আর জার্মানির হিটলার ছিলেন একজন নিরামিষ ভোজী অথবা উত্তর কোরিয়ার কিম জং ঊনের কিছু মুদ্রাদোষ তাদেরকে গণহত্যা থেকে বিরত রাখতে পারে নি।

কিন্তু উত্তর কোরিয়ার কিম এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম হতে পারেন। যিনি বর্তমান ক্রাউন প্রিন্সের মত নয়, যে কিনা তার পিতার মত পশ্চিমাদের সাথে কঠিন মিত্রতা বজায় রেখে চলেন। সৌদির বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যিনি এখনো ক্ষমতায় আসেন নি কিন্তু তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পুরোপুরি বা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছেন।

উপরে বর্ণিত বেশিরভাগ অঞ্চল বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত পশ্চিমা মদত পুষ্ট প্রিন্সগণ কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে কিন্তু শিক্ষিত হওয়া স্বত্বেও তাদের শাসন পদ্ধতিতে ভিন্নতর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বর্তমানে তছনছ করে দেয়ার যে ধারা শুরু হয়েছে তা মোহাম্মদ বিন সালমানের আবিষ্কার নয়। তিনি তার প্রতিবেশী পার্সিয়ান গালফের মডেল অনুসরণ করছেন, ঠিক যেভাবে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ সেখানকার সরকারকে প্রভাবিত করেছেন।

তাদের দুজনেই পশ্চিমা বিশ্বে তাদের দেশে স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রচারণা চালিয়ে আসছেন এবং একই সাথে পশ্চিমের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর সাথে বিভিন্ন চুক্তি করে আসছেন।

এসব গোষ্ঠীগুলো আরবদের টাকায় খুবই খুশি এবং তারা সেখানকার গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি সম্পর্কে কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করতে রাজি নন। একারণেই ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবগুলোতে কাতার এবং ইমিরেটসের বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

মাঝে মধ্যে চরম বাস্তবতা সবার সামনে উদ্ভাসিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে- ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্ব কাপের আয়োজনের নিমিত্তে দেশটিতে বিভিন্ন স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজে অংশ নিতে গিয়ে অতি অমানবিকভাবে শত শত এশিয়ান শ্রমিক তাদের নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।

একই সাথে সৌদি আরব যারা ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য দায়ী তাদেরকেও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের থেকে সমালোচনার তীর সইতে হয় এবং এই যুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অন্যতম মিত্র।

চলতি সপ্তাহে বার্তা সংস্থা Buzzfeed একটি প্রতিবেদনে জানায় যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনে যুদ্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে মারাত্মক অস্ত্র কিনে নিয়েছে।

অন্যদিকে, জর্ডানের ক্রাউন প্রিন্স কোনো রকম সংস্কার ছাড়াই পশ্চিমাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ এমনটি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তিনি তার পিতা কিং হুসেইনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছেন।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক বিপ্লবের যত কথাই জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ বলুন না কেন এর সবকিছুই ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতোমধ্যেই আবদুল্লাহ’র ২৪ বছর বয়সী জর্ডানের ক্রাউন প্রিন্স হুসেইন তার পিতার মতই একজন শাসক হবেন এমনটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

আরেকজন তরুণ রাজা যিনি ‘গণতন্ত্রের’ শো দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি হচ্ছেন মরক্কোর রাজা মোহাম্মদ-৬( VI)। ২০১১ সালের আরব বসন্তের প্রথম বছরে তিনি ‘সাংবিধানিক সংস্কার’ এর কথা বলেছিলেন এবং এজন্য তিনি একটি নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন যে নির্বাচনে ইসলাম পন্থীরা জয়ী হয়েছিল।

মোহাম্মদ-৬ এমনকি ক্ষমতা ভাগাভাগির কথা বলেছিলেন কিন্তু এখনো পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয় নি। যদি দেশটিতে সংঘাতপূর্ণ বিক্ষোভ চলমান থাকে এবং বিক্ষোভকারীরা মরক্কোকে ইউরোপের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে যতই চিৎকার করতে থাকুক না কেন সেখানে আদৌ কোনো কিছুর পরিবর্তন হবে না। কিন্তু মোহাম্মদ-৬ এত কিছুর পরেও একজন সংস্কারবাদী হিসেবে বাহবা পাচ্ছেন।

এমনকি এ অঞ্চলের পারিবারিক রাজনীতি মুক্ত দেশসমূহের মধ্যেও অব্যক্ত-ভাবে কিছু রাজনৈতিক পরিবার গড়ে উঠেছে। লেবাননের সাদ হারিরি যিনি নিহত রাফিকির সন্তান, তিনি হয়ত খাসোগির মত গুপ্ত হত্যা এড়াতে পেরেছেন কিন্তু তিনি লেবাননের নাম মাত্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কর্মরত আছেন।

গত পাঁচ মাস পূর্বে লেবাননের নির্বাচনে জয়ী হওয়া কোয়ালিশনে তার কোনো ভূমিকাই নেই এবং তিনি তার দেশের লেবানিজ হিজবুল্লাহ দ্বারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হন। এত কিছু সত্বেও গণমাধ্যমগুলো তাকে ‘লেবাননের ভবিষ্যৎ’ রূপে আখ্যায়িত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার ক্রাউন প্রিন্সেস ইভানকা এবং ক্রাউন প্রিন্স জেরাডের কার্যকলাপের জন্য দায়ী করা যুক্তিযুক্ত হবে যারা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘স্বীকৃতি দাতা’ হিসেবে কাজ করছেন।

কিন্তু এ সকল পশ্চিমা উত্তরাধিকারীগণ একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির নেতা হিসেবে পরিচিতি পেতে সক্ষম হয়েছেন। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংস্কারের মিথ(ধোঁয়াশা) কে জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন এবং তা খুবই কার্যকরী হয়েছে।

আপনি হয়তো বেরাত আলবাইরাক সম্পর্কে এমনটি বলতে চাইবেন, ৪০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি তুরস্কের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের জামাতা। আপনি কি কখনো শুনেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কলেজ থেকে এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করেছেন?

আসাদ অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ইরান এবং রাশিয়ার সমর্থনে তার কৃত যুদ্ধাপরাধ এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছেন। মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য সময় ঘনিয়ে আসছে এবং খাসোগি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে পশ্চিমারা তার বিরুদ্ধে তাদের চিরাচরিত নিয়ম মেনে কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।

কিন্তু কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে এই রাজত্বের সাথে সংঘাতে জড়াতে চাইবে না, যারা ইচ্ছা করলে আগামী কাল প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য হবে ৪০০ ডলার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অথবা আরো তাড়াতাড়িই ক্রাউন প্রিন্স মনোযোগ দিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার কলামগুলো অধ্যয়ন করবেন এবং তিনি খুব শীঘ্রই তার সীমাবদ্ধতা টের পাবেন।

সূত্রঃ হারের্টজে ডট কমে প্রকাশিত সাংবাদিক আনসেল পেফফার এর কলাম থেকে।

Comment

Share.

Leave A Reply