প্রিন্সিপাল এবং শায়খুল হাদিস দয়ামিরি রাহ. : যে ইতিহাস এই প্রজন্ম জানে না!

0

রশীদ জামীল :

সিলেটের অনেক আলেমের সাথে প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল না-এটি সবাই জানেন। কিন্তু সেই সময়ও ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কতটা গাঢ় ছিল, সেই ব্যাপারটি বাইরের কাউকে জানতে দেওয়া হত না। গতদিন শায়খে কৌড়িয়ার একটা উদাহরণ টানা হয়েছিল। আজ আরেকটি নাম সামনে নিয়ে আসি। তিনি হলেন শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল আজিজ দয়ামিরি রাহিমাহুল্লাহ।

মদিনাতুল উলুম দারুস সালাম মাদরাসা খাসদবির সিলেট-এর মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস ছিলেন মাওলানা আব্দুল আজিজ দয়ামিরি। দয়ামিরির রাগ ছিল অনেক ফেমাস। উদাহরণ দেওয়ার মতো। আমরা অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারতাম না ইলমে হাদিসে তাঁর পাণ্ডিত্য বেশি, নাকি রাগ বেশি, কোনটার পরিমাণ বেশি।

সিলেটের সর্বমহলে জানত, দয়ামিরি প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানকে পছন্দ করেন না। পছন্দ তো পরের কথা, ঠিকটাক মুসলমানই মনে করেন না তাঁকে। শিয়া ভাবেন। অথচ যে কথাটি এই প্রজন্মকে জানতে দেওয়া হয় না, তা হল, বাইরে যখন দয়ামিরি এবং প্রিন্সিপালের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্কের কথা ফলাও ছিল, তখন দয়ামিরি হুজুর ছিলেন প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানের জামেয়ায় ভিজিটিং শায়খুল হাদিস।

২। কিছু লোক, যাদের কথা আগেই বলা হয়েছিল, প্রতিক্রিয়াশীল সেই গোষ্ঠী প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে বলে বলে তাঁর কান দুটো ভারি করে তুললেন… হাবীবুর রহমান পুরোটাই শিয়া হয়ে গেছে! এই লোক থেকে গুনে গুনে একশ’ হাত দূরে থাকা দরকার। এইলোকের কাছে যাওয়া যাবে না। কাছে আসতে দেওয়াও ঠিক হবে না।

কিন্তু তাঁরা তো আর জানত না তাদের দৌড়ঝাপ যেখানে গিয়ে শেষ, প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান তারপর থেকে শুরুই করতেন। প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কী কী; সেটা তাঁরা আন্দাজ করতে পারেননি। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিই। হাড়ির সব ভাত একটা একটা করে টিপে দেখতে হয় না। এক-দুইটায় টিপ দিলেই পুরো হাড়ির অবস্থা বোঝা যায়।

প্রিন্সিপাল সাহেবের দুই বিশ্বস্থ সহযাত্রী ছিলেন জামেয়া মাদানিয়ার শিক্ষাসচিব আমার উস্তাদ মাওলানা নেজাম উদ্দিন রাহিমাহুল্লাহ এবং সিনিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুস সালাম জুড়ি দামাত বারাকাতুহুম। মাওলানা নেজাম উদ্দিন সাহেবকে আল্লাহপাক ইতোমধ্যেই ডেকে নিয়ে গেছেন। হুজুর জীবিত থাকতে অনেক রাত ভোর হত হুজুরের কাছ থেকে পুরনো দিনের গল্প শুনে শুনে।

৩।  জুড়ির হুজুর (মাওলানা আব্দুস সালাম) এখন স্বপরিবারে আমেরিকায় থাকেন, মিশিগান স্টেইটে। গেল ঈদ উল আজহার সপ্তাহখানেক আগে হবে, ফোন করে বললেন,
-বাবা কেমন আছো?
-ভালো আছি হুজুর।
-তোমার সাথে আমার কাজ আছে। বসা দরকার।
আমি বললাম, আমি কি মিশিগান চলে আসব?
তিনি বললেন, তোমার আসার দরকার নেই। আমিই নিউইয়র্ক আসছি। আমার আরো কাজ আছে নিউইয়র্ক। দুই তিনদিন তোমাকে নিয়ে বসব। ফ্রি থেকো। আমি একটা কিতাব লিখেছি। বাংলাতে। সেটা নিয়ে তোমার সাথে বসা দরকার।

আমি বললাম, আপনাকে কষ্ট করার দরকার নাই হুজুর। কবে আসতে হবে বলুন। আমিই চলে আসব দুই তিনদিনের জন্য।
বললেন, বললাম তো, আমিই আসছি। তুমি আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে এসে নিয়ে যেও।

২৪ আগস্ট শুক্রবার নিউইয়র্ক চলে আসলেন তিনি। আমি গিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসলাম। তিনদিন থাকলেন। এশার পর বসা হত, ফজর হয়ে যেত কথা বলে বলে। সাথে থাকতেন শায়খ রফিক আহমদ রেফাহি। ফোনে খোঁজ নিতেন শায়খ আহমদ আবু সুফিয়ান। একদিন এসে সারাদিন এবং অর্ধরাত কাটিয়ে গেলেন হামিদুর রহমান আশরাফি।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি একটু খুঁচা দিতাম তাঁকে। খুঁচা মানে পেছনের কথা একটু মনে করিয়ে দেওয়া। এভাবেই হুজুরের স্মৃতিকে একরাতে নিয়ে গেলাম দয়ামিরির কাছে। বললাম, আচ্ছা হুজুর! দয়ামিরির সাথে প্রিন্সিপাল সাহেবের সমস্যাটা কী ছিল? তারপরেও আবার দয়ামিরি কীভাবে জামেয়ায় শায়খুল হাদিস হয়ে চলে আসলেন? কীভাবে সম্ভব হয়েছিল সেটা? আমরা তো তখন জামেয়ার ছিলাম না। তাই একটু আধটু জানি। আপনার কাছ থেকে চাক্ষুস খবরটা জানতে চাই। কারণ, আপনার একটা মূখ্য ভূমিকা ছিল দয়ামিরি হুজুরকে জামেয়ার মসনদে নিয়ে আসার পেছনে।

তিনি বলা শুরু করলেন। সামনে কফির মগ। আমি এবং আসসাফার শায়খ তন্ময় হয়ে শুনে যাচ্ছি। তিনি বলে যাচ্ছেন…

প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছ থেকে মিস্টির টাকা নিয়ে আমি এবং নাজিম সাব (মাওলানা নেজাম উদ্দিন) কয়েক জাতের মিস্টি এবং কয়েক রকমের ফলমুল নিয়ে আচমকা গিয়ে হাজির হলাম দয়ামিরির অফিসে। আমরা যাওয়ার আগে কোনো যোগাযোগ করে গেলাম না। তখন অবস্থা এতই ঘোলাটে করে ফেলা হয়েছিল যে, আগে ফোন করে গেলে হয়ত দেখাই করা যেত না। তাই ফোনটন না করে সোজা গিয়ে হাজির হলাম।

হঠাৎ আমাদেরকে দেখে দয়ামিরি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। বাহ্যিক সৌজন্যতার খাতিরে হলেও চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমাদের পেয়ে খুব খুশি এজহার করার চেষ্টা করলেন। কিছু বুঝলেও আমাদেরকে বুঝতে দিলেন না। আফটার অল, দয়ামিরি তো!

চা নাস্তার পর কথা শুরু করলাম আমি। বেশি ভূমিকা-টুমিকায় না গিয়ে সরাসরি মূল পয়েন্টে চলে আসলাম। বললাম, আজ আপনার কাছ থেকে কিছু শুনতে আসিনি। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বলতে এসেছি। আজ আমরা বলব, আপনি শুনবেন। আমরা চলে যাব। তারপর আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নেবেন। কথাহল,…

জামেয়ার দাওরায়ে হাদিসের ছাত্ররা আপনার কাছে বোখারির দারস নিতে চায়। আপনি ছাড়া আর কারো কাছেই তারা পড়বে না। তাদের এক কথা, আমরা দয়ামিরির কাছ থেকে হাদিসের সনদ নিতে চাই। আবার তারা কাজিরবাজারের মায়াও ছাড়তে পারছে না। এখন আমরা কোনো বিকল্প উপায় না দেখে আপনার কাছে আসলাম।

থামলেন তিনি। মূল কথাটি বলা হয়েগেছে। এখন ফিনিশিং দিতে হবে। নাজিম সাহেবের দিকে তাকালেন। এরমানে, আমার কাজ শেষ। এবার আপনার পালা।

৫। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন প্রিন্সিপাল বলতে প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমানকেই বোঝাত। সেই সময় আলেম-উলামাকে বলতে শুনতাম সিলেটে নাজিম দুইজনই আছেন। একজন আঙ্গুরার নাজিম মাওলানা জিয়া উদ্দিন, অন্যজন কাজিরবাজারের নাজিম মাওলানা নেজাম উদ্দিন। দু’জনের যোগ্যতা এবং প্রখরতা উদাহরণ হিশেবে উল্লেখ করা হত।

মাওলানা নেজাম উদ্দিন সাহেব আবার দয়ামিরি হুজুরের ছাত্র ছিলেন। এখনও আমরা ছাত্র উস্তাদ দেখি। তাঁরাও ছাত্র উস্তাদ ছিলেন। কিন্তু আমরা দেখতাম মাওলানা নেজাম উদ্দিন কাজিরবাজারের মত একটা জামেয়ার শিক্ষা সচিব এবং শায়খুল হাদিস হওয়ার পরও দয়ামিরির সামনে হাঁটুগেড়ে বসে থাকতেন। দেখলে মনে হত মক্তবের কোনো ছাত্র বুঝি তাঁর উস্তাদের সামনে বসে আছে। ঠিক যেমনটি দয়ামিরি বসতেন তাঁর উস্তাদ গহরপুরির সামনে।

আজকালকের ছাত্ররা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তো, তাই ফেইসবুকে তাদের উস্তাদকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। উস্তাদের লেখার নিচে এসে পাকনা পাকনা কমেন্ট করে, জ্ঞান দেয়। যদিও এখনও ডাটা ইউজ করা শিখতে পারেনি। এখনও বলে, আমার এমবি শেষ! অবশ্য এসব ক্ষেত্রে উস্তাদগণের ভূমিকাও কম না।

৬। মাওলানা নেজাম উদ্দিন শুরু হলেন। ‘কথা যা বলার, তাতো জুড়ির সাব বলেই ফেলেছেন। তাই আমি আর কথা বলে হজুরের সময় নষ্ট করতে চাই না_’ বলেই তিনি তাঁর চিরাচরিত কৌশলি পথ অবলম্ভন করলেন। বললেন, ‘আমরা চলে যাচ্ছি হুজুর। দোয়ার দরখাস্ত_’ বলে উঠে দাঁড়ালেন। বেরিয়ে আসার আগ মুহূর্তে বললেন,

‘আগামীকাল বাদ মাগরিব হুজুরের দরোজার সামনের রিক্সা খাড়া থাকবে। আর কাজিরবাজারে ছাত্ররা বসা থাকবে তাদের দরসে। এখন হুজুর আসবেন কি আসবেন না, সেটা হুজুরের মর্জি… চলেন জুড়ির সাব’।

মাওলানা আব্দুস সালাম সাহেব বেরিয়ে আসতে আসতে বললেন, ‘হযরত যদি আসেন, তাহলে ছাত্ররা মুস্তাফিজ হবে। আর যদি না আসেন, আর এ জন্য যদি কোনো ছাত্র ইলমে হাদিস থেকে বঞ্চিত হয়, কিয়ামতের দিন যদি হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রশ্ন করেন, ছাত্ররা কেন আমার হাদিস পড়া থেকে মাহরুম হল, তখন আমরা বলব, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা চেষ্টা করেছিলাম। বাকি নবীজির সামনে আপনি কী জবাব দেবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।

মুসাফাহা করে বেরিয়ে এলেন তাঁরা। আর পরেরদিন শায়খুল হাদিস দয়ামিরি যথারীতি কাজিরবাজার মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের মসনদে, শায়খুল হাদিস হিশেবে…।

অবশ্য বেশিদিন দয়ামিরিকে কাজিরবাজার থাকতে দেয়নি সেই ভালো মানুষের দল। লেগে রয়েছিল তারা হুজুরের পেছনে…. আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন।

Comment

Share.

Leave A Reply