‘খান ছাব! ইয়েহ্ ধোকাবাজী নাহী তো কেয়া হ্যায়’

0

ইমদাদুল হক নোমানী ::

১৯৬৬ সাল। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচন। সম্মুখস্থ আসনেই তশরিফ রাখেন আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহ.। বৈঠকে বিশিষ্ট মন্ত্রীরাও উপস্থিত।

প্রেসিডেন্ট সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘‘আশা করি সমাগত নির্বাচনে আপনারা আমার প্রতি সমর্থন জানাবেন’’। নির্ভীক মোজাহিদ আল্লামা ফরিদপুরী তখন আলফেসানীর নৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে সরাসরি তাঁর মুখের উপর জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘‘আপনি দীর্ঘ শাসনামলে পাকিস্তান তথা ইসলামের উন্নতিকল্পে এমন কি কাজ করেছেন, যদ্দরুন আলেম সমাজ আপনাকে সমর্থন করতে পারে?’’

আইয়ুব খান বললেন, ‘‘আমি বহু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। স্কুলের অষ্টম শ্রেণী থেকে ইসলামিয়াত ও আরবী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। মাদরাসার ফাজেল পাসের পর আইএ ভর্তি হবার সুযোগ দিয়েছি।’’ জবাবে আল্লামা ফরিদপুরী বললেন, আপনি ইসলামিয়াত শিক্ষা হ্রাস করে দিয়েছেন। ইসলাম বিরোধী শিক্ষা-সংস্কৃতি বাড়িয়ে দিয়েছেন। ইংরেজ আমলে স্কুলে এর চাইতেও বেশি আরবী ছিল। ইসলামিয়াত ও আরবীকে আপনি ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করেছেন। ইসলামবিরোধী সহশিক্ষা চালু করেছেন। নাচ, গান ছাত্রছাত্রীদের জন্যে জরুরি বিষয় হিসেবে গণ্য করেছেন। কুরআন বিরোধী ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’’ পাস করেছেন। শরীয়ত বিরোধী “পরিবার-পরিকল্পনা আইন” পাস করে ব্যভিচারের পথ উন্মুক্ত করেছেন। আপনার আমলে নগ্ন ছবি, অশ্লীল গান ইত্যাদির অধিক উন্নতি ঘটেছে। সুতরাং আপনি কোনরকম সমর্থন পেতে পারেন না।

আইয়ুব খান জানালেন, ‘‘যাই হোক আপনি আমাকে সমর্থন না করুন কিন্তু বিরোধিতা করবেন না। চুপ থাকবেন।’’ আল্লামা ফরিদপুরী তখন উত্তর দিলেন, ‘‘আমি আমার দায়িত্ব পালন করেই যাব।’’ অতঃপর এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হতে হতে বিষয়টি রীতিমতো এক তিক্ত বাকযুদ্ধে পরিণত হলো।

প্রেসিডেন্ট এক পর্যায়ে রাগের মাথায় বলে বসলেন, ‘‘দেখিয়ে মাওলানা আপনে কো সাম্ভালকে বাত কিজিয়ে, মাই পাঠান কা বাচ্চা পাঠান হোঁ।’’ আল্লামা ফরিদপুরী তখন মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন, “দেখিয়ে খানসাব, আপ আগার পাঠান কা বাচ্চা পাঠান হ্যাঁ, তো মাইভী মুসলমানকা বাচ্চা মুসলমান হোঁ। আল্লাহ্ কে সিওয়া মাঁই কেসীকো নাহী ডারতা হোঁ। আপহী বাতাইয়ে, ইয়েহ্ ধোকাবাজী নাহী তো কেয়া হ্যা?’’

আইয়ুবের সাথে আল্লামা ফরিদপুরীর এ বাকবিতন্তা চলাকালে সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন, সকলেই অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, এমন একজন পরাক্রমশালী সামরিক অধিনায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধানকে তারই মন্ত্রিবর্গ ও উচ্চ সরকারি কর্মচারীদের সামনে এরূপ সরাসরি তীব্র সমালোচনা শাস্তিরও কারণ হতে পারতো। কেননা, সেটা ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন। চতুর্দিক সেনাবাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত এ পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসার সময় মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী বলে আসলেন, ‘এখানে বসে কথা বলা ঈমানের ক্ষতি ছাড়া কিছু নয়, চলুন আমরা বের হয়ে যাই।’

Comment

Share.

Leave A Reply