আবেগ দিয়ে আল্লাহ মিলে না

0
রশীদ জামীল ::

জাহান্নামে উদ্বোধনী ভাষণ দেবে শয়তান। মানুষ যখন তাকে দোষারোপ করবে, সে তখন বলবে… শয়তানের ভাষণে পরে আসি। আগে শয়তানিয়াত নিয়ে কথা হোক।

একজন প্রত্যক্ষভোগী ছাত্রের জবানিতে শুনলাম টঙ্গিতে নাকি মাদরাসা ছাত্রদের ধরে ধরে পেটাচ্ছিলো আর বলছিলো, বল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সা’দ ওয়ালিয়াল্লাহ’। ব্যাপারটি যদি সত্যি হয়, তাহলে এটিকে নিছক আকিদাগত গোমরাহির পর্যায়ে গন্য করার অবকা নেই। ব্যাপারটি নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবা দরকার। নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদাররা যুগে যুগে এভাবেই মাথাছাড়া দিয়ে ওঠেছে। ওরা যেভাবে কালিমার অনুস্মরণে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সা’দ ওয়ালিয়াল্লাহ’ বলতে এবং বলাতে শুরু করেছে, তাতে সন্দেহ করবার যথেষ্ট কারণ আছে কাদিয়ানিয়াতের মতো নতুন একটি সা’দিয়ানিয়াতের জন্ম হয় কিনা। কিছুদিনের মধ্যেই মাওলানা সা’দ নিজেকে নবী হিশেবে ঘোষণা দিয়ে বসেন কিনা!

দুই
টঙ্গিতে সা’দপন্থিদের মূল আক্রোশ ছিল আলেম-উলামা এবং মাদরাসা ছাত্রদের উপর। বিশেষত মাদরাসা ছাত্রদের খুঁজে খুঁজে ঝাপিয়ে পড়েছিল পাগলা কুকুরের মতো। এরা হঠাৎ করে উলামাবিদ্বেষী হয়ে ওঠার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, আমরা জানি না, তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। তাদের গুরু সা’দ সাহেবের গোমরাহির প্রশ্নে সারা বিশ্বের উলামায়ে কেরাম একমত। একজন আলেমও তাকে সার্টিফাই করছেন না। একজন আলেমও বলছেন না, তিনি তার জায়গায় ঠিকই আছেন এবং যা বলেছেন ঠিকই বলেছেন। এর কারণ, কোনো নবী ভুল করতে পারেন- এই আকিদা কোনো বড় বুযুর্গ তো কী, একজন আলিম তো কী, কোনো সাধারণ মুসলমানেরও থাকতে পারে না। নবীগণের ভুল করা মানে আল্লাহর সিলেকশনে ভুল ছিল। কোনো নবীই তো ইলেকশনের মাধ্যমে নবী হননি। সুতরাং নবীগণের মধ্যে কেউ কোনো ভুলভ্রান্থি করেছেন- এই আকিদা একমাত্র শয়তানই রাখতে পারে, অথবা শয়তানের কোনো খলিফা।

আলিম-উলামা এবং মাদরাসা ছাত্রদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার একটাই কারণ হল, কারণ সেটাই, উপমহাদেশ কব্জা করবার আগে ইংরেজরা যে কারণটি ফিগার আউট করেছিল। উপমহাদেশ দখলে নিয়ে আসার জন্য মুসলমানদের মুসলমানদের ঈমানি স্পিরিট খতম করে দিতে হবে। এ জন্য দুইটা কাজ করা লাগবে।
১. কোরআন ধ্বংস করে দেওয়া।
২. উলামায়ে কেরামকে খতম করা।
শয়তান এবং শয়তানের দোসররা সব সময়ই উলামায়ে কেরামকে তাদের দুশমন ভাবে। কারণ, উলামায়ে কেরাম দ্বীনের পাহারাদের ভূমিকা পালন করেন। এটাই একমাত্র কারণ। এছাড়া আর কোনো কারণ নাই।

তিন
‘নবীগণ ভুল করেছেন’- এমন আকিদা কোনো মুসলমানের হতে পারে না। সা’দ সাহেব সেই আকিদা পোষণ করেন। আমি তাকে অমুসলিম ফতওয়া দিচ্ছি না। আমি ফতওয়া দেওয়ার কে! ফতওয়া দেওয়ার দরকার হলে বিজ্ঞ মুফতিগণ আছেন।

মাওলানা সা’দের এই আকিদার সাথে কোনো আলেমেরই একমত হওয়ার কোনো কারণ নাই। কেউ একমতও হননি। সুতরাং কথা পরিষ্কার, আলেম নামধারী কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যদি মাওলানা সা’দের এই গোমরাহির পক্ষে দাঁড়ান, তাকে ডিফেন্স করবার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে আমরা সা’দানিয়্যাতের দোসরই বলব। আমরা তাদেরকে আলেম ভাবব ঠিক, তবে ক্যাটাগরি হবে শয়তানের সিলেবাসভুক্ত। শয়তান কোনো ছোট আলেম ছিল না। অযুত-কোটি আলিমের ইলম এক জায়গায় জমা করলে শয়তানের ইলম তারচেও বেশি হবার কথা। অথচ একজন আলিমকে কিয়ামতের দিন আল্লাহপাক ৪০ থেকে ৭০ জন জাহান্নামীকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দেবেন। আর শয়তান নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের সবচে কঠিন স্থানে।

চার
শয়তান এতবড় আবিদ ছিল। এত ইবাদত করল আল্লাহর। তারপরেও কেন তাকে লা’নতের মালা গলায় পরতে হয়েছিল?

কারণ, সে একজন নবীকে অপমাণ করেছিল। সে আদম আলাইহিস সালামকে সম্মান জানাতে রাজি হয়নি। যে কারণে, হাজার বছর আল্লাহকে সেজদা করা সত্তেও আল্লাহর একজন নবীকে একটা সেজদা না করার কারণে চিরদিনের জন্য তাকে অভিশপ্ত হতে হয়েছিল।

‘আল্লাহর নবী হযরত মুসা আলাইহিস সালাম ভুল করেছিলেন’- এমন আকিদাই লালন করেন মাওলানা সা’দ। তারমানে তিনি বিশ্বাস করেন আল্লাহর সিলেকশনে ভুল ছিল। তারমানে আল্লাহ ভুল করেছিলেন। তারপরেও যদি, আলেম নামধারী কেউ যদি সা’দ সাহেবের পক্ষে অবস্থান নেন, তাহলে তাদেরকে জাহান্নামের উদ্ভোধনি ভাষণটির কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না।

জাহান্নামে উদ্বোধনী ভাষণ দেবে শয়তান। সেদিন তারা যখন শয়তানকে দোষারোপ করবেন, জাহান্নামীরা যখন শয়তানকে দোষারোপ করবে, সে তখন বলবে, আমাকে দোষারোপ করে লাভ নাই, নিজেকে দোষারোপ করো। ফালা তালূমূনীলুমূনী, ওয়া লূমূ আনফুসাকুম।

সুতরাং, আপনারা যারা, অথবা কেউ যদি থাকেন, মনেমনে হলেও সা’দ সাহেবের সা’দানিয়াতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, সিদ্ধান্ত নিন আল্লাহর নবীগণের ইজ্জতের পক্ষে থাকবেন, নাকি সা’দানিয়াতের?

পাঁচ
এক তারিখ টঙ্গিতে তথাকথিত তাবলিগি জাহিলে মুরাক্কাবরা যে পৈশাচিক মাতলামোতে উন্মাতাল হয়েছিল, সেটার উদাহরণ শুধু আইয়ামে জাহিলিয়াতেই খুঁজে পাওয়া যায়।

সা’দ পন্থি তথাকথিত তাবলিগিরা এখনো বিভিন্ন মাদরাসায় চোরাগুপ্তা হামলা চালাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই অবস্থায় উলামায়ে কেরামকে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি সচেতনতা এবং দূরদর্শিতার প্রমাণ দিতে হবে। মাইক্রোফোনে নয়, মাঠ গরম করা বক্তৃতা দিয়ে নয়, মাঠের কাজ দিয়ে মাঠ জয় করতে হবে। কাজ দিয়েই কাজের প্রমাণ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে সাধারণ মুসলমান আর আলেম-উলামার জন্য নসিহতের ভাষা সমান হলে হয় না। আলেম-উলামা দলিল বুঝেন। আওয়াম বুঝে যুক্তি। তাদেরকে তাদের মতোই বোঝাতে হবে। আপাতত দুইটা কর্মসূচি নিয়ে আগানো যায়।

১. ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং আবেগতাড়িত না হয়ে সর্বোচ্চ ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা।
২. যেহেতু বাংলাদেশে এমন কোনো এলাকা নাই, যেখানে কোনো মাদরাসা নাই। অতএব, মাদরাসার নেজাম ঠিকটাক রেখে উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ শুরু করা। সময় কম দেওয়া গেলেও সময়টাকে সময়মত এবং নিয়মিত করা।

মনে রাখতে হবে,
আবেগ দিয়ে আল্লাহ পাওয়া যায় না, আমল করা লাগে।

Comment

Share.

Leave A Reply