শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

0
মহিউদ্দীন কাসেমী ::

মুজাদ্দিদে আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দি রহ. এর দুজন সহপাঠীর নাম হল নওয়াব সাদুল্লাহ খান এবং উস্তাদ আহমদ মা’মার। প্রথমজন ছিলেন পৃথিবীখ্যাত মোঘল সাম্রাজ্যের সফলতম প্রধানমন্ত্রী, দ্বিতীয়জন ছিলেন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি অর্থাৎ তাজমহলের নির্মাতা–স্থপতি। এই তিনজন একই শিক্ষাব্যবস্থার সৃষ্টি। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে একজন হলেন পৃথিবীখ্যাত আলেম, আরেকজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ অপরজন ইতিহাসখ্যাত প্রকৌশলী। এটাই ইসলামের সোনালি যুগের শিক্ষার একটি মডেল।

বাংলাদেশে প্রধানত তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। এটা নির্ঘাত অভিশাপ। অবশ্য ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রহমতও বটে। আমাদের দেশের সব কওমি মাদরাসা দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসারী। দেওবন্দের কারিকুলামের সাথে মিল রেখে গড়ে উঠেছে এসব মাদরাসা। যদিও বর্তমানে দেওবন্দের কারিকুলামের সাথে এ দেশের মাদরাসাগুলোর বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেওবন্দ কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছে; কিন্তু আমরা রয়ে গেছি সেই আগের জমানাতেই।
ভারত উপমহাদেশে দুশ বছর ইংরেজদের শাসন ছিল। আটশ বছরের মুসলিম শাসনামলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে নিজেদের মতো শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেয় এদেশের মুসলমানদের ওপর। ইংরেজরা মুসলমানদের সব কৃষ্টি-কালচার, তাহজীব-তামাদ্দুন ধ্বংস করে দেয়। কোনঠাসা হয়ে পড়ে মুসলমানরা। শক্তি-সামর্থ্য ফুরিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, জানাযা পড়ানোর মতো মৌলিক ইসলামী শিক্ষার লোকও পাওয়া যেত না। তখন বিখ্যাত কয়েকজন আলেম ও দীনদরদি লোকজন একত্রিত হয়ে দেওবন্দে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল, অন্তত ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু লোক তৈরি হোক।
বুঝতে হবে, এটি ছিল একটি অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠাতাগণ এ উদ্যোগ গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন। এটি একটি সাময়িক প্রয়োজন ছিল। যা হবে অস্থায়ী। পরে অবস্থার পরিবর্তন হলে হাজার বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে। সহজভাবে বোঝা যায় :
ইংরেজদের আগমনের পূর্বে ভারতে কোন্ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল?
মুসলিম স্পেনে কোন্ শিক্ষাকারিকুলাম ছিল?
উমাইয়া, আব্বাসী, ফাতেমী, আইয়ুবী, তুর্কিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন খেলাফতযুগে কোন্ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল? সর্বোপরি রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে কী শিক্ষা ছিল? এগুলোর সাথে দেওবন্দের শিক্ষার মিল কতটুকু রয়েছে? আমরা কি কেবল দেওবন্দের শিক্ষা অনুসরণ করব, নাকি উপরের সবগুলো শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করব?
আমাদের দেশ তো পরাধীন না। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। আমরা কেন সাময়িক শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করব? আমরা একটি স্থায়ী, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার অনুসরণ করব, যা পূর্ণাঙ্গ ইসলামের দিক-নির্দেশনা দেয়। যে শিক্ষাব্যবস্থা মসজিদের ইমামতির সাথে সাথে ইমামতে কুবরা বা প্রশাসন চালানোর দক্ষতাও সৃষ্টি করে। অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা ভারতে চললেও আমাদের দেশে চলতে পারে না। আমাদের দুর্বলতার কারণেই আজও এ দেশে ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে।
আমার কথাগুলো শুনে কারও চোখ কপালে উঠছে হয়তো! দেওবন্দের ছাত্র হয়েও কিভাবে এমন মন্তব্য করছে?! মাওলানা তাকি উসমানি সাহেবের ভাষায় বাকিটুকু শুনুন। একটি ভাষণে তিনি বলেন :
“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারতবর্ষে বড় বড় তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত ছিল :
এক. দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থা।
দুই. মুসলিম ইউনিভার্সিটি আলীগড়ের শিক্ষাব্যবস্থা।
তিন. দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামার শিক্ষাব্যবস্থা।
আমার শ্রদ্ধেয় পিতা প্রায় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে বলেছিলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সরকারিভাবে এদেশে না আলীগড়ের শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন, না নদওয়াতুল ওলামার শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন, না দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন। বরং সরকারিভাবে আমাদের এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন যা আমাদের পূর্বসূরিদের শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতার সাথে যুক্ত। আমার একথা শুনে আপনারা হয়তো অবাক হবেন যে, দারুল উলুম দেওবন্দের মুফতি আজম এবং দারুল উলুম দেওবন্দের এক কৃতিসন্তান ও বরপুত্র বলছেন, পাকিস্তানে এখন আর দেওবন্দের শিক্ষাকারিকুলামের প্রয়োজনীয়তা নেই বরং আমাদের নতুন একটি শিক্ষা-করিকুলামের প্রয়োজন।
আমার শ্রদ্ধেয় পিতা যে কথা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গভীর ও সূ²দর্শী কথা। তা না বুঝার কারণে আমাদের অনেকে ভুল ঝোবুঝির শিকার হয়েছেন। এ তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা যা ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল সেগুলো মূলত ইংরেজদের ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার পাল্টা ব্যবস্থা ছিল। নতুবা আপনি যদি এর পূর্বের মুসলিম বিশ্বের হাজার বছরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা ও চিন্তা ভাবনা করেন, তাহলে তাতে মাদরাসা ও স্কুলের পার্থক্য দেখতে পাবেন না। সেখানে ইসলামের শুরু থেকে নিয়ে আধুনিককাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে মাদরাসা ও জামেয়াসমূহে একই সময়ে ধর্মীয় শিক্ষাও দেয়া হতো এবং সাথে সাথে যুগোপযুগী দুনিয়াবি শিক্ষাও ছিল। ধর্মীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ আলেম হওয়া তো প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ফরজে আইন নয়, বরং ফরজে কেফায়া। কোনো এলাকা বা দেশে যদি প্রয়োজন পরিমাণ আলেম হয়ে যায় তাহলে সংশিষ্ট এলাকার সবার পক্ষ থেকে এ ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। তবে দীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজে আইন। পূর্বকালে প্রতিষ্ঠিত সকল মাদরাসায় ফরজে আইন পরিমাণ ইলমের শিক্ষা প্রত্যেককেই দেওয়া হতো। তবে যে ইলমে দীনের বিশেষজ্ঞ হতে চাইত তার জন্য সে সুযোগ ছিলো আর যে যুগোপযুগী আধুনিক জ্ঞানে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে চাইত তার জন্য তা অর্জন করারও ব্যবস্থা ছিল। আমি কয়েক বছর আগে মরক্কোতে গিয়েছিলাম। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই হজরত মাওলানা মুফতি রফী উসমানী সাহেব দা. বা. গত বছর মরক্কোতে গিয়েছিলেন। মরক্কোর একটি শহরের নাম হলো ‘ফাস’। আমি গতবছর এ শহরে গিয়েছিলাম। আমার বড় ভাই এবছর সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে জামেয়াতুল কারউইন নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আমরা যদি ইসলামি ইতিহাসের প্রসিদ্ধ জামেয়াসমূহের অনুসন্ধান করি তাহলে আমরা প্রসিদ্ধ চারটি জামেয়ার সন্ধান পাই। সর্বপ্রথমটি হলো এ জামেয়াতুল কারউইন। দ্বিতীয়টি হলো তিউনিসিয়ার জামিআ যাইতুনাহ। তৃতীয়টি হলো মিসরের জামিআতুল আযহার। চতুর্থটি হলো ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ। ঐতিহাসিক ক্রমধারাও অনুরূপ।
ঐ সময় জামেয়াতুল কারউইন ইউনিভার্সিটিতে আরবি ভাষা, তাফসির, হাদিস, ফেকাহ এবং তার সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞান, শারীরিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, জোতির্বিদ্যা ইত্যাদি পাঠদান করা হতো। সেসব বিষয়কে আজ আধুনিক বিষয় বলা হয়।
যতটুকু ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করা ফরজে আইন তা তো একত্রে সবাইকে শিখানো হতো। এরপর যদি কেউ ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে চাইত তাহলে সে ইলমে দীনের ক্লাসও ঐ জামেয়াতুল কারউইনেই করতো। কেউ যদি অংকশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করতে চাইত তাহলে সে শাস্ত্রও সে সেখানে পড়ত। চিকিৎসাবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করতে আগ্রহীরাও সেখানেই পড়তো। এসকল নেজাম এভাবেই চলতো। জামিআ যাইতুনাহ, জামিআতুল আযহারও এভাবে চলতো এবং এখনো এভাবেই চলে। এ ইউনিভার্সিটি তিনটি আমাদের প্রাচীনকালের ইউনিভার্সিটি। সেগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা ও জাগতিক শিক্ষা একই সাথে একই ছাদের নিচে দেওয়া হতো।”
(মাওলানা উসমানি সাহেবের পুরো ভাষণ আমার কাছে আছে। এখানে আংশিক দেওয়া হল)

শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও ইসলামের মৌলিক বিষয় প্রবেশ করানোর চিন্তা করা দরকার। লাখ-লাখ মুসলমানের বাচ্চা দীন ও কুরআন ছাড়া বড় হচ্ছে। অশ্লীলতা-বেহায়াপনা বেলেল্লাপনায় পড়ালেখা করছে। দীনি পরিবেশ পাচ্ছে না। নাস্তিক্যবাদ শিখছে। তাদের কাছে দীন কিভাবে পৌছানো যায়, এ চিন্তা আবশ্যক। কে নামাযে আমিন আস্তে পড়ল নাকি জোরে পড়ল, আল্লাহ আরশে আছেন নাকি জমিনে বা আসমানে এসে বসে আছে, এগুলো গুরুত্বহীন বিষয়। হরতাল হারামের ফতোয়া দেওয়ার সময় এটা না। আহলে হাদিসের বিরুদ্ধাচরণ করার সময় পরেও পাওয়া যাবে।

Comment

Share.

Leave A Reply