টঙ্গী ট্রাজেডি : ঐক্যের চৌকাঠে শেষ পেরেক!

0
খতিব তাজুল ইসলাম ::

তাবলীগ জামাত নিয়ে আমার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোই অভিজ্ঞতা আছে। যেহেতু ইতিবাচক প্রবল তাই এটাকে তার হালতের উপর ছেড়ে দেয়া উত্তম ভেবে সেসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমার মত হাজারো লাখো আলেম রয়েছেন যারা দেখেও না দেখার ভান ধরেন। দীনের যেহেতু কিছু একটা ফায়দা হচ্ছে, তাই নিরব থাকি। এই যে কথা না বলি, ভুল না ধরি- এটা করতে করতে দশকের পর দশক গিয়ে আজ যে প্রান্তিকতায় এসে তাবলিগ দাঁড়িয়েছে, বলা যায় একটা গলার ফাঁস হয়ে এখন দেখা দিয়েছে। গোঁদে বিষফোঁড়ার মত অবস্থা আজ। চিল্লার সাথী, সালের সাথী, পুরান সাথী, জোড়ের সাথী। আগের জিম্মাদার নতুন জিম্মাদার। শুরা আমীর ফায়সালসহ এমন বহু ইসতেলাহাত তাবলীগে চালু আছে।

ইনফেরাদি গাশত, খুসুসি গাশত, উমুমি গাশত। বয়ান আর আমলসহ আরো অসংখ্য পরিভাষা আছে যা আমার জানার বাহিরে।
তাবলীগের ছয় উসুল আর গ্রীণ মলাটের ফাজায়েলে আমলের মার্কেট ঠিক রাখতে গিয়ে উলামায়ে দেওবন্দ যে পরিমাণ ঘাম ঝরিয়েছেন তা অকল্পনীয়। আল্লামা ইলিয়াস রাহ.‘র ইখলাসের কারণেই আজ তাবলীগের এই মকবুলিয়ত। হুজ্জাতুল ইসলাম কাসিম নানুতভীর দেওবন্দ আন্দোলনের পর দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে ইলিয়াস রাহ.’র এই কার্যক্রম সোনায় সোহাগার মতো কাজ দিয়েছে। দারুল উলুমের ইলমি ময়দানের সাথে সাধারণ পাবলিকের জন্য তাবলীগী কাজ ছিলো খুবই সুচিন্তিত ও প্রয়োজনীয় একটি মিশন। কিন্তু এই মিশনটি নিয়ে আজ যে বিবাদ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায় কেউ জানেনা।
তাবলীগের বিবাদ নাকি অনেক পুরনো। কারো মতে, প্রায় ২০ বছর যাবত এই সমস্যা চলছে। ২০১৫ সাল থেকে প্রকট আকার রূপ লাভ করে। আর গেল দু‘বছর যাবত তা মাঠে ময়দানে প্রকাশ্যে চলছে।

সংকটের সুচনা যেভাবে

তাবলীগের ফাউন্ডার হলেন ইলিয়াস রাহ.। পরের জিম্মাদার হলেন তাঁর ছেলে ইউসুফ রাহ.। তারপরের জন হলেন ইহসানুল হাসান সাহেব। যিনি সম্পর্কে ইউসুফ রাহ.’র ভায়রা। আর এহসানুল হাসান রাহ. তখন খুব সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন,  তার পরে পদ নিয়ে লড়াই হতে পারে। আমিরত্ব নিয়ে ফাসাদ হবে। তাই কেন্দ্রীয় আলমী শুরা তৈরি করে দেন। এই শুরার মাধ্যমে পালাবদল করে ফায়সাল হবেন। এককভাবে কেউ আর আমীর থাকবে না। বাহ্যিকভাবে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু লাগলেও ফিতনা দমনে এর কোন বিকল্প নেই।

ক্ষমতার দ্বন্ধ মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তাই দীনের গুরুত্বপুর্ণ এই কাজ যাতে ক্ষমতার লড়াইয়ে বন্ধ হয়ে না যায়, তাই সে পন্থা তিনি অবলম্বন করেন।
এনামুল হাসান হজরতজীর ইন্তেকালের পর ৫ সদস্য বিশিষ্ঠ্য শুরার পরামর্শে বিশ্বব তাবলীগের কাজ পরিচালিত হতে থাকে। এই শুরা সদস্যের ৩জন যখন ইন্তেকাল করেন, তখন বাকি থাকলেন যুবাইরুল হাসান ও বর্তমান সা’দ কান্ধলভী। বিশ্ব থেকে বার বার তাগাদা আসছিলো শুরা সদস্য পূরণ করতে। যুবাইরুল হাসানও সা’দ সাহেবকে ডেকে পাঠান কাজটি যেন এগিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু সা’দ সাহেব জবাবে বললেন যে, ভাই! দেখো, এখানে সাথীরা আসে তোমার আর আমার মহব্বতে।  ভাই যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দাও। শুরার কার্যক্রম আর এগুয়নি। ইন্ততেকাল করলেন যুবাইরুল হাসান রাহ.। বিশ্ব থেকে দাবী উঠলো শুরা পুণর্গঠনের। কিন্তু সা’দ সাহেব ততক্ষণে নিজেকে আমীর ঘোষণা দিয়ে বসলেন। শুরু হলো তাবলীগীদের ভিতর অন্তর্দ্বন্ধ। বয়সে, ইলমে, মা’রিফতে সা’দ সাহেব তাবলীগের অন্যান্য মুরব্বি থেকে অনেক পিছনে থাকলেও ইলিয়াস রাহ.’র বংশের চেরাগ হিসেবে তাকে শুরায় রাখা হয়। তার পিতার নাম হারুন কান্দলভী। আর দাদা হলেন ইউসুফ কান্দলভী। হারুন কান্দলভী সরল-সহজ পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। বিশ্ব  তাবলীগের আমীর হওয়ার মতো তেমন যোগ্যতা বা বিচক্ষণতা তার মাঝে ছিলনা।

প্রশ্ন হলো সা’দ কান্দলভী শুরাকে কেন আমলে নিলেন না। নিজে নিজে আমীর হলেন কেমনে? তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিবাদ একমাত্র এই বিষয় না হলেও এটি অন্যতম বড় একটি প্রশ্ন। শোনা যায়, সময়ে সময়ে সা’দ কান্দলভীর বিতর্কিত কিছু বয়ান বড়দের আহত করে। তার ব্যক্তিগত রুঢ় আচরণ অনেকের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু শুরা সদস্য হিসেবে কেউ বেশ আমলে নিতেন না। তারা ভাবতেন, হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আর কান্দালার ইলিয়াসী চেরাগ হিসেবে সকলের আবেগ ও মহব্বতের কেন্দ্র হওয়ার বিষয়টি কেউ বড় করে দেখেননি। কিন্তু তাবলীগের উসুলগুলো যখন একের পর এক ভাঙ্গা শুরু হলো, তখন বিবাদ আর ঘরের ভিতর থাকেনি। যে বয়ানগুলো আগে সমীহ করা হয়েছিল বা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তা এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ যখন স্বঘোষিত আমীর হয়েছেন তখন তার বেলায় চুলচেরা বিশ্লেষণের অবকাশ অবশ্যই থাকবে। সারা পৃথিবীর দাওয়াত ও তাবলীগের মধ্যমনি যিনি হবেন, তার প্রত্যেকটি বাক্য যাচাই-বাছাই তো হবেই।
অনেকের মতে- আপন মতলববাজ, ক্ষমতালোভ, অহংকার এবং জ্ঞানের দৈন্যতা ও বড়দের প্রতি অবজ্ঞা তাকে ফিতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ফলে একের পর এক নিত্যনতুন ফিতনার উদ্ভব ঘটছে।

সত্য মিথ্যার মিশ্রণের সাথে তাবলীগ এখন দুই শিবিরে বিভক্ত। একদল হলো তার এতায়াত যারা করেছে। আরেক দল যারা তার আমিরত্ব মানে না। তাদের বলা হয় আলমী শুরাপন্থী। তামির ছাড়া আমির আর আলমী শুরা এই দুটির দ্বন্ধ এখন তুঙ্গে। অনেকের প্রশ্ন, সা’দ কান্দলভী ছাড়া কি তাবলীগ চলে না? দুনিয়াব্যাপী এতো ফিতনা আর বিবাদ দেখে যার টনক নড়ে না, ইসলামের প্রতি তার কতটুকু দরদ স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে। দাওয়াত ও তাবলীগকে টুকরো টুকরো করিয়ে তিনি কার খুশমন্দি হাসিল করছেন তাহলে?
তাবলীগের ইতিবাচক দিক কী? তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। তবে নেতিবাচক বলতে যা বুঝায় তাহলো- এক প্রকার হাইব্রিড মুসলমান তৈরি করছে বর্তমান এই তাবলীগ জামাত। সা’দ কান্দলভীর ভাষায় যে দীনের একমাত্র সহীহ কাজ হলো দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ। এই যে মানব জীবনের সকল তাকাজাকে সরিয়ে, মোয়ামালাত-মোয়াশারাত, তা’লিম-তদরিস সবকিছুকে বাদ দিয়ে শুধু দাওয়াত ও তাবলীগের কাজকে একমাত্র দীনের কাজ চালিয়ে দেওয়া মারাত্মক নেতিবাচক দিক। তাবলীগীদের কাছে ফাজায়েলে আমল ব্যতীত আর কোন কিতাবের এক পয়সার মুল্য নেই। তিনদিন, দশদিন, একচিল্লা ও সাল এগুলো জিহাদ। আল্লাহর রাস্তায় খুরুজের একমাত্র রাস্তা নাকি চিল্লাকশি? ইসলামী সমাজ কায়েমে আরো যে ভুমিকা আছে সেটা তারা মানতে নারাজ। গোটা দীনকে তাবলীগীরা এই গাশত আর চিল্লায় নিয়ে এসেছেন। তাবলীগের বাইরের লোকদেরকে তারা হেকারতের নজরে দেখেন। এভাবে তাবলীগের মাঝে গায়রে আলেমের একটা বলয় তৈরি হয়েছে। যারা সারা জীবন ইসলামের বাইরে জীবনযাপন করে হঠাৎ তাবলীগের সংস্পর্শে এসে জুব্বা-পাগড়ি, দাড়ি-মিসওয়াক লাগিয়ে মাশাআল্লাহ বিরাট কিছু। ফাজায়েলে আমল, গাশত আর চিল্লার বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করতেই নারাজ। স্যাকুলার মানসিকতা থেকে দীনদারীর এই অভিনব পদ্ধতি তাদের জন্য খুব লোভনীয় হয়। চাকুরি হারাম, লেনদেন, সুদ-ঘুষ সবকিছুই জাগয়গা মত। শুধু লেবাছে আর কয়েকটি রুটিন কাজে এসেছে পরিবর্তন।

কলেজ-ভার্সিটির তাবলীগীরা দীনের নতুন হাইব্রিড সংস্করণ আবিষ্কার করেছেন বলে আমার ধারণা। আর এই ধারাবাহিকতা থেকে সা’দ সাহেব গায়রে আলেমের এই দলটিকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছেন। কারণ তাদের না আছে ইলমী যোগ্যতা, না আছে তাহকীকী মানসিকতা। ফাজায়েলে আমলের কুয়া দিয়ে গোটা জগত মেপে মেপে দেখে। জেহালত, বদজন গোঁয়ার্তমী এখন তাদের বড় সম্পদ।
যে আলেমদের কাছ থেকে তারা দীন শিখলো, এখন হাইব্রিড দীনদার বনে আলেমদের বিরুদ্ধে কুৎসাহ রটাচ্ছে। সা’দপন্থীদের সবচেয়ে বিপদজনক দিক হলো-আলেমদের কুৎসাহ রটনা। আল্লাহর গোস্বা আর লানত পাওয়ার জন্য তাদের এই নেক্কারজনক কাজই যথেষ্ট। আলেম ছাড়া দীনের কাজ তারা কিভাবে এগিয়ে নিবে? দীনের দাওয়াত থেকে আলেমদের বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্য হলো এই কাজটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
নিজামুদ্দীনের আহমদ লাট আর ইব্রাহীম দেওলার কথা বাদ দিলাম। প্রশ্ন হলো, রায়ব্যান্ড আলমি শুরার সভায় ১১ জনের ৯জন স্বাক্ষর করলেন মরহুম হাজি আব্দুল ওয়াহাব সাহেবসহ অথচ সা’দ সাহেব ও তার সাথী আরেকজন দস্তখত করেননি। কারণ সা’দ সাহেব জানেন যে, এখানে দস্তখত করলে তার আর এমারতি থাকেনা। আজ যারা বলে যে, হজরতজী ইউসুফ রাহ.’কে বীষ খাইয়েছিলো, তারাই এখন বিবাদের মূলে কাজ করছে। প্রশ্ন হলো কোরআনের অপব্যাখ্যা, রাসুলের শানে গোস্তাখী, সাহাবাদের শানে বেআদবী এসব কি তাহলে পাকিস্তানীরা সা’দ সাহেবকে শিখিয়ে দিছিলো? নিজের অজ্ঞতা আর অযোগ্যতাকে ঢাকতে অন্যের বদনাম করা আমাদের চিরাচরিত অভ্যাস।
ঢাকার টঙ্গী ইজতেমা স্থলে ঘোষণা দিয়ে দলবল নিয়ে এসে ইট পাথর আর ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিরীহ মাদরাসার ছাত্রদের উপর নির্মম হামলা প্রমাণ করে, সা’দপন্থীরা অন্য কারো মিশন পরিচালনা করছে। শত শত ছাত্রদের রক্তের উপর দিয়ে যদি সা’দপন্থীরা ভাবে যে, তারা বিজয়ী হবে তাহলে তারা ভুল করবে। ঐক্যের সর্বশেষ সুযোগ এখন হাতছাড়া হয়ে গেলো। জঙ্গী হামলা চালিয়ে একরামুল মুসলিমীনদের ধ্বজাধারীরা প্রমাণ করলো তারা কতটা ইসলামের দুশমন আর কুফরের বন্ধু।

Comment

Share.

Leave A Reply