হযরতজি ইলিয়াস রাহ. : কেঁদেছেন দুনিয়ায় কাঁদছেন কবরে…

0
মুফতি আব্দুল কাদির মাসুম ::

তাবলিগের বর্তমান যে সংকট চলছে, তা ফিরাসাত ও ইলহামের মাধ্যমে পূর্বেই আঁচ করতে পেরেছিলেন হযরতজী ইলিয়াস রহ.। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাবলিগের ব্যাপারে হযরত ইলিয়াস রহ.’র শঙ্কা ও মৃত্যু নিয়ে এমনই দুটি ঘটনা: এক. হঠাৎ করে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন হযরতজী ইলিয়াস রহ.। তখন গভীর রাত। বাচ্চার মত কাঁদছিলেন আর বলছিলেন- ‘মাই কিয়া করোঁ, মাই কিয়া করোঁ’। ওনার স্ত্রী তার কান্না আর হায়-হোতাশের আওয়াজে জেগে ওঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ লাগছে? এভাবে কাঁদছেন কেন? জবাবে হযরতজী বলেন, ওঠো, দু’জনে মিলে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করি। আমি স্বপ্নে দেখলাম, উম্মতে মুহাম্মাদির দুইটা দলের রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে (তাদের পরস্পরের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ)। বর্ণিত আছে, এ স্বপ্নের পর হযরতজী রহ. অসুস্থ হয়ে গেলেন। ক্রমাগত তা বেড়েই চলল। এবং ইন্তেকাল করলেন ১৩৩৬ হিজরীতে। (সূত্র: মালফূজাতে ফকীহুল মিল্লাত খ.১ পৃ.৫৬ কিস্তী: ০৫, মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.)

তাবলিগ জামাতের চলমান সংকট ও গতকালের ঘটনা হযরতজির ওই স্বপ্নের প্রতিফলন নয় তো? দুই. অসুস্থ থাকাবস্থায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন প্রসিদ্ধ তাফসিরগ্রন্থ ‘মাআরিফুল কুরআনের’ লেখক মুফতী শফী রহ.। কুশল জিজ্ঞেসের পর হযরতজী রহ. শফী রহ.’র হাত ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। শফী রহ. বলেন, আমি ভাবলাম হয়ত রোগে বেশি কষ্ট হচ্ছে, এজন্যে বোধ হয় যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে কাঁদছেন। আমি সান্ত্বনা দিলাম। হযরত ইলিয়াস রহ. তখন বলে ওঠলেন, আমি রোগের যন্ত্রণায় কাঁদছি না; বরং দুইটা আশঙ্কা আমার ভেতরকে দুখে দুখে মারছে এ জন্য কাঁদছি। একটা চিন্তা হল, দেখছি দিন দিন তাবলিগের এ মেহনত প্রসারিত হচ্ছে, দল বড় হচ্ছে। আমার ভয় হয়, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোথাও ইসতেদরাজ তো নয়? (ইসতেদরাজ বলা হয় কোন বাতিলপন্থী লোককে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঢিল দেওয়া এবং বাহ্যিকভাবে তাকে সার্বিক সফল মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এটা আল্লাহর রহমত নয় বরং এর আড়ালে আল্লাহর রাগ ও অসন্তুষ্টি থাকে।) মুফতী শফী রহ. সাথে সাথে জবাবে বললেন, হযরত, আমি আপনাকে নিশ্চয়তার সাথে বলছি, এটি ইসতেদরাজ নয়। হযরতজী জিজ্ঞেস করলেন, এর প্রমাণ কী? শফী রহ. বললেন, যদি এটি ইসতেরাজ হতো তাহলে আপনি এতো পেরেশান হতেন না, কারণ যার সাথে ইসতেদরাজ হয় তার দিলে ইসতেদরাজ বলে কখনো ভীতি জাগ্রত হয় না, এদিকে মনও যায় না। দ্বিতীয়টা কী? জিজ্ঞেস করলেন শফী রহ.।

হযরতজী বললেন, আমার এই জামাতে আওয়াম বেশি পরিমাণে যুক্ত হচ্ছে, আহলে ইলমের সংখ্যা নগণ্য। এখন আমার চিন্তা হচ্ছে যদি আওয়ামের হাতে এই জামাতের নেতৃত্ব ও পরিচালনা চলে যায়, তাহলে এরা সামনে বাড়িয়ে একে ভুল পথে চালাবে। আর এজন্য আল্লাহর দরবারে আমার জবাবদিহি করতে হয় কি না? এই জন্য আমার বড় আকাঙ্খা, এ জামাতের সাথে আহলে ইলম বেশি সংখ্যকে যুক্ত হোক এবং পরিচালনা ও নেতৃত্ব তারা দিক। এ কথা শুনে শফী রহ. বললেন, হযরত, এই শঙ্কা ঠিক। তবে আপনি যেহেতু সহিহ নিয়ত ও সহিহ তরিকায় কাজটি চালু করেছেন, সুতরাং অাপনার পরে ভুলের দায়ভার আপনার উপর আসবে না, বরং এর দায় তাদের উপরই চাপানো হবে যারা এসব করবে। (সূত্র: দরসে তিরমিযী খ. ৫ পৃ. ২১১-২১৩ আবওয়াবুসসিয়র, আল্লামা তাকি উসমানী)

Comment

Share.

Leave A Reply