নির্বাচনী ম্যাকানিজম : শক্তি ও আদর্শের লড়াই

0
সৈয়দ শামছুল হুদা ::

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি কীভাবে জয়লাভ করেছিল তা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র বের করে জনৈক আওয়ামীলীগ বুদ্ধিজীবি। সেই দীর্ঘ গবেষণাপত্রটি পড়েই বুঝেছি, নির্বাচন নিয়ে কী রকম খেলা হতে পারে, চলতে পারে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকশন ম্যাকানিজম বলতে যা যা কল্পনা করা যায় এবং যা যা সাধারণ মানুষের কল্পনায়ও আসে না, তাই প্রয়োগ করা হয়। গবেষণাপত্রটি ২০০১ এর নির্বাচনে কতটা সত্য ছিল তা আমার জানা নেই। তবে এই বইয়ের পুরোটুকুই যে পরবর্তী নির্বাচন সমূহে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রয়োগ করেছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয় নানা কারণে। ২০০৮, ২০১৪ থেকে শুরু করে ২০১৮ এর নির্বাচন নিয়ে যদি কোন গবেষণাপত্র বের করে তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের নির্বাচনী নোংরামির হালচাল।

আসলে গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে যা চলে তা জনগণ এবং বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। গণতন্ত্র যে মানুষের মুক্তি দিতে পারে না বা গণতন্ত্র যে মুক্তির সত্যিকার কোন আদর্শ নয়, সেটা বারবারই আমাদের সামনে পরিস্কার হয়ে দেখা দিচ্ছে। জোর যার মুল্লূক তার এই নীতিতেই সবকিছু চলে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, কাকে বিশ্বাস করবো, যাকেই যেখানে বসাই সেই আর চেয়ার ছাড়তে চায় না। আসলে চেয়ারের যে কী লোভ সেটা কার নেই? কার এত ঠেকা পড়ছে, একবার চেয়ারে বসলে, সেই চেয়ারে অন্যকেও বসার সুযোগ দিতে?

কী কেয়ারটেকার, কী নানা ফর্মুলা সবই ভুয়া। সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন শক্তি। যার শক্তি নেই, তার আদর্শ যতই ভালো হোক, যতই সুন্দর হোক, তার যতই জনসমর্থন থাক তাতে সে বিজয়ী হতে পারবে না। খারাপ শুনালেও একটি কথা এখানে বলি, এই যে প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগ এ দ্বারা কোনদিন দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে না। কারণ এখানে শক্তি প্রয়োগের বিষয় নেই। যেখানে শক্তি প্রয়োগ নেই সেখানে বিজয়ও নেই।নবী রাসূলগণ যেখানে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া বিজয়ী হতে পারেননি, সেখানে আমরা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেই দ্বীন কায়েম করে ফেলবো? হ্যাঁ, কথা হলো- শক্তি প্রয়োগটা সঠিক পথে কী না সেটা দেখার বিষয় ভালো মানুষগুলোর। খারাপমানুষগুলো শক্তি প্রয়োগে নীতি আদর্শের ধার ধারে না। ভালো মানুষগুলো শক্তি প্রয়োগেও পরকালীণ একটি চিন্তার কারণে, ভয়ের কারণে অন্যায় কিছু করতে পারে না।

নির্বাচন একটি যুদ্ধ। এখানে শক্তি প্রয়োগ লাগবে। এখানে প্রচন্ড রকম কৌশল প্রয়োগ লাগবে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে একটি দল যে পরিমান অর্থ, শক্তি, মাল-মসলা অর্জন করেছে, তার মোকাবেলায় বিজয়ী হতে হলে কী পরিমান জনশক্তি প্রয়োজন তা সহজেই অনুমেয়। এর ওপর ক্ষমতাসীন দলে যে পরিমান নির্বাচনী প্রকৌশলী আছে সেই পরিমান প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিরোধী শিবিরে নেই। আর ইসলামী দলগুলোতো এর ধারে কাছেও নেই। রাজনৈতিক খেলায় ইসলামী দলগুলো যে কত দুর্বল তা তাদের সাম্প্রতিক কালের গৃহিত সিদ্ধান্ত থেকেই উপলব্দি করা যায়।

ইসলামী দলগুলো প্রচলিত রাজনীতিকে নিজেদের সরলতার সহজসমীকরণে বিশ্বাস করে। ফলে বারবার মার খায়। মাঝে মাঝেই মিষ্টি কথায় পেছনটা ভুলে যায়। সামান্য একটা কিছু পাওয়ার মতো মনে হলেই তার পেছনে ছুটে যায়। এটা যে, তার বড় অর্জন থেকে বঞ্চিত করার অপকৌশল সেটা একবারও ভেবে দেখার সময় পায় না। সামান্য কিছু লোভ দেখিয়েই ইসলামী দলগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা যায়। একদল হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কেউ বাধা দিলে বলে, দূর মিয়া, রাখেন আপনার এসব বুদ্ধি-সুদ্ধি, নগদটা কে হাতছাড়া করে! ফলে নিজেও মাহরুম হয়। অন্যকেও মাহরুম করে। সামান্য টোপ দিলেই ইসলামী দলগুলো ভেঙ্গে যায়। একজন আরেকজনকে ফেলে চলে যায়।

নির্বাচনী রাজনীতি বড় কঠিন রাজনীতি। এখানে সংঘবদ্ধতার খুব বেশি প্রয়োজন। নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে এগিয়ে যেতে হবে। পা পিছলে পড়ে গেলেই আপনি শেষ। এ যুগে এরদোয়ানরাই এসব রাজনীতির কূটকৌশলকে খুব ভালো ভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছে। ফলে তাদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। এরদোয়ান প্রয়োজনে অনেককে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, অনেককে নতুন করে পদে বসিয়েছে। কিন্তু কেহই দল ছেড়ে চলে যায়নি। দল ভেঙ্গে ফেলেনি। ফলে তাকে শক্তির মোকাবেলায় অপশক্তি তাকে কাবু করতে পারেনি।

এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো যদি একজনকে নেতা মেনে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে পারে, এদিক সেদিক ছুটোছুটি না করে নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে তারা একটি কঠিন ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য কী আমাদের হবে?

Comment

Share.

Leave A Reply